ভূগোলের গোল

ডাঃ কিউ এম অহিদুল আলম

মঙ্গলবার , ২৪ মার্চ, ২০২০ at ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
42

পাহাড়-উন্নয়ন: পরিবেশ নয়, চাই প্রযুক্তি
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘন বসতিপূর্ণ দেশ। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো গ্রামে বাস করে। গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত: কৃষি নির্ভর। কৃষি বাংলাদেশের জিডিপিতে মাত্র ২১% অবদান রাখলেও প্রায় ৫০% শ্রম নিয়োজিত করে খন্ডকালীন বা পূর্ণাংগ শ্রমঘণ্টা হিসেবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে, শিল্প উন্নয়ন ও নগর উন্নয়নের খাতিরে বেপরোয়া ও বেহিসেবি মাত্রায় আবাদী জমি ব্যবহৃত হয়েছে নগরে ও শহরে। বড় বড় নগরে আবাসিক এলাকা গঠনের নামে মাত্র ৩-৪ জনের পরিবারের জন্য প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ১০ বৎসর পর এসব বাড়ির সব সদস্যই প্রবাসে পাড়ি দেয়।জমি হয়ত বিক্রি হয় নতুবা ডেভেলাপারের কাছে যায়। এভাবে নগরবিদরা আবাদী জমি নষ্ট করেছে ক্রমান্বয়ে। পরিসংখ্যান বুরোর হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে আবাদী জমির পরিমাণ প্রতি বৎসরে কমে ৪০ হাজার হেক্টর। এভাবে নগর উন্নয়ন হতে থাকলে আগামী ৫০ বৎসরে বাংলাদেশে আবাদযোগ্য কোন জমিই থাকবে না। এখানে উল্লেখ্য যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে গত পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে যত আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠেছে তার সবই আবাদী জমি অধিগ্রহণ করে করা হয়েছে। তার বিকল্প ছিল কি? অবশ্যই। আমরা গোয়ার্তুমির মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকাগুলোকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যবহার তো করতে পারিই নাই, তদুপরি বর্তমানে পরিবেশ গত এফেক্টের ধুয়া তুলে একটা যুক্তিসংগত উন্নয়নের দুয়ারকে বন্ধ করে দিয়েছি। বাংলাদেশে চট্টগ্রামসহ যেখানেই পাহাড় (বন নয়) এলাকা নগরীর সংলগ্ন সেখানে বসতি। স্কুল-কলেজ, মিল কারখানা স্থাপন করা জরুরি। যারা পরিবেশবিদ ও তথাকথিত বিশেষজ্ঞ তাদেরকে ভাবতে হবে আবাদী জমি নির্বিচারে নষ্ট করা, কংক্রিটের উঁচু দালান করে ভূমিকম্পের টিকেট কাটা ভাল না আধুনিক ইনজিনিয়ারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাহাড় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রসারিত করা শ্রেয়।
বিশ্বের যে সব শহরে পাহাড় আছে সে সব জায়গায় আদিকাল থেকেই বসতি গড়ে উঠেছে। পাহাড়ে বসতি হলে সব শেষ হয়ে যাবে এরকম কোন থিউরি নেই। জ্ঞান বিজ্ঞানের উন্নতি ও ইনজিনিয়ারিং প্রযুক্তির উন্নতির ফলে পাহাড়ে দালান প্রাসাদ নির্মাণের কনসেপ্ট ও ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে। আমাদের দেশে কিছু কিছু তাত্ত্বিক পরিবেশের দোহাই দিয়ে পাহাড় এ নির্মাণ একেবারে নিষিদ্ধ মনে করে। বিশ্বব্যাপী পাহাড়ি শহরে যে ভাবে নির্মাণ কার্য চলছে তা কিন্তু আমাদের দেশের এপ্রোচের সাথে বিপরীত। এসব প্রেক্ষাপটে, আবাদী জমির ক্রম হ্রাস, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে আজকে বাস্তব প্রশ্ন হচ্ছে পাহাড়ে নির্মাণ কি নিষিদ্ধ থাকবে না নতুন টেকনলজি ব্যবহার করে পাহাড় উন্নয়ন ও আবাসন হবে।
পাহাড়ে আবাসন ও অন্যান্য নির্মাণ প্রসংগে পৃথিবীর বহু প্রকৌশল ও স্থপতি জার্নালে গবেষণামূলক প্রবন্ধ রয়েছে। আমি পুরান নতুন কোন প্রবন্ধে পাহাড়ে উন্নয়ন ও আবাসন করা যাবে না তা দেখিনি। বরং পাহাড়ে আবাসনের বিভিন্ন কৌশলের বর্ণনা রয়েছে। এমনি একটি প্রবন্ধ দেখেছি-Journal of Architecture & Construction, Vol 2 issue 1 2019 23-34P ।
পাহাড়ে আবাস নির্মাণে পরিবেশ, ভূমিধ্বস, পানির প্রাপ্যতা, ভূমির, টপগ্রাফী ও ভূমির স্লোপ বা ঢালু মাথায় রেখে নির্মাণ কৌশল নির্ধারণ করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ৬০০ মিটার উঁচু হলে পাহাড় বলে গণ্য করা হয়। চট্টগ্রাম শহরের সন্নিকটের পাহাড়গুলো অত উচু নাও হতে পারে। পাহাড়ি এলাকাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। Ridge, midland ও Valley অর্থাৎ উঁচু খাদ, মধ্যম ভূমি ও নিম্ন ভূমি, উঁচু খাদ এলাকায় সরকারি অফিস, মসজিদ-মন্দির, দোকান স্থাপন করা যেতে পারে। মধ্যম ও নিম্নভূমিতে আবাসন করা হয়। পাহাড়ে নির্মাণ সামগ্রী ও ভিন্ন প্রযুক্তির হয়।
এখন দেখা যাক পৃথিবীর বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পাহাড়ি শহরের কথা।
আমরা সবাই হার্ভাড ভার্সিটির নাম জানি। এটা বোস্টন শহরে ১৮৪৭ সালে হার্ভাডের প্রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড এভার্ট এখানকার পাহাড়ে এই ভার্সিটির দালান কোটা বানানোর সিদ্ধান্ত নেন।
ইরানের মধ্য অঞ্চলে এলব্রোস, জাগ্রস পাহাড় যার উত্তরে কাসপিয়ান সাগর ও পশ্চিমে মেসোপটেমিয়া অত্যন্ত মনোরম পাহাড়ি শহর। এই শহরগুলো পাহাড় জুড়ে এখনো বাড়ছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের হিমাচল প্রদেশের ডালহৌসী পুরো পাহাড়ে। এটি এখনো বেড়ে চলেছে। কানাডার বরফে ঢাকা পাহাড়ি শহর বৃটিশ কলম্বিয়া পাহাড়ে কিভাবে শহর গড়বে তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ এখানে পাহাড়ে বহুতল স্টীল স্ট্যাকচারের দালান রয়েছে। পুরো শহরটাই টুরিস্ট আকর্ষণ।
পুরো অস্ট্রেলিয়া জুড়ে আলপাইন জাতের পাহাড়ে অনেক শহর আছে। মরিসাসের বন ও পাহাড় ঘেরা একটা শহর মোকা। পাহাড়ি বৈচিত্র্য ও ভূমির ল্যান্ডস্কেপ রক্ষা করে গড়ে উঠেছে বিশাল ইউনিভার্সিটি অব মরিলাস ও মহাত্মা গান্ধী ইনস্টিটিউট। অস্ট্রেলিয়ার থ্রেডবো শহর এর উচ্চতা ২০৩৭ মিটার, ভারতে ভাগ্যেশ্বর পিথরাগর, উটি, নীলগিরি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ১০০০ মিটার উঁচু। এসব জায়গায় বৃটিশরা গড়ে তুলেছিল শহর। কিন্তু শহরগুলোর প্রসার ও বিস্তার এখনো চলছে।
চট্টগ্রামে পাহাড়ছাড়া কিছুই নাই। এই পাহাড়গুলো ইধৎৎবহ বা খালি এবং উচ্চতাও বেশি নয়। শহরে বিভিন্ন আবাসন এর জন্য যে পরিমাণ আবাদী জমি নষ্ট হয়েছে তার পরিবেশগত মূল্য অপরিসীম যা করা হয়েছে জ্ঞানের, প্রযুক্তির অজ্ঞতা বা অপব্যবহারের কারণে। এগুলো না করে পাহাড়ে সমকালীন প্রকৌশল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সীতাকুন্ড। ফয়’স লেক, হাটহাজারী, মিরসরাই পাহাড়ি রেঞ্জে গড়ে ওঠতে পারত আবাসন, স্কুল-কলেজ, শহর, শিল্প খোদার সৃষ্টির সব কিছুই মানুষের কল্যাণের জন্য। প্রযুক্তিই পারে পরিবেশ রক্ষা করতে। তাই পাহাড় উন্নয়ন হবে না । এটা না বলে কোন প্রযুক্তিতে পাহাড়কে ব্যবহার করবে এটাই হওয়া উচিত চট্টগ্রামের ভবিষ্যত উন্নয়ন কৌশল।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামলেখক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক