বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নেটওয়ার্ক সংকট

আলীকদমের কুরুকপাতা

আলাউদ্দীন শাহরিয়ার, বান্দরবান | শনিবার , ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় পাহাড়ের বুক চিরে চলে গেছে দৃষ্টিনন্দন প্রশস্ত সড়ক। এই সড়কে বদলেছে একসময় দুর্গম বলে পরিচিত কুরুকপাতা ইউনিয়নের যোগাযোগের চিত্র। কিন্তু সড়ক যেখানে শেষ, সেখান থেকেই যেন শুরু হয় অন্য এক বাস্তবতা। সূর্য ডুবলেই অন্ধকার নেমে আসে পাহাড়ি পল্লীগুলোতে। ঘরে বিদ্যুতের আলো না পৌঁছায় অন্ধকারে কুপি বাতির আলোয় লেখাপড়া করে শিক্ষার্থীরা। অসুস্থ হলে ছুটতে হয় দূরের উপজেলা সদরে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে গুনতে হয় বাড়তি পরিবহন খরচ। মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেটের সেবাও নেই। নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবনও। এতে সড়ক যোগাযোগ থাকলেও জীবনযাত্রার মান বদলায়নি কুরুকপাতা ইউনিয়নটির।

জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা জানান, মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা আলীকদম উপজেলার এই কুরুকপাতা ইউনিয়নে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের বসবাস। ম্রো, ত্রিপুরা, খুমিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ পাহাড়ের দুর্গম পাড়াগুলোতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে বসবাস করেন। কুরুকপাতা বাজার ও পৌহমুহুরী পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হলেও ইউনিয়নের অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো পৌঁছায়নি সেই সুবিধা। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ এখনো পৌঁছায়নি এখানে। কেউ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, কেউ কেরোসিনের বাতি জ্বালান। প্রয়োজনের সময় মুঠোফোনের আলোও হয়ে ওঠে ভরসা।

কুরুকপাতার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আলীকদম উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার। সড়ক থাকলেও অনেক পাড়ায় যেতে হয় মাতামুহুরী নদীপথে। আবার কোনো কোনো এলাকায় কয়েক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে যেতে হয়। দুর্গম এই জনপদে বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি চিকিৎসাসেবা নিয়ে। ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সাধারণ চিকিৎসার জন্যও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা, সরকারি সেবা কিংবা জরুরি যোগাযোগ–সব ক্ষেত্রেই বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হয় বাসিন্দাদের।

স্থানীয় রামপু ম্রো বলেন, রাতে কেউ অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। কাছাকাছি চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। রোগী নিয়ে বের হতে হয় অনেক দূরের পথে। সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া যাবে কিনা, সেই চিন্তাই আগে আসে। সিগরুং ত্রিপুরা বলেন, শহরে যে চিকিৎসা বা পরীক্ষা সহজে করা যায়, আমাদের এখানে সেটা করতে পুরো দিন চলে যায়। যাতায়াতের খরচও কম নয়। আর জন্মনিবন্ধনের জন্য শহরে যেতে আসা–যাওয়া হাজারের ওপর চলে যায়।

কুরুকপাতার মানুষের বড় অংশ কৃষিনির্ভর। পাহাড়ি ঢালে জুম ও নদীর কিনারায় নানা ধরনের ফসল ফলান তারা। কিন্তু উৎপাদনের পর বাজারে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্গম এলাকা থেকে কৃষিপণ্য পরিবহনে খরচ বেশি। বাজারে পৌঁছানোর পরও পণ্যের দামের ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে উৎপাদন খরচ, পরিবহন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। ফলে কঠোর পরিশ্রমের পরও কাঙ্ক্ষিত আয় থেকে বঞ্চিত হন অনেক কৃষক। সিংপাও ম্রো বলেন, শহর দূরে হওয়াতে কৃষিপণ্যে ন্যায্যমূল্য পাই না। জুমের কলার ছড়া, মিষ্টি কুমড়াসহ নানান সবজি শহরে নিয়ে গেলে দাম কমে যায়। আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি।

কুরুকপাতার সমস্যা এখানেই শেষ নয়। ইউনিয়নের অনেক এলাকায় এখনো নেই জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকার পাশাপাশি নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয়ও। ফলে ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিক সেবা পেতেও অনেককে ছুটতে হয় উপজেলা সদরে।

কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, আমার ইউনিয়ন এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট সুবিধা নেই। এ কারণে আলীকদম সদর ইউনিয়ন এলাকায় একটি ভাড়া করা কক্ষ থেকে ইউনিয়নের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, আলীকদমের কুরুকপাতা ইউনিয়নে নিজস্ব কার্যালয় নেই। কুরুকপাতাসহ এসব ইউনিয়নের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ চলছে। তবে রিজার্ভ ফরেস্ট হওয়ায় বন বিভাগের আপত্তির কারণে ইউনিয়ন পরিষদের ভবন নির্মাণে জটিলতা রয়েছে। এ বিষয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তির জন্য চিঠি পাঠানো হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, কুরুকপাতায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক–এসব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। সেখানে কীভাবে নেটওয়ার্ক সুবিধা আনা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নেটওয়ার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবান্দরবানে খালি নেই হোটেল মোটেল
পরবর্তী নিবন্ধ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম রেঞ্জে এক হাজার ২৪০ জন গ্রেপ্তার