চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে তীব্র স্রোতের মধ্যে দুই বিদেশি জাহাজের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেলবাহী মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাংকার এমটি সি স্পাইক নোঙর করে থাকা একই পতাকাবাহী বাল্ক ক্যারিয়ার এমভি সান শাইনের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটায়। এতে ট্যাংকারটির ইঞ্জিন রুমের পোর্ট কোয়ার্টারে আনুমানিক এক বর্গমিটার ফাটল সৃষ্টি হয়ে পানি প্রবেশ করেছে। সাময়িকভাবে জাহাজটির বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেল বহনকারী জাহাজটির কোনো কার্গো ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং তেল নিঃসরণেরও ঘটনা ঘটেনি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংঘর্ষের পর এমটি সি স্পাইকের সব কার্গো ট্যাংক সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। কোনো ট্যাংকে পানি প্রবেশ করেনি। ফলে বিপুল পরিমাণ ডিজেল নিয়ে পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কাও আপাতত নেই। দুর্ঘটনার পর জাহাজটিকে স্থিতিশীল রাখতে দুটি নোঙরের প্রতিটিতে ১০ শ্যাকেল করে অ্যাংকর ক্যাবল ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। জোয়ার–ভাটার হিসাব অনুযায়ী ভাটার সময়ও জাহাজটি নিরাপদে ভেসে থাকবে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর সূত্র জানায়, সাগরে তীব্র স্রোতের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জাহাজ দুটির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড উদ্ধার ও নিরাপত্তা কার্যক্রমে নামে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের টাগবোট ‘কান্ডারী–৮’ দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রম শুরু করে।
সংঘর্ষের ফলে এমটি সি স্পাইকের ইঞ্জিনরুমে পোর্ট কোয়ার্টারে প্রায় এক বর্গমিটার ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করায় জাহাজটিতে সাময়িক ব্ল্যাকআউটের সৃষ্টি হয়। তবে জরুরি ব্যাটারির মাধ্যমে জাহাজটির ভিএইচএফ যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা হয়েছে। জাহাজের মাস্টারের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষ সার্বক্ষণিক ভিএইচএফ যোগাযোগ বজায় রাখছে।
দুর্ঘটনার পর ট্যাংকারটি থেকে দ্রুত জ্বালানি তেল খালাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফাটল মেরামত ও জাহাজ উদ্ধারের জন্য শিপিং এজেন্টকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এবং স্যালভেজ কোম্পানিকে দ্রুত ঘটনাস্থলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট স্যালভেজ কোম্পানি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই মেরামতকাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় শিপিং সূত্র জানায়, এমটি সি স্পাইক শুক্রবার সকালেই সিঙ্গাপুর থেকে প্রায় ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসে। জাহাজটির স্থানীয় শিপিং এজেন্ট প্রাইড শিপিং। এজেন্টের একজন প্রতিনিধি জানান, সংঘর্ষে জাহাজটির কার্গোর কোনো ক্ষতি হয়নি। জাহাজ মেরামতের জন্য স্যালভেজ কোম্পানি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে।
অন্যদিকে, এমভি সান শাইন গত ১ আগস্ট প্রায় ৫২ হাজার টন গম নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে। দুর্ঘটনার সময় জাহাজটি বহির্নোঙরে নোঙর করা অবস্থায় ছিল। জাহাজটির স্থানীয় শিপিং এজেন্ট এশিয়াবাল্ক মেরিটাইম প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অঞ্জন মজুমদার জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে জাহাজটির ক্যাপ্টেনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে বিস্তারিত আপডেট পাওয়ার পর জাহাজটির ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
প্রাথমিকভাবে দুই জাহাজের কার্গো নিরাপদ থাকায় বড় ধরনের নৌদুর্ঘটনা বা পরিবেশদূষণ এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছে বন্দর সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ডিজেলবাহী ট্যাংকারটির কার্গো ট্যাংক অক্ষত থাকায় বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাগরে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়নি। তবে ইঞ্জিনরুমে সৃষ্ট ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করায় জাহাজটি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ, দুই জাহাজের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং সংঘর্ষের সময় জাহাজগুলোর গতিপথ ও নেভিগেশন–সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য উদ্ধারের পর বিষয়টি নিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে বলেও সূত্র জানিয়েছে।











