বন্ধ হওয়া কারখানা চালুর উদ্যোগ প্রশংসনীয়

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ১৬ জুন, ২০২৬ at ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ

স্বাধীনতার পর পট পরিবর্তন ও বিভিন্ন উপায়ে ক্ষমতার পট পরিবর্তনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলেও ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি শ্রমিকদের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিত্যক্ত এবং চালু বিভিন্ন কারণে কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ায় প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ শ্রমিক কর্মচারী কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সামগ্রিক অর্থনীতি ও উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়েছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বেকারত্ব ও হতাশার এই চিত্র পুরো দেশের। গত কয়েক বছরে আর্থিক সংকট এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে দেশে প্রায় ৪০০ টি তৈরি পোশাক কারখানা, হিমায়িত চিংড়ি প্রকল্পসহ অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে কারখানা বন্ধ হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়েছেন। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আঞ্চলিক ও স্থানীয় অর্থনীতিতে।

চলমান এ স্থবিরতা কাটাতে বন্ধ হয়ে যাওয়া সব শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা ভাবছে সরকার। ১ লা মে রাজধানীর নয়াপল্টনে শ্রমিক সমাবেশে বিগত কয়েক বছরে বন্ধ হওয়া কলকারখানা পর্যায়ক্রমে চালু করার উদ্যোগ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বন্ধ হওয়া কারখানাগুলো সচল হলে বেকারত্ব কমবে এবং উৎপাদনমুখী খাতে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলেছেন অর্থনীতিবিদরা। সেই সঙ্গে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়বে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে।

কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার পর হাজার হাজার শ্রমিক তাদের পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বকেয়া পাওনা বুঝে না পাওয়া এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে এসব শ্রমিকের দৈনন্দিন জীবন চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্দশায় পড়েছে। নিয়মিত উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ায় অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারকে দিন কাটাতে হয় অর্ধাহারেঅনাহারে। অনেক শ্রমিক তাদের জীবনের শেষ সম্বল হিসেবে পাওনা টাকা বা সঞ্চয়পত্র তুলতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়ছেন। বিশেষ করে অস্থায়ী ও দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা শ্রমিকদের পাওনাপ্রাপ্তি নিয়ে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।

বন্ধ কারখানা চালু হলে পরিস্থিতি পাল্টাবে বলে মনে করে বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এক দশক ধরে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৫২৭ লাখ। বিভাগওয়ারি হিসেবে ঢাকা বিভাগের পর চট্টগ্রাম বিভাগে ৫ লাখ ৮৪ হাজার, রাজশাহীতে ৩ লাখ ৫৭ হাজার, খুলনায় ৩ লাখ ৩১ হাজার, সিলেটে ২ লাখ ১৬ হাজার, রংপুরে ২ লাখ ৬ হাজার, বলিশালে ১ লাখ ৩৯ হাজার এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১ লাখ ৪ হাজার বেকার আছেন। প্রায় এক কোটি আছে ছদ্ম বেকার।’

অন্যান্য কলকারখানার সাথে দেশের ঐতিহ্যবাহী চিনিশিল্পও এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। ২০২০ সালে ছয়টি সরকারি চিনিকল পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন হাজার হাজার শ্রমিক ও আখচাষি। দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আধুনিকায়নের অভাব এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণ দেখিয়ে সরকার এসব চিনিকলের কার্যক্রম স্থগিত করে। আবারও চালুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখনো পর্যন্ত তা চালু হয়নি। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবিকায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং বাড়ছে উদ্বেগ।

২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর ২১টি চিনিকলের মধ্যে ছয়টি বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। সেগুলো ছিল শ্যামপুর সেতাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, পঞ্চগড় ও রংপুর চিনিকল। এরপর থেকে প্রতিবছর সেগুলো চালু করতে নানা দাবি ও কর্মসূচি দিয়ে আসছে বন্ধ মিলগুলোর শ্রমিককর্মচারীসহ দেশীয় চিনিশিল্প রক্ষার সঙ্গে সহমত পোষণ করা সংগঠনগুলো।

অন্তর্বর্তী সরকার বন্ধ চিনিকল চালু করার লক্ষ্যে টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে। এ কমিটি বন্ধ কারখানাগুলো খুলে দেওয়া এবং নতুন করে জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত দেয় ওই বছরের ডিসেম্বরে।

তখন তিন ধাপে ছয়টি চিনিকল চালু করতে বলা হয়। এর জন্য অর্থছাড় করতে সুপারিশ করা হয় অর্থ মন্ত্রণালয়কে। টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও মতামতের ভিত্তিতে ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাড়াই স্থগিত চিনিকলগুলোর স্থগিতাদেশও তুলে নেয় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি)

প্রথম ধাপে দিনাজপুরের সেতাবগঞ্জ ও রংপুরের শ্যামপুর চালুর উদ্যোগ নেয় বিএসএফআইসি। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী সেতাবগঞ্জ ও রংপুরের জন্য যথাক্রমে ৮২৩ কোটি ও ৫৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়কে দু’ দুবার চিঠি দিয়ে ব্যর্থ হয় শিল্প মন্ত্রণালয়। শেষ দফায় গত জানুয়ারিতে চিঠি দেওয়া হলেও আবার অসম্মতি জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় এসব ক্ষেত্রে টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তও আমলে নেয়নি অর্থ বিভাগ।

বরাদ্দ ছাড়া মিল চালু নয়, টাস্কফোর্স সিদ্ধান্ত দিলেও এখন অর্থ ছাড়া এসব মিল চালু করা কোনোভাবে সম্ভব নয়। ফলে মাড়াইয়ে স্থগিতাদেশ উঠলেও বাস্তবে শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ চিনিকল এখনো চালু হয়নি। কবে নাগাদ বাকি চারটি চিনিকল চালু হবে, তাও এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত।

এ নিয়ে পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছে না বিএসএফআইসি। এতে আখচাষি, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও চিনিকলের কর্মকর্তাকর্মচারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। আবারও থমকে যাওয়ার মুখে পড়ছে স্বদেশনির্ভর চিনিশিল্পের স্বপ্ন। এভাবে প্রতিনিয়ত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একের পর এক ঐতিহ্যবাহী দেশীয় শিল্পসমূহ। এভাবে দেশীয় শিল্প ও বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়া এক প্রকার গভীর ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবু আমরা প্রত্যাশা করবো, বন্ধ হওয়া কারখানা চালুর উদ্যোগ প্রশংসনীয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক; সম্পাদকশিল্পশৈলী

পূর্ববর্তী নিবন্ধসাপের দংশনে মৃত্যু : স্বাস্থ্যখাতে নীরব সংকট
পরবর্তী নিবন্ধআনন্দলোকে মঙ্গলালোকে