এক নিমেষেই শেষ হয়ে গেল একটি পরিবারের সব আনন্দ। বন্ধুর মৎস্য খামারে সপরিবারে বেড়াতে গিয়ে নৌকাডুবির এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৫ বছরের এক শিশু। আর সেই শিশুকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচাতে গিয়ে খামারের পানিতে ডুবে মারা গেছেন খামার মালিক নিজেই। গত শনিবার (৩০ মে) ফটিকছড়ির পাইন্দং ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ডলু সেনাবাহিনী ক্যাম্পের সামনের একটি মৎস্য খামারে এই ঘটনাটি ঘটে।
নিহতরা হলেন, ফটিকছড়ি পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের কে.এম টেক এলাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আজাদের আদরের ৫ বছর বয়সী শিশুকন্যা মুনতাহিনা এবং পাইন্দং ইউনিয়নের দক্ষিণ পাইন্দং এলাকার আবুল কাশেম সর্দারের ছেলে ও মৎস্য খামার মালিক মোহাম্মদ মফিজ (৪৫)।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ছুটির দিনে একটু আনন্দে দিন কাটাতে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আজাদ তার পরিবার নিয়ে পাইন্দং এলাকায় বন্ধু মফিজের মৎস্য খামারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বিকেলের মিষ্টি রোদে খামারের শান্ত পানিতে একটি ছোট নৌকায় চড়ে আজাদ ও ৩টি শিশু আনন্দে মেতে উঠেছিল। হাসি–কান্নায় মুখরিত সেই আনন্দ মুহূর্তটি হঠাৎ করেই থমকে যায়, যখন নৌকাটি হঠাৎ উল্টে গেলে সবাই পানিতে তলিয়ে যায়।
পুকুরপাড়ে থাকা খামার মালিক মফিজ বন্ধুর পরিবারের এই বিপদ দেখে এক মুহূর্তও দেরি করেননি। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে ঝাঁপিয়ে পড়েন পানিতে। একে একে দুটি শিশুকে অক্ষত অবস্থায় টেনে তুলেন পাড়ে। কিন্তু তখনও পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছিল আজাদের ৫ বছরের ফুটফুটে কন্যাসন্তান মুনতাহিনা। ছোট শিশুটিকে বাঁচাতে মফিজ আবারও মাথা সমান পানিতে ডুব দেন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, অন্যকে জীবনদানকারী মফিজ নিজেই আর পানির ওপর ভেসে উঠতে পারেননি। পরে স্থানীয়রা মফিজকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পানির অতলে হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট মুনতাহিনার কোনো সন্ধান মিলছিল না। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। খামারের চারপাশে জড়ো হন শত শত মানুষ। প্রশাসনের কোনো উদ্ধারকারী দল তখনও এসে পৌঁছাতে না পারায় স্থানীয়রাই বাঁশ আর হাতজাল নিয়ে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকেন মুনতাহিনাকে।
তখন খামারের পাড়ে বসেছিলেন এক অভাগা মা। মুনতাহিনার মা কণা আক্তারের আর্তনাদ আর বুকফাটা আহাজারিতে উপস্থিত শত শত মানুষের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। মেয়ে হারিয়ে পাগলপ্রায় মা শিশুর ফেলে যাওয়া ছোট্ট একজোড়া জুতো বুকে চেপে ধরছিলেন, বারবার তা মুখে লাগিয়ে ককিয়ে উঠছিলেন। এক মায়ের এই অবর্ণনীয় কষ্ট আর বোবা কান্না যেন পুরো ফটিকছড়ির বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল।
অবশেষে দীর্ঘ চার ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস ও আকুল খোঁজাখুঁজির পর খামারের পানি থেকে ভেসে ওঠে নিষ্পাপ শিশু মুনতাহিনার নিথর দেহ। যে মফিজ নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে দুই শিশুকে বাঁচিয়ে হিরো হলেন, তিনিও আজ পরপারে। আর যে পরিবারটি হাসিমুখে বেড়াতে এসেছিল, তারা ফিরছে বুক খালি করে। একই দুর্ঘটনায় এই দুটি প্রাণহানি ফটিকছড়ির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।
খামারের কর্মচারী মোহাম্মদ শামসুল আলম বাসেক বলেন, তারা বেড়াতে এসে পুকুরে নৌকা নিয়ে ঘুরছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর নৌকাটি উল্টে যায়। বাচ্চারা ডুবে যাচ্ছিল। আমার মালিক চিৎকার দিয়ে তাদের উদ্ধার করতে যান। দুজনকে তুলতে পেরেছিলেন পরে অন্য একজনকে তুলতে গিয়ে তিনি নিজেই ডুবে যান। আমি সাঁতার জানি না তাই পানিতে নামতে পারিনি।
এ ব্যাপারে ফটিকছড়ি থানার ওসি রবিউল আলম খান বলেন, ঘটনাটি জানামাত্র থানা পুলিশ সেখানে গিয়েছে। নিহত দুজনের লাশ আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমরাও গভীর শোকাহত।












