প্রকৃতির নির্জনতা আর শতবর্ষী গাছের ছায়ার নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ঢাকা সিআরবিকে এখন গিলে খাচ্ছে শত শত ভাসমান দোকান। রেলওয়ে এবং প্রশাসনের নীরবতায় এসব ভাসমান দোকানের কারণে ম্লান হচ্ছে সিআরবির চিরচেনা শান্ত নির্জন নীরবতা। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি স্থান সিআরবি। শতবর্ষী রেইনট্রি গাছ, ঘন সবুজ ছাউনি এবং পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত এই এলাকাকে চট্টগ্রামের ফুসফুস বলা হলেও এখানে মানসিক প্রশান্তির জন্য কোথাও শান্তিতে বসার সুযোগ আর নেই এখন। এক সময় সিআরবির সাত রাস্তার মোড় দিয়ে খুব সহজেই গাড়ি নিয়ে নগরীর যে কোনো প্রান্তে ছুটে যাওয়া যেত। এখন ভাসমান দোকানগুলোর কারণে এই সড়ক দিয়ে আর সহজে আসা–যাওয়া করা যায় না। সন্ধ্যার পর ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক বিভাগ এবং রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল রেল মন্ত্রণালয় থেকে ৩০টি দোকান বরাদ্দ নিয়ে আসে। এর বাইরে সিআরবির পুরো এলাকাজুড়ে এখন কয়েকশ অবৈধ দোকান বসেছে। শুক্রবার আসলেই সড়কের পাশ ঘেঁষে ভাসমান দোকানের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এদের থেকে নিয়মিত চাঁদা নেয় একটি প্রভাবশালী মহল।
স্থানীয় ভাসমান কয়েকজন দোকানদারের সাথে কথা হলে তারা জানান, আমরা রেলওয়ে থেকে লিজ নিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন এখানে স্থানীয়ভাবে বসেছি। অন্যান্য দোকানগুলো লিজের বাইরে। তারা দৈনিক ভিত্তিতে টাকা দিয়ে বসেছে। এক পেঁয়াজু বিক্রেতা জানান, আমি প্রতি শুক্রবারে আসি। আমার থেকে ২০০ টাকা করে নেয়। আলু দিয়ে চিপস বানিয়ে বিক্রি করা এক যুবক বলে আমার থেকে ১০০ টাকা করে নেয় প্রতি শুক্রবারে।
সিআরবি এলাকায় ভাসমান দোকান বসানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীণ আজাদীকে বলেন, সিআরবি সৌন্দর্য বজায় রাখার জন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একটি কমিটির মাধ্যমে কিছু দোকান বসার জন্য অনুমতি দেয়া হয়েছে। বাৎসরিক ফি’র মাধ্যমে এসব দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যাতে এলোমেলোভাবে যত্রতত্র দোকান বসতে না পারে। কমিটির মাধ্যমে যেগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে–এর বাইরে আর কোনো দোকান যাতে বসতে না পারে এজন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে বলবো এগুলো উচ্ছেদের জন্য।
সরেজমিনে গত শুক্রবার গিয়ে দেখা গেছে, ছুটির দিনে হলে সড়কের পাশ ঘেঁষে ভাসমান দোকানের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কারের ভিড়ে জ্যাম লেগে থাকে। উচ্ছৃঙ্খল যুবকদের বিকট আওয়াজে মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কার চালানোর কারণে সৃষ্টি হয় মারাত্মক শব্দদূষণ।
যান্ত্রিক জীবন থেকে নিজেকে একটু স্বস্তি দিতে নগরবাসী রাতবিরাতে সিআরবিতে ছুটে যেত। কিন্তু সেই মানসিক প্রশান্তির জায়গাটুকু আজ চলে গেছে প্রভাবশালী দখলদারকে কবলে। তাই সিআরবিতে গিয়ে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসতে হয়।
এ ব্যাপারে সিআরবি এলাকায় রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ইনচার্জ (এএসআই) অজয় বিশ্বাস বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রেল মন্ত্রণালয় থেকে ৩০টি দোকান বসার অনুমতি নিয়ে এসেছিল। এরা রেলওয়েকে একটি নির্দিষ্ট ফি দিয়ে দোকানগুলো বসিয়েছে। এখন আরও কিছু ভাসমান টংয়ের দোকান বসেছে। শুক্রবার আরও বেড়ে যায়। এই অবৈধ দোকানগুলোর ব্যাপারে আমরা একাধিক চিঠি দিয়েছি জিএম স্যারকে। এই দোকানগুলো আগে থেকেই এভাবে বসছে। তবে ইদানিং আরও কিছু দোকান বসেছে। তিনি বলেন, এই দোকানগুলোর সাথে আরএনবির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আমাদের লোকবল কম। আমরা এর মধ্যে বেশ কয়েকটি দোকান উচ্ছেদ করেছি। এরা আবার বসে যায়। বিষয়টি আমরা কমান্ডার স্যারকে জানিয়েছি। শুক্রবারে সড়কের পাশ ঘেঁষেও দোকান বসে যায়, রাস্তা জ্যাম হয়ে যায়। গত ৪/৫ দিন আগে আমরা কয়েকটি ফুলের দোকান উচ্ছেদ করেছি। এরা মহিলা লাগিয়ে দেয়। আমাদের মহিলা ফোর্স নেই। এটা নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।












