বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা নেই, ভোটারের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি

নগরের ভোটচিত্র, ‘মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে ভোট দিয়েছি’

মোরশেদ তালুকদার | শুক্রবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৬:২২ পূর্বাহ্ণ

কোনো সমস্যা হয়নি। মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে ভোট দিয়েছি। অতীতে কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দিতে পারিনি। এবার একটি না দুইটি (গণভোটসহ) ভোট দিয়েছি। তাই অনেক ভালো লাগছে।’ গতকাল সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে নগরের নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে ভোট দিয়ে বেরুনোর সময় কথাগুলো বলছিলেন জসীম উদ্দিন নামে এক ভোটার। এ সময় তিনি নিজেকে স্ট্রোকের রোগী জানিয়ে বলেন, শরীর কিছুটা খারাপ হলেও ভোট উৎসব থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখতে চাইনি। তাই চলে এসেছি।

জসীম উদ্দিনের সঙ্গে কথা শেষ করে ভোটকেন্দ্রটিতে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ এবং আনসার সদস্যের সতর্ক অবস্থান। তারা জানান, ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকে কেন্দ্রের ভেতর এবং বাইরে কোনো সমস্যা হয়নি।

আনুমানিক ১০ দশ মিনিট কেন্দ্রটিতে অবস্থান করে দেখা যায়, ভোটাররা আসছেন এবং দ্রুত ভোট দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। তাদের চোখেমুখে ছিল উচ্ছ্বাস। এ কেন্দ্রে কোনো লাইন ছিল না ভোটারদের। ফলে ভোট দিতেও বিড়ম্বনা হয়নি তাদের। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার রুবেল বসাক আজাদীকে বলেন, কেন্দ্রের মোট ভোটার ৩ হাজার ৮৯৯। সাড়ে ৮টা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় কাস্ট হয়েছে ১৮০টি। সকালে ভোটারদের লাইন ছিল বলে জানান তিনি।

শুধু নাসিরাবাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নয়, নগরের বাকি ভোটকেন্দ্রগুলোতেও কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে গতকাল শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত নগরের শতাধিক ভোটকেন্দ্র আলাদাভাবে ৭ম পৃষ্ঠার ৬ষ্ঠ কলাম

পরিদর্শন করে আজাদীর ১০ জন সদস্য। পরিদর্শনকালে কোথাও বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খল কিছু দেখা যায়নি। ভোটারদের কাছ থেকেও পাওয়া যায়নি বড় ধরনের অভিযোগ। বিভিন্ন কেন্দ্রে নানা বয়সী ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা গেছে। তাদের বেশিরভাগই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। এছাড়া বেশ কিছু কেন্দ্রে সকালে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে বেড়েছে উপস্থিতি।

পরিদর্শনকালে অনেকগুলো কেন্দ্রে সব প্রার্থীর এজেন্ট দেখা যায়নি। তবে কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসাররা জানিয়েছেন, এজেন্টরা নিজ থেকে আসেননি। যারা এসেছেন তারা দায়িত্ব পালন করেছেন।

ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কদমতলী পোস্তারপাড় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন হাই স্কুল কেন্দ্রে দুপুর দেড়টার দিকে বিএনপি ও দাঁড়িপাল্লার সমর্থকদের মধ্যে দুই দফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রথমবার দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। দ্বিতীয়বার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তিনজনকে আটক করে।

জামায়াত প্রার্থী অবরুদ্ধ : দুপুরে বাকলিয়ার একটি ভোটকেন্দ্রে চট্টগ্রাম৯ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হককে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময় যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে সেনাবাহিনী তাদের ধাওয়া দেয়। ডা. একেএম ফজলুল হক বলেন, আমি কেন্দ্রে এসেছি। যদি প্রার্থী কেন্দ্রে যেতে পারবেন না এমন আইন থাকত তাহলে আমি যেতাম না। আইন মেনে গেছি। আমার সাথে একজন ছিল, বাকিরা বাইরে ছিল। এরপরও তারা এমন করবে কেন? আবু সুফিয়ান ও তারেক রহমানকে এর উত্তর দিতে হবে।

দীর্ঘ লাইন ছিল যেসব কেন্দ্রে : সকাল পৌনে ১২টার দিকে পাহাড়তলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। লাইনে দাঁড়ানো এক ভোটার আজাদীকে বলেন, ২০২৩ সালে ভোটার হয়েছিলাম। কিন্তু ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রথম ভোটটা দিতে পারিনি। এবার সকাল থেকে পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ছিল। তাই জীবনের প্রথম ভেটি দিতে চলে আসলাম। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার খায়রুল আমিন বলেন, কেন্দ্রের মোট ভোটার ২ হাজার ৮১৭টি। এর মধ্যে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কাস্ট হয়েছে ৮৮২ ভোট।

এদিকে সকাল সাড়ে ৭টায় ভোট শুরুর আগে থেকেই নগরের বহদ্দারহাট এখলাছুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়িয়ে যান ভোটাররা। কেন্দ্রের ভেতর থেকে এ লাইন চলে আসে কেন্দ্রের বাইরে পর্যন্ত। রবিউল নামে এক ভোটার আজাদীকে জানান, তিনি আগেভাগে চলে এসেছেন যাতে দ্রুত ভোট দিতে পারেন। কিন্তু এসেই দেখেন তারও আগে অনেকে চলে এসেছেন।

এছাড়া সকাল সাড়ে ৭টায় লম্বা লাইন দেখা গেছে শুলকবহর আরাকান হাউজিং সোসাইটির মডার্ন আইডিয়াল স্কুলে। সকাল ৯টা ১১ মিনিটে চট্টগ্রাম সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে দেখা গেছে ভোটারের লাইন। এ সময় ভোট দিয়ে বের হওয়া সুমাইয়া বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার তপন কান্তি দে আজাদীকে বলেন, মোট ভোটার ৩ হাজার ৮১৪। এক ঘণ্টায় কাস্ট হয়েছে ৮৩ ভোট।

সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে ঝাউতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে দেখা যায় সেখানে দুটি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে একটি কেন্দ্রে মহিলা ও পুরুষের লাইন দেখা গেছে। কেন্দ্রের বাইরে ছিল সেনাবাহিনীর অবস্থান।

সকাল ১০টায় ইউসেপ আমবাগান ইনস্টিটিউট ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে ভোটারের দীর্ঘ লাইন। কেন্দ্রটির আনুমানিক ৫০ গজ দূরত্বে ছিল রেললাইন। সেখানে ভিড় করছিল বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা। এ সময় সেনাবাহিনী তাদের সরিয়ে দিচ্ছিল।

সকাল ১১টা ৪১ মিনিটে উত্তর কাট্টলী মুন্সীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ভোট দিতে আসেন চট্টগ্রাম১১ আসনের প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যদিও এটা চট্টগ্রাম৪ আসনভুক্ত। এ সময় আমীর খসরু বিএনপির জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার জানান, এ কেন্দ্রের নারী ভোটকেন্দ্রে ৩৬৬৭ ভোটার এবং পুরুষ কেন্দ্রে ৩৬৫১ জন ভোটার আছেন। বেলা ১১টা পর্যন্ত পুরুষ কেন্দ্র ৮২৯টি ভোটগ্রহণ হয়েছে, যা মোট ভোটের ২২ শতাংশ। এছাড়া নারী ভোটকেন্দ্রে বেলা ১১ পর্যন্ত ১৬ শতাংশ ভোটগ্রহণ হয়েছে। এ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা শারীরিক প্রতিবন্ধী গোপাল দাশ বলেন, সুন্দরভাবে ভোট দিয়েছি। ৮০ বছরের আরেক ভোটার রণজিৎ কুমার মল্লিক বলেন, ভোট দিয়েছি, কোনো সমস্যা হয়নি।

বেলা সাড়ে ১১টায় খুলশী থানার আমবাগান এলাকায় খুলশী রেলওয়ে এমপ্লয়ীজ গার্লস হাই স্কুল কেন্দ্রে দেখা গেছে, বিউটি দাশ নামে সত্তরোর্ধ্ব নারী ভোট দিতে এসেছেন এক হাতে লাঠির উপর ভর দিয়ে। তাকে ধরে রেখেছেন নাতনি সিন্ধু দাশ। বিউটি দাশ বলেন, হাঁটতে পারি না। ঘরের সবাই ভোট দিতে আসতে নিষেধ করেছিল। তারপরও কষ্ট করে চলে আসলাম।

দুপুর ১২টায় বন্দর পূর্ব আবাসিক এলাকা প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে, কেন্দ্র প্রায় ফাঁকা। মাঝেমধ্যে কয়েকজন ভোটার আসছেন। তারা ভোট দিয়ে দ্রুত চলেও যাচ্ছেন। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার অমৃত কুমার শাহ জানান, ভোট ভোটার ৩ হাজার ৩৮৫ জন। ১২টা পর্যন্ত কাস্ট হয়েছে ৮৮৮ ভোট।

এর আগে ১২টায় বন্দর মোহম্মদীয়া দাখিল মাদ্রাসায় একটি বুথে ভোটারের লম্বা লাইন দেখা গেছে। একটার দিকে শাপলাকুঁড়ি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে, ভোটারের উপস্থিতি কম। কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মুনতাসির মামুন বলেন, মোট ভোটার ৩ হাজার ১৬৯টি। ১২টা পর্যন্ত কাস্ট হয়েছে ৮৯১ ভোট। তিনি জানান, কেন্দ্রে কোনো সমস্যা হয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে সবাই ভোট দিয়েছেন।

এর আগে সকাল সাড়ে ১১টায় ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম৯ আসনভুক্ত এ কেন্দ্রে সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট নেই। এ কেন্দ্রের মোট ভোটার ৪ হাজার ৮৬ জন। আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ৫ হাজার ১৯৬ জন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রটি ছিল প্রায় ভোটারশূন্য।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে উৎসবমুখর ভোট
পরবর্তী নিবন্ধসব সময়ের মতো মানুষ বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে : খসরু