বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম শুধু একটি বন্দরনগরী নয়; দেশের ব্লু ইকোনমি বা নীল অর্থনীতিকে বাস্তব অর্থনীতিতে রূপ দেওয়ার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠার প্রায় সব উপাদানই এখানে রয়েছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সামুদ্রিক সম্পদকে পরিকল্পিত, বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসইভাবে কাজে লাগাতে পারলে আগামী দশকে রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, পর্যটন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যেতে পারে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সামুদ্রিক এলাকার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এই বিশাল সমুদ্র অঞ্চলকে শুধু জলসীমা হিসেবে দেখলে চলবে না। মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সামুদ্রিক শৈবাল, পর্যটন, তেল–গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নৌপরিবহন্তসব মিলিয়ে এটি হতে পারে আমাদের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত। আর এই সম্ভাবনার স্বাভাবিক কেন্দ্র চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চল। চট্টগ্রাম বন্দর, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যমান শিল্পভিত্তি, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণের অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং দীর্ঘ উপকূল সবকিছুকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় যুক্ত করার সময় এসেছে.
গভীর সমুদ্রের মৎস্য ও টুনা শিল্প:
বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ এখনো প্রধানত উপকূলীয় ও অগভীর সমুদ্রকেন্দ্রিক। অথচ গভীর সমুদ্রে টুনাসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের মাছ আহরণের সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও আমরা এখনো এই সম্ভাবনাকে একটি সংগঠিত রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপ দিতে পারিনি। এ জন্য আধুনিক গভীর সমুদ্রগামী মাছ ধরার জাহাজ, উন্নত নৌচলাচল ও মাছ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থা এবং শক্তিশালী কোল্ড চেইন প্রয়োজন। তবে শুধু মাছ আহরণ করলেই হবে না। আহরণ থেকে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শেষ পর্যন্ত রপ্তানি পুরো ব্যবস্থাকে একই ধারায় আনতে হবে। এখানেই গভীর সমুদ্রে ট্রান্সশিপমেন্ট বা এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে মাছ স্থানান্তরের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটিকে শুধু মৎস্য রপ্তানিকারকদের ব্যবসায়িক সুবিধার দাবি হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক তাৎপর্য উপেক্ষিত হবে। মাছ ধরার জাহাজকে প্রতিবার আহরিত মাছ নিয়ে বন্দরে ফিরতে হলে তার কার্যকর সময় কমে এবং জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় বাড়ে। নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় অনুমোদিত হিমায়িত পরিবহন জাহাজে সমুদ্রেই মাছ স্থানান্তরের সুযোগ থাকলে মাছ ধরার জাহাজ দীর্ঘ সময় গভীর সমুদ্রে থাকতে পারবে। অন্যদিকে পরিবহন জাহাজ দ্রুত মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে পৌঁছে দিতে পারবে। বিশ্বের বিভিন্ন টুনা আহরণকারী অঞ্চলে এমন ব্যবস্থা রয়েছে, তবে তা কঠোর নজরদারির অধীন। বাংলাদেশেও জাহাজের অবস্থান সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, আহরিত মাছের প্রজাতি ও পরিমাণের তথ্য সংরক্ষণ, নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর এবং প্রতিটি চালানের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা রেখে প্রথমে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে এটি চালু করা যেতে পারে.
মাছ ধরার চেয়েও বড় সুযোগ প্রক্রিয়াজাতকরণে:
আমাদের লক্ষ্য শুধু মাছ ধরা কিংবা কাঁচা মাছ রপ্তানি হওয়া উচিত নয়। বড় অর্থনৈতিক সুযোগটি রয়েছে মূল্য সংযোজনে। থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মালদ্বীপের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশও নিজস্ব আহরিত মাছের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে বৈধভাবে আমদানি করা কাঁচামাল দেশে প্রক্রিয়াজাত করে পুনঃরপ্তানির সুযোগ বিবেচনা করতে পারে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে টুনাসহ সামুদ্রিক মাছ হিমায়ন, ক্যানজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ, সংরক্ষণ ও রপ্তানির সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে উঠলে একটি নতুন শিল্পখাত সৃষ্টি হতে পারে। এতে আমাদের সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানি শুধু চিংড়ি ও কয়েকটি প্রচলিত পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; নতুন পণ্য ও নতুন আন্তর্জাতিক বাজার তৈরি হবে। অর্থাৎ গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ, নিয়ন্ত্রিত ট্রান্সশিপমেন্ট, দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিশ্ববাজারে রপ্তানি এই পুরো শৃঙ্খলকে একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। এখানেই রয়েছে রপ্তানি বহুমুখীকরণের বড় সুযোগ।
সামুদ্রিক শৈবাল: উপকূলের নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল পাওয়া যায়। বিশ্ববাজারে খাদ্য, প্রসাধনী, ওষুধ ও জীবপ্রযুক্তি শিল্পে এর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার উপকূলে পরিকল্পিতভাবে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তুললে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করার বড় সুযোগ রয়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উপযোগী প্রজাতি নির্বাচন, পরীক্ষামূলক চাষ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা এবং সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা করা গেলে সামুদ্রিক শৈবালও ভবিষ্যতে একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হতে পারে.
পর্যটনেও সমুদ্রকে নতুনভাবে দেখতে হবে:
আমাদের সমুদ্র পর্যটন এখনো প্রধানত কক্সবাজারের সৈকতকেন্দ্রিক। অথচ মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখায়, সমুদ্রকে কেন্দ্র করেই একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন এবং চট্টগ্রাম–কক্সবাজার উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলের উপযোগী স্থানে পরিকল্পিত রিসোর্ট, নৌভ্রমণ, ইয়টিং, স্কুবা ডাইভিং, সার্ফিং, স্পোর্টস ফিশিংসহ পরিবেশবান্ধব সামুদ্রিক পর্যটনের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনসুবিধা গড়ে উঠলে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। তবে মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কাকে হুবহু অনুকরণ করার প্রয়োজন নেই। আমাদের ভূপ্রকৃতি, পরিবেশ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে নিজস্ব মডেল তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সেন্টমার্টিনের মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় পর্যটকের ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মিঠাপানির ব্যবহার এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়ন ও প্রকৃতি সংরক্ষণ দুটিকেই পাশাপাশি চলতে হবে।
তেল–গ্যাস অনুসন্ধান: জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন দুয়ার:
ব্লু ইকোনমির আলোচনায় বঙ্গোপসাগরের তলদেশে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির জন্য বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের অফশোর ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি আকৃষ্ট করা তাই সময়ের দাবি। বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস বা তেলের মজুত পাওয়া গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রতিটি পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি সমুদ্রবায়ু, ঢেউ, জোয়ার–ভাটা এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনাও যাচাই করা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি অংশ সমুদ্র থেকে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
মাতারবাড়ি ও অর্থনৈতিক অঞ্চল: সম্ভাবনাগুলোকে যুক্ত করার সুযোগ:
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। একই সঙ্গে কক্সবাজার–মহেশখালী এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল ও জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে সরকারি উদ্যোগ রয়েছে। তাই নতুন করে বিচ্ছিন্ন কোনো সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির পরিবর্তে বিদ্যমান ও পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকে ব্লু ইকোনমির অগ্রাধিকার খাতগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে যুক্ত করা অধিক কার্যকর হতে পারে। এভাবেই বৃহত্তর চট্টগ্রাম–কক্সবাজার অঞ্চলকে ঘিরে একটি ব্লু ইকোনমি করিডর গড়ে তোলার কথা ভাবা যায় যেখানে বন্দর ও নৌপরিবহন, গভীর সমুদ্রের মৎস্য, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোল্ড চেইন, পর্যটন, জ্বালানি এবং রপ্তানিমুখী শিল্প একে অন্যের পরিপূরক হবে।
প্রয়োজন বিনিয়োগ, অর্থায়ন ও দক্ষ জনশক্তি:
এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ দিতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। গভীর সমুদ্রগামী জাহাজ, হিমায়িত পরিবহন জাহাজ, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কোল্ড চেইন, রিসোর্ট, পর্যটন ও জ্বালানি অবকাঠামো সবই মূলধননির্ভর। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতকে তাই এই উন্নয়নযাত্রার অংশীদার করতে হবে। বিশেষ ঋণসুবিধা, পুনঃঅর্থায়ন, সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্ব এবং বিদেশি বিনিয়োগের উপযোগী নীতি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সমুদ্রবিজ্ঞান, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি, নেভিগেশন, গভীর সমুদ্রের মৎস্য আহরণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সামুদ্রিক পর্যটনে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।
সম্ভাবনার সমুদ্র থেকে সমৃদ্ধির পথে:
ব্লু ইকোনমি কোনো একটি শিল্পের নাম নয়। মৎস্য, ট্রান্সশিপমেন্ট, টুনা প্রক্রিয়াজাতকরণ, সামুদ্রিক শৈবাল, পর্যটন ও রিসোর্ট, তেল–গ্যাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন্দর, নৌপরিবহন এবং রপ্তানি সবই একই অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিভিন্ন অংশ। এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে একটি সুস্পষ্ট চট্টগ্রাম–কক্সবাজারকেন্দ্রিক ব্লু ইকোনমি মহাপরিকল্পনা যেখানে সরকার, বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত একই লক্ষ্যে কাজ করবে। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিকভাবে মৎস্যসম্পদের মজুত নিরূপণ, আহরণের সীমা নির্ধারণ এবং সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। সমুদ্র আমাদের বিপুল সম্ভাবনা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই সম্ভাবনাকে টেকসইভাবে সম্পদে, সম্পদকে মূল্য সংযোজনে এবং মূল্য সংযোজনকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সমৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া। সঠিক পরিকল্পনা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে পারলে চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী নয় বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্লু ইকোনমি হাব হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও ব্যাংকার।












