নগরের জামালখানে হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দেয়ালে ২০২১ সালে স্থাপন করা হয় এম এস প্লাজমা কাঁচ দিয়ে নির্মিত ৩১ জন মনীষীর পোর্ট্রেট ম্যুরাল ও পরিচিতি। ‘চট্টল গৌরব’ শিরোনামে স্থাপিত এ ম্যুরাল উদ্বোধন করা হয় ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর। এখানে যে ৩১ জন মনীষীর পোর্ট্রেট ও পরিচিতি রয়েছে তারা সবাই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। তাদের খ্যাতি দেশ নয়, আছে বিদেশেও। দেশের জন্য, মানুষের জন্য তাদের রয়েছে নানা অবদান, যা উপস্থাপন করা হয় সংক্ষিপ্ত পরিচিতির মাধ্যমে। চলার পথে যা পড়ে প্রেরণা পায় নতুন প্রজন্ম। এ পোর্ট্রেট কেবল জানার পরিধি বাড়িয়েছে তা নয়, এর শৈল্পিক উপস্থাপন শোভা বাড়িয়েছে দেয়ালটির। সাথে বাড়িয়েছে পুরো এলাকার সৌন্দর্য। যা দেখে মুগ্ধ হন পথচারীরা। কিন্তু সম্প্রতি দেয়ালজুড়ে লাগানো নানা বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক পোস্টারে ঢাকা পড়ছে সেই সৌন্দর্য। তাই দেখে সুজন নামে এক পথচারী মন্তব্য করেন, এরা কারা– যারা কালজয়ী মনীষীদের আড়াল করে নিজের প্রচার করছেন? তারা কি মনীষীর চেয়েও বড়?
শুধু হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের দেয়ালটি নয়। শহরজুড়ে ব্যক্তি মালিকানাধীন বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সীমানা দেয়াল, শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়সহ পাড়ার অলি–গলির খালি জায়গাসহ প্রায় সবখানেই লাগানো হয় পোস্টার। এর মধ্যে বড় অংশ রয়েছে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের অংশ হিসেবে লাগানো পোস্টার। সম্প্রতি বেড়েছে রাজনৈতিক পোস্টারের সংখ্যাও। কেউ নিজেকে ‘কাউন্সিলর পদপ্রার্থী’ পরিচয় দিয়ে এলাকাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এসব পোস্টারের মাধ্যমে। কেউ নিজের রাজনৈতিক পদ–পদবী জানান দিচ্ছেন পোস্টারের মাধ্যমে। তবে নগরবাসী বলছেন, যত্রতত্র এসব পোস্টার লাগানোর কারণে সৌন্দর্যহানি ঘটছে শহরের। এটা কি দেখার কেউ নেই?
জানা গেছে, বিশেষ কোনো উপলক্ষ এলে পোস্টার লাগানোর হার রাতারাতি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। যেমন রাষ্ট্রীয় কোনো দিবস, রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি বা ধর্মীয় কোনো উৎসব। বিশেষ উপলক্ষের পোস্টার বেশিরভাগই স্থাপন করে রাজনৈতিক কর্মীরা। আইন অনুযায়ী, শহরে পোস্টার লাগানোর জন্য নির্দিষ্ট ফি দিয়ে অনুমতি নিতে হয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোশেনের (চসিক)। তবে শহরে লাগানো পোস্টার আইন মেনে লাগানো হয় না। আইন না মানলেও উপলক্ষ বিবেচনায় কর্পোরেশনও চুপ থাকে। এমনকি উপলক্ষ শেষ হয়ে গেলেও পোস্টারগুলো অপসারণ করা হয় না। অবশ্য মাঝেমধ্যে পোস্টার অপসারণে অভিযান চালায় সংস্থাটি। সর্বশেষ গত ১ এপ্রিল চকবাজার অলিখাঁ মসজিদ মোড়ে একটি অভিযান শুরু করে। এদিন এক সপ্তাহের মধ্যে শহরকে অনেকটা ক্লিন করার ঘোষণা দিয়ে মাসব্যাপী অভিযান চলবে বলেও জানান মেয়র। কিন্তু সেই অভিযান আর চলেনি। ফলে পোস্টারমুক্ত হচ্ছে না শহর। জানা গেছে, পোস্টার লাগানোর বিষয়টি শৃঙ্খলায় আনার জন্য ২০২২ সালে উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। ওই সময় সংস্থাটির জরিপে দেখা গেছে, শহরে সাঁটানো ৯০ ভাগই পোস্টার হচ্ছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে এমন স্থানগুলোতে পোস্টার বেশি সাঁটানো হয়। এরপর গ্রোথ সেন্টার বা যেখানে লোক সমাগম বেশি হয় সেখানে পোস্টার সাঁটানো হয়। এছাড়া গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত চসিকের এক সভায় জানানো হয়, চসিকের অনুমতি ছাড়াই নগরের বিভিন্ন স্থানে কোচিং সেন্টারগুলোর পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন ও সাইনবোর্ড লাগায়। এতে রাজস্ব ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। চট্টগ্রাম শহরে কোচিং সেন্টারগুলো অন্তত ৮০ ভাগ বিজ্ঞাপন–লিফলেট প্রচারের ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন থেকে অনুমতি নিচ্ছে না।
এদিকে সিটি কর্পোরেশন কর আইন–১৯৮৬ অনুযায়ী, শহরে পোস্টার লাগানোর জন্য নির্দিষ্ট ফি দিয়ে অনুমতি নিতে হবে সিটি কর্পোরেশন থেকে। এক্ষেত্রে ৬ বর্গফুটের একটি পোস্টারের জন্য দৈনিক ১০ টাকা এবং ১০ বর্গফুটের পোস্টারের জন্য দৈনিক ৭ টাকা পরিশোধ করার বিধান রয়েছে। যদিও বাস্তবে সিটি কর্পোরেশন থেকে অনুমতি নিয়ে কেউ পোস্টার সাঁটান না। ফলে রাজস্ব বঞ্চিত হয় চসিক।
অবশ্য ২০২২ সালে যত্রতত্র পোস্টার সাঁটানো বন্ধে একটি উদ্যোগ নেয়। সংস্থাটি পোস্টার বোর্ড লাগানোর ১৫০টি স্পট চিহ্নিত করে। সংস্থাটির তখন পরিকল্পনা ছিল, নির্দিষ্ট এসব স্পটের বাইরে কেউ পোস্টার লাগাতে পারবে না। ২০২৩ সালে ১৫ নম্বর বাগমনিরাম ও ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিল। এ জন্য ঠিকাদারও প্রায় চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ পরে আর কার্যকর হয়নি।
যতত্রতত্র লাগানো পোস্টারে কারণে নগরের সৌন্দর্যহানি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, শহরের সৌন্দর্য রক্ষায় সিটি কর্পোরেশন প্রায় পোস্টার, ব্যানার, বিলবোর্ড অপসারণ করে। কোচিং সেন্টারগুলোকেও নিয়মের মধ্যে আনা হচ্ছে। এরপরও যত্রতত্র পোস্টার লাগানো বন্ধের জন্য আমরা নতুন করে উদ্যোগ নিচ্ছি। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে– বিভিন্ন দেয়ালে গ্রাফিতি করব। এজন্য চারুকলার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছি। গ্রাফিতি করলে তখন আর পোস্টার লাগাতে পারবে না।
চসিকের সচিব মোহম্মদ আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দেয়ালে পোর্ট্রেট এর সৌন্দর্যহানি করে পোস্টার লাগানোর বিষয়ে অবগত ছিলাম না। এটার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিব।














