বন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি

প্রান্ত রনি, রাঙামাটি | সোমবার , ১৩ জুলাই, ২০২৬ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

গত রোববার (৫ জুলাই) থেকে সপ্তাহব্যাপী টানা বৃষ্টির কারণে বন্যার কবলে পড়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম। তিন পার্বত্য জেলায় বন্যায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার লণ্ডভণ্ড দশা। কৃষিখাতে হয়েছে ব্যাপক ক্ষতি। হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমির ফসল বিলীন হয়েছে বন্যার পানিতে। প্রাথমিক হিসাবে তিন পার্বত্য জেলার প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্তের তথ্য উঠে এসেছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি অঞ্চলের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, রোববার (৫ জুলাই) থেকে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সৃষ্ট বন্যায় তিন পার্বত্য জেলায় কৃষিখাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে রাঙামাটি জেলায় ৫৩ হাজার ৭৬৬ হেক্টর আবাদকৃত কৃষি জমির ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর নষ্ট হয়েছে। পাহাড়ি এ জেলাটিতে উফশী আউশ ৬৯৯ হেক্টর, স্থানীয় আউশ ৪৬১ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি ১ হাজার ১৩৬ হেক্টর, আদা ৪২২ হেক্টর, হলুদ, ৩৪৪ হেক্টর, আমন (বীজতলা) ২০৩ হেক্টর এবং ৪১০ হেক্টর জমির উদ্যান সফল নষ্ট হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বান্দরবান জেলায় প্রাথমিকভাবে ৯৪৫ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। এরমধ্যে আউশ ২২০ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি ৪৫০ হেক্টর, ফলবাগান ২২৩ হেক্টরসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তবে এ চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ জেলার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে বলছেন কৃষি কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, খাগড়াছড়ি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি জমির পরিমাণ ১ হাজার ৩১ হেক্টর। এরমধ্যে ফলবাগান ৫৪৮ হেক্টর, আমন বীজতলা ২০২ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন সবজি ১৪৩ এবং ১৩৮ হেক্টর আউশ ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, গতকাল রোববার পাহাড়ে বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও এখনো বন্যার পানি পুরোপুরি নামেনি। বন্যার পানি নেমে গেলে ফসলের ক্ষতির চিত্র আরো ভালোভাবে বোঝা যাবে। প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা আরো বাড়বে। ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করলে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি জানা যাবে।

বান্দরবানের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাজিব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, বন্যায় রাস্তাঘাটের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরাই। এবারের বন্যায় বান্দরবানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকরাই হলেন। যেসব এলাকার ফসলি জমিতে বন্যায় পানি আছে, সেখানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

রাঙামাটি জেলায় বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন। এছাড়া বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, লংগদু উপজেলার অনেক এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। ফসলি জমি ডুবে যায় বন্যার পানিতে।

বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা ও সমাজকর্মী মৃনাল কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, রোববার (আজ) সকাল থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় এখন ফারুয়া বাজারসহ আশপাশের প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই পানি নেমে গেছে। তবে পুরো এলাকা কাদাময় হয়ে আছে। রাইংখ্যং নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে। যে কোনো সময় টানা বৃষ্টি হলে আবারও তলিয়ে যেতে পারে। ফারুয়ায় এবারের বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্থানীয় ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতির কারণে ফারুয়ার মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন।

ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান বিদ্যালাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফারুয়া ইউনিয়নের আলিক্ষ্যং থেকে শুকরছড়ি পর্যন্ত ১৬১৭টি গ্রাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে একটা তালিকা প্রস্তুত করেছি, তালিকা অনুযায়ী ১ হাজার ৩৪৬টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার রয়েছে। তবে তালিকাটা আরো বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বেশিরভাগ প্রান্তিক কৃষক পরিবার।

বন্যায় তারা একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছে। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আর্থিক সহায়তা ও প্রণোদনার আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রাঙামাটি কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক অরুন চন্দ্র রায় বলেন, রাঙামাটির বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকল, বাঘাইছড়িতে বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ইতোমধ্যেই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে। তালিকা প্রস্তুত শেষে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রেরণ করে কৃষকদের সহায়তা করার চেষ্টা করব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাউজানে বন্যা দুর্গতদের পাশে সচ্ছল ব্যক্তিদের দাঁড়ানোর আহ্বান
পরবর্তী নিবন্ধস্যান্ডরের সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে নভেম্বরে