বিদ্রোহীর রূপতত্ত্ব

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত | শুক্রবার , ২৮ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৩২ পূর্বাহ্ণ

বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন আর বাংলা কাব্যভাষাকে দ্রোহের চেতনা ধারণের যোগ্য ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা দান করেন। কবিতাটি প্রকাশের শতবছর পূর্তির কালে ভাষাবিজ্ঞান আর শৈলীবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাটির বিশ্লেষণ করে দেখা যেতে পারে কী নন্দনতত্ত্ব বিরাজমান একশত একচল্লিশ পঙক্তির কবিতাটিতে। বিদ্রোহী কবিতায় আমাদের হিসেবে আটশত শব্দ, আর একই শব্দের একাধিক ব্যবহার বাদ দিলে শব্দ সংখ্যা: চারশত সাতাশি। কবিতাটি নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে যেমন সত্য, এসব আলোচনার মধ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্যও অতি অল্প নয়। তাত্ত্বিক আলোচনার মাধ্যমে অপসৃত হবে এসব বিভ্রান্তি আর অস্পষ্টতা, একই সাথে বিদ্রোহী চেতনায় বিকশিত হবে বাঙালি জাতি ও তাঁর বাংলা ভাষা। ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখা যায়: ‘বল’ রূপটি বাংলা ভাষায় বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে; এমনকি ক্রিয়াপদ রূপেও যে এর এতো ব্যঞ্জনা তা নজরুলের কাব্যভাষায় প্রমাণিত। তিনি নিজেকে বীর বলছেন না, বলছেন অন্যকেবলছেন বাঙালিকেবলছেন ভারতীয়দেরতোমরা বল: তোমরা বীর। এভাবেই বড় বড় লড়াইয়ে নেতা তাঁর অনুসারীদের অনুপ্রাণিত করেছেন। তাই দেখা যায় ব্রিটিশের পক্ষে যুদ্ধ করা কবি নজরুলও অন্যত্র বলেন, ‘এদেশ ছাড়বি কিনা বল,/ নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ বর্তমান আলোচনায় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে আলোকপাত করে নজরুলের দ্রোহের ব্যাকরণ বিষয়ক আরও বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যেতে পারে।

শব্দবিশ্লেষণের জনপ্রিয় নাম ব্যাকরণ আর ব্যাকরণ বলতে বোঝানো হতো রূপতত্ত্ব। কবিতার আলোচনায় দেখা যায়: চিত্রশিল্পীর কাছে যেমন রঙ অপরিহার্য তেমনি কবির কাছে শব্দ বা রূপের কোনো বিকল্প নেই। কবিতায় নিত্যব্যবহার্য কোনোএকটি শব্দ নিয়ে ভেবে দেখলে দেখা যাবে যে তার বিষয়নির্দেশক অভিধানিক অর্থ ব্যতীত তার সঙ্গে বহুতর চিত্রকল্পের ও তৎসংশ্লিষ্ট আবেগের আনুষঙ্গিক যোগ বিদ্যমান। কবির শব্দচয়ন ও বিন্যাসের অভিপ্রায় এই আনুষঙ্গিক চিত্রকল্প সমাবেশে উদ্দিষ্ট ভাবাবেগ জাগিয়ে তোলা। সকল কবিই ভাষাদিয়ে কবিতা লেখেন, তবু কবিতার পঙ্‌ক্তি বা তার ব্যবহৃত শব্দভাষা দেখেই পাঠক কবিকে শনাক্ত করতে পারেন অনায়াসে। বিশেষত কাজী নজরুল ইসলামের মতো প্রান্তীয় লোকজীবন থেকে উঠে আসা কবির লৌকিক অভিজ্ঞতার অন্তর থেকে যখন আবির্ভূত হয় অনন্য শব্দরূপে সমৃদ্ধ স্বতন্ত্র এক কাব্যভাষা। এই কাব্যভাষার প্রথম প্রকাশ ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়।

সমকালীন সমাজরাজনীতি সচেতন কবির বিদ্রোহী কবিতার শব্দগুলো চড়া সুরে বাঁধা স্লোগান নয় শুধু, লড়াইয়ের হুংকার ছেড়ে কবি বলেন, ‘আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদচিহ্ন! / আমি খেয়ালীবিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!’ উত্তেজনাময় রক্তটগবগ আবেগে আপ্লুত শব্দরাশিতে পৌরাণিক চিত্রকল্পমিথ ব্যবহার করে কবির সুতীক্ষ্ন ক্ষুরধার বাণীর উত্তপ্ত লাভাস্রোতে সিক্ত হয়ে ওঠে বাংলা ভাষার সেসব শব্দ। কবিতার পাঠকমাত্রই অবগত আছেন, কবি সত্যকে দেখেন রূপেরসেগন্ধেবর্ণেস্পর্শে, প্রাণের উচ্ছলতায়। এই প্রাণময় গীতল সত্যকে কবি ভোক্তার চেতনায় সঞ্চার করেন শব্দের অলৌকিক রহস্যময় স্থাপত্যে। তাইতো কবিতার শব্দ দিয়ে কীভাবে জনমানসে উদ্দীপনা সৃষ্টি করা যায় কিংবা রাজনৈতিক চেতনায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা যায়তা বিদ্রোহী কবিতায় প্রমাণিত। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ভাষায়: ‘কবিতার জ্বলন্ত দীপ্তি এমন তীব্র যে ছাপার অক্ষরেই যেন আগুন ধরিয়ে দেবে। গাইবার গান নয়, চিৎকার করে পড়বার এমন কবিতা এদেশের তরুণেরা যেন এই প্রথম হাতে পেয়েছিল।’ আবার প্রেমময় শব্দেও পরিপূর্ণ বিদ্রোহী কবিতার বেশ কিছু পঙ্‌ক্তি। যেমন:

চিত চুম্বনচোর কম্পন আমি থরথরথর প্রথম পরশ কুমারীর!

আমি গোপনপ্রিয়ার চকিত চাহনি, ছলক’রে দেখা অনুখন,

আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকনচুড়ির কনকন!’

বিদ্রোহীর আরেকটি পঙক্তিতে কবি তাঁর স্বরূপ ব্যক্ত করেছেন, ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর রণতূর্য;’। এমন রূপ তাঁর ব্যবহৃত শব্দরূপেও দৃশ্যমান। কাব্য সমালোচক যথার্থই বলেন, কঠোরতা ও কোমলতার এই অপূর্ব মেলবন্ধন বাংলা কবিতায় আর নেই। শুধু কবিতা কিংবা সংগীতসাহিত্য নয় বাংলা ভাষার অভিধানে আজও অন্তর্ভুক্ত হয়নি এমন অনেক শব্দেরূপমূলে পরিপূর্ণ বিদ্রোহী কবিতা। এমনি একটি সমাসবদ্ধ শব্দ: ‘অগ্নিপাথার’। নজরুলের ভাষায়:‘আমি অচেতনচিতে চেতন’। অচেতন মানে চেতনাহীন, মূর্খ; চিত্ত থেকে কোমল কাব্যিক রূপ চিতএর সাথে এ বিভক্তি যোগে চিতে। এই শব্দজোড়ও বাংলাদেশের কোনো অভিধানে আমরা খুঁজে পাইনি। এথেকেই অনুমান করা যায় বিদ্রোহী কবিতা রচনার শতবছর পরও আমরা কতোটা ‘অচেতনচিতে চেতন’ আছি।

বিদ্রোহী’র কাব্যভাষার আরেকটি বৈশিষ্ট্যআরবি শব্দের সাথে সমার্থক সংস্কৃত বা খাঁটি বাংলা শব্দ পাশাপাশি ব্যবহার করে বাগর্থ খোলাসা করবার কৌশল। কবির কাব্যকৌশলে ‘অত্যাচারীর’ আসনতো কেঁপে ওঠেই, এমনকি ‘ভয়ে সপ্তনরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া’। আরেকদিকে ‘উৎপীড়িতের’ চিত্তে মুক্তির সংগ্রামের প্রতিধ্বনি বেজে ওঠে: ‘তাজি বোর্‌রাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার হিম্মৎহ্রেষা হেঁকে চলে’। এখানে আরবি ‘হিম্মৎ’ এর সাথে সংস্কৃত ‘হ্রেষা’ শব্দের সমাসগঠন করে কবি সমন্বয়ের যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন বাংলায় আজও তা বিরল। এমনকি দুই ধর্মের ধ্বংসের ধ্বনিকেও এক করে দিয়ে লিখেছেন:

আমি ঈশানবিষাণে ওঙ্কার,

আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহাহুঙ্কার,

দুই ধর্মের প্রলয় সংকটকে কবি তাঁর কাব্যভাষায় অভিন্ন সত্তায় স্থাপন করে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার রূপমূল ভাণ্ডারের আভিধানিক ব্যাপ্তি বৃদ্ধি করেছেন। নজরুল অভিধান শব্দসূত্রে মুসলিম সংস্কৃতির মানসচিন্তনের দিকেই শুধু নয়, হিন্দুসংস্কৃতির গভীর দ্যোতনার দিকে বাঙালিকে উৎসুক করে তুলতে পেরেছিলেন।

শব্দরূপ দিয়ে বাঙালিকে ভক্তিমন্ত্র থেকে মুক্তি দিয়ে শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত করেছেন। যে কারণে নজরুল অসুস্থ হবার বছরে ‘নবযুগ’ পত্রিকায় (১৯৪২) ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে লেখেন: ‘বাংলা বাঙালির হোক! বাংলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক’।

বাঙালিকে জয়যুক্ত করতে তিনি বিদেশি বেনিয়াদের বিরুদ্ধে শব্দাস্ত্র ব্যবহার করেছেন। অথচ আজকে আমরা তাঁর শব্দের বা রূপের যথার্থ ব্যবহারে ব্যর্থ। আমাদের ব্যবহারিক অভিধানে তাঁর অনেক শব্দই অন্তর্ভুক্ত হয়নি; বিশ্লেষণতো দূরে থাক। এ কারণেই তিনি সুশ্রাব্য ও আপাতসহজ কবি হয়েও কঠিন কবি। তাই বিদ্রোহী কবিতায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দের রূপতাত্ত্বিকঅর্থতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পাশাপাশি এগুলোকে আমাদের অভিধানে ভুক্তিরূপে গ্রহণ করে বর্তমান ভাষায় প্রয়োগ করলে বাঙালির বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে চলা সহজতর হবে এই নজরুলবর্ষ থেকে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশ্রাবণের ধারায়
পরবর্তী নিবন্ধজুলুসে চান্দগাঁও ও মুরাদপুর এলাকায় তবারুক বিতরণ