বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্নত পরিবেশ তৈরি করুন

শনিবার , ২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
37

গত ৩০ অক্টোবর বুধবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন (এসইএসিও) এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর যৌথ উদ্যোগে বিজনেস টু বিজনেস বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর র‌্যাডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেনে। সেই বৈঠকে সরকারের প্রতিনিধি ও দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ দেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক চিত্র তুলে ধরেন। তথ্য প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, সড়ক, চট্টগ্রাম বন্দর, বস্ত্রসহ বিভিন্ন খাতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন তারা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. জাফর আলম চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি, কন্টেনার টার্মিনাল ও রেলওয়ে কন্টেনার পরিবহনের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ২০০৮ সালে ১০ লাখ কন্টেনার পরিবহন হয়েছিল। গত বছর সেটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ লাখ ৩০ হাজারে। আগামী দিনগুলোতে কন্টেনার পরিবহনের সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এক সময় আমাদের সমুদ্র বন্দরগুলোর অবস্থা ছিল হতাশাব্যঞ্জক। সেই ভঙ্গুর ব্যবস্থাপনা কেবল আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের অবাধ চলাচলের জন্যই নয়, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যই ছিল বড় অন্তরায়। পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলোর বন্দরের সুব্যবস্থাপনার কথা ছেড়ে দিলেও উপমহাদেশ ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বন্দরের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দরগুলোর অবস্থা তুলনা করলে দেখা যাবে আমাদের বন্দর ব্যবস্থাপনা খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। সেই বন্দর এখন অনেক এগিয়ে। তবু আরো কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে এর অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত হবে নিঃসন্দেহে। অবিলম্বে কিছু কিছু বন্দর সুবিধা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বন্দর সেবার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য যে প্রয়াস নেওয়া হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। বন্দর কর্তৃপক্ষকে বন্দর ব্যবহারকারীদের কাছে আরো দায়িত্বশীল হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। এসবের ওপর নির্ভর করে বন্দরের বিভিন্ন খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা।
দেশের শিল্পায়ন ও নানা খাতে বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিশ্চয়তা প্রদান করেন বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রহমত উল্লাহ মো. দস্তগীর। তিনি বৈঠকে বলেছেন, ২০২১ সালে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে দাঁড়াবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। ২০৩০ সালে সেটি ৪০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হবে। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে মোট বিনিয়োগে বেসরকারি খাতের অংশ ছিল ৩৩ শতাংশ। গত বছর সেটি বেড়ে হয়েছে ৪৬ শতাংশ। তিনি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি, সৌরবিদ্যুৎ ইত্যাদি খাতে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান।
বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ব্যবস্থায় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা, সিস্টেম লস, বিদ্যুৎ বিতরণে অব্যবস্থাপনা, লোডশেডিং- সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতে ছিল অসহনীয় অবস্থা। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ সরবরাহের অব্যবস্থাপনার কারণে নাগরিকদের মধ্যে ছিল সীমাহীন দুর্ভোগ। সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধি হওয়ার ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বিদ্যুতের ব্যবহার, উৎপাদন ও চাহিদা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনের উৎকর্ষ, জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ইত্যাদির সাথে নিবিড় সম্পর্ক আছে। তাই এই খাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গুরুত্বারোপ করতে হবে।
শিল্প উৎপাদনের প্রধানতম উৎপাদন হলো বিনিয়োগ। বিনিয়োগের সঙ্গে অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদান হলো উদ্যোগ, প্রযুক্তি, বাজার প্রভৃতি। দ্রুত শিল্পায়নের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বিনিয়োগের পরিবেশের ব্যাপারে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ধারণা যদি ক্রমাগতভাবে তিক্ততাপূর্ণ ও অভিজ্ঞতা নেতিবাচক হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনভাবে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহী হবেন না। দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিনিয়োগ বিষয়ে সমন্বয় থাকতে হবে। বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য মাঝে-মধ্যে এরকম উদ্দীপনামূলক বৈঠকের আয়োজন করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে যে, অর্থনীতির বিভিন্ন খাত ও বিষয় পরস্পর নির্ভরশীল ও ভিন্ন ভিন্ন খাত ব্যবসায়ী স্বার্থে একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও সম্পূরক। সম্পর্কটি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনার চিত্র বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে।

x