বিএনপির ২৭ দফা ও প্রাসঙ্গিক কথা

শঙ্কর প্রসাদ দে | বুধবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০২৩ at ৫:০২ পূর্বাহ্ণ

১৯ ডিসেম্বর’ ২২ বি.এন.পি’র পক্ষ থেকে উত্থাপিত ২৭ দফা কার্যত এ দেশের অর্ধশতকের ইতিহাসকে সামনে নিয়ে এসেছে। এ জাতি জন্ম নিয়েছিল ধর্মীয় মূল্যবোধভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে। জন্মের শুরু থেকে পাকিস্তানের উদ্যোক্তারা বলেছিল, পাকিস্তান হবে মুসলমানের দেশ। আর ১৯৪৮ সাল থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা বলা শুরু করল বাংলাদেশ হবে বাঙালির দেশ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃস্টান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমূহ সহ আমরা সবাই জাতীয়তায় বাঙালি আর নাগরিকত্বে বাংলাদেশী। পুরো পাকিস্তান আমলে এদেশে হিন্দুরা কি অবর্ণনীয় বৈষম্য, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার হয়েছিল তা কল্পনা করতে পারি, পুরোপুরি অনুধাবন অসম্ভব। হিন্দুরা এদেশে থাকার অধিকার নেই, পাক শাসকগোষ্ঠীর এই বক্তব্য ছিল খোলাখুলি। অন্য সব কারণ বাদ দিলেও এই একটি কারণে পাকিস্তান ভাঙতোই। ১৯৫৪ সালে সংখ্যালঘুরা ৭২ (বায়াত্তর) টি আসনে জিতেছিল। ১৯৫৫ সালেই হিন্দু নেতৃত্ব ও আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতৃত্বের মধ্যে সম্পাদিত ৫ দফা (পঞ্চশীলা) চুক্তি অনুযায়ী সংখালঘুরা ৭২ টি সংরক্ষিত আসন ত্যাগ করতে সম্মত হয়। মাওলানা ভাসানি ও বঙ্গবন্ধু মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে পুনর্জন্ম দিলেন ধর্ম নিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী দলের। বহু সমস্যা থাকার পরও ভারতীয় মুসলমানরা বলে না, আমরা বাংলাদেশে চলে যাব। অথচ গত পঁচাত্তর বছর ধরে বাংলার হিন্দুরা অব্যাহতভাবে ভারতমুখী। স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম সংকট সংখ্যালঘু নির্যাতন ও দেশত্যাগ। ২৭ দফায় সংখ্যালঘু সংকট সমাধানে একটি শব্দও নেই। ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ উক্তিটি হিন্দুদের কাটাঘায়ে নুন ছেটানোর সামিল। কত রকমের কমিশনের প্রস্তাব দেয়া হল। অথচ একবারের জন্যও দীর্ঘদিনের দাবী সংখ্যালঘু কমিশনের কথা উল্লেখ নেই। বঙ্গবন্ধু ২৪/০৩/১৯৭৪ থেকে শত্রু সম্পত্তি তালিকাভুক্ত হওয়া বন্ধ করেছিলেন। অথচ জেনারেল জিয়া ১৯৭৬ সালে, সেসব সম্পত্তি তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ জারী করলেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত শত শত মুক্তিযোদ্ধা দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আর হিন্দুরা দেশত্যাগ করে হাজারে হাজার। ১৯৯২ সালে ও ২০০১ সালে বেগম জিয়ার পীড়িতের ঠেলায় হিন্দুরা দেশত্যাগ করেছে লাখে লাখে। এটি মনগড়া কোনও আবেগী সংলাপ নয়। ২০১১ থেকে ২০২২ এর আদম শুনানিতে শতকরা ২ ভাগ হিন্দু কমে যাওয়া এর সরকারি স্বীকৃতি। অথচ জনাব তারেক ও ডা: মোশাররফ সংখ্যালঘু সংকট নিয়ে বিলকুল নীরব। চালাকী স্বল্প মেয়াদে বা কিছুকালের জন্য করা যায়। চিরকাল করা যায় না। ২৭ দফা সংখ্যালঘুদের সাথে মশকরার সামিল। এমন মশকরা করে আর যাই হোক ‘রেইনবো নেশন’ তৈরী করা যায় না।

রেইনবো নেশন তত্ত্বের উদ্ভাবক দক্ষিণ আফ্রিকার ধর্মগুরু (পাদ্রী) ডেসমন্ড টুডু। কয়েক শতাব্দী ধরে সাদা চামড়ার ইউরোপীয়ানরা দক্ষিণ আফ্রিকা শুধু শাসন করেনি, শতাব্দব্যাপী কালো মানুষদের উপর যে অবর্ণনীয় অত্যাচার করেছে তা মানবতা বিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য। শেষ পর্যন্ত নেলসন ম্যান্ডেলাকে একনাগাড়ে ২৬ বছর কারাগারে রাখার পরও কালোদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল হয়ে পড়েছিল অবধারিত। এ.এন.সি’র বিপ্লবী অংশ বলছিলেন, বৃটিশদের অবশ্যই ভারতের মতো দ. আফ্রিকা ত্যাগ করতে হবে এবং অতঃপর এদের অনেককে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। ডেসমন্ড টুডু তখন তার গান্ধীবাদী বিখ্যাত ‘রেইনবো নেশন’ তত্ত্ব হাজির করে বললেন, সাদা আর কালো এক সাথে মিলিত হয়েই দ. আফ্রিকা গড়তে হবে। নেলসন ম্যান্ডেলা ক্ষমতা নিয়েই টুডুর এই তত্ত্ব গ্রহণ করে গঠন করেন পৃথিবী বিখ্যাত ‘ট্রুথ কমিশন’। আমাদের সন্দেহ হচ্ছে বি.এন.পি ‘রেইনবো নেশন’ তত্ত্ব দিয়ে মূলত যুদ্ধাপরাধী সহ অতীতের সমস্ত অপরাধীদের ক্ষমা করে দেয়ার তাত্ত্বিক ভিত্তি রোপণ করছেন।

আসলে এ দেশে যে কোন ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনে সংখ্যালঘু জীবনে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ১৯৭৫, ১৯৯২ ও ২০০১ তার বড় প্রমাণ। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে যে কোনও বোঝাপড়ায় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিৎ করতে হবে। নির্বাচন হবে, লক্ষ লক্ষ হিন্দু দেশত্যাগে বাধ্য হবেএমন নির্বাচন আমরা হিন্দুরা চাই না। অতীতের কথা মনে পড়লে আমরা বহু বিজয়ী রাক্ষসের ছবি দেখি, ঘুম ভেঙে যায় সেসব বিজয়ী দৈত্যদের চেহারা মনে পড়লে। একটু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। পূর্ণিমা শীলের মা বলেছিল, বাবারে আমার মেয়েটা ছোট, তোমার যা করার আমাকে কর। বিজয়ী হারামজাদারা বলল, না তোর মেয়েকেই করবো। এখন রেইনবো তত্ত্ব দিয়ে ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ভুলে যাবার কথা বলা হচ্ছে বলে গভীর সন্দেহ হয়।

মূলা ঝুলানোর কথা বলার কারণ আছে। এই বিএনপি অতীতে কোন কথাটি রেখেছে? ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ভুলে যেতে বিএনপি’র নব্বই দিনও লাগে নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৮ দল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ৭ দল ও রাশেদ খান মেননদের বাম ৫ দল মিলে ঘোষণা করেছিল তিন জোটের রূপরেখা। ঐ রূপরেখায় ৪টি দফা ও ৮টি উপদফা ছিল। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর ১টি দফাও বাস্তবায়িত হয়নি। সংসদীয় অর্থাৎ সংসদ নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতির হাতেও অত ক্ষমতা থাকে না। ১৯৯১১৯৯৬ মেয়াদে বেগম জিয়া তিন জোটের রূপরেখায় উল্লেখিত ১টি কাজও সমাধা করেনি। উদ্যোগ নিলে অন্তত জনগণ সান্ত্বনা পেত। এজন্য বলছিলাম, মূলা ঝুলিয়ে লাভ খুব বেশি হবে না। এই প্রথম দেখলাম বিএনপি দিল্লী আর ভারত নিয়ে একদম চুপচাপ। একে শেয়ালের চুপ মেরে থাকার সাথে তুলনা করা যায়। কেউ কি স্বপ্নেও ভেবেছিল ২০০১ সালে হায়েনার নৃশংসতা নিয়ে বি.এন.পি হিন্দু আর আওয়ামীলীগারদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কেউ কি ভেবেছিল ২১ আগস্ট ২০০৪ প্রকাশ্য জনসভায় তারেকবাবর কয়েকজনকে বোমা দিয়ে বলবে, যাও শেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লীগকে গোষ্ঠীশুদ্ধ সাফ করে দিয়ে এসো। এ ঘটনার জন্য ক্ষমা চাওয়া দূরের কথা। বিচারপতি জয়নাল আবেদীনকে দিয়ে বলানো হলো এসব ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কারসাজি আর নোয়াখালীর খেটে খাওয়া সহজ, সরল, জজ মিয়াকে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করানো হল।

রেইনবো নেশন’ তত্ত্বের সাথে ‘রেইনবো সোসাইটি’ তত্ত্ব এখন আমেরিকায় বেশ জনপ্রিয়। সমকামীরা বলছে, বহুত্ববাদী আমেরিকায় সমাজ জীবনাচারে বহুত্ব প্রচলনে রাষ্ট্র বাধা দিতে পারে না। তাদের দাবী অনুযায়ী আমেরিকার বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সমকামীরাও সমাজজীবনের নির্বিঘ্ন অংশীদার। এখন সমকামীরা পৃথিবীব্যাপী রেইনবো সোসাইটি আন্দোলনে নেমেছে। অবশ্য সভ্যতার ইতিহাস দেখলে বুঝা যায়, উপজাতীয় বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠী নিজেদের কোন প্রয়োজনের জন্যই বাইরের কারো প্রতি মুখাপেক্ষী নয়। রংধনুর সাত রংয়ের মতো উপজাতীয়দের জীবন সংস্কৃতি কানায় কানায় পরিপূর্ণ। সমস্যা হলো আমাদের পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মতো রেইনবো সোসাইটি গড়ে তুলতে হলে ফিরে যেতে হবে, কয়েক শতাব্দী পূর্বের ঠিকানায়। ২৭ দফা দিয়ে বিএনপি কি এ সমাজকে মধ্যযুগে ফেরত নিতে চাচ্ছে?

লেখক: আইনজীবী, কলামিস্ট।