ফুল মামা

সরোজ আহমেদ | বুধবার , ২১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:০২ পূর্বাহ্ণ

ফুল মামার পেটে বোধহয় গল্পের ফ্যাক্টরি আছে। এত গল্প কোত্থেকে যে বলে, কে জানে! একটার পর একটা শুধু বলতেই থাকে, শেষ আর হয় না। তাই ফুল মামাকে পেলে তানিফ–তাহির আর কিছুই লাগে না। সারাদিন গল্প শুনেই দিন কেটে যায়।

ইশতিয়াক রহমান খান তাসরিফ ওরফে ফুল মিয়া। ছোটবেলা থেকেই ফুল নিয়েই পড়ে আছেন। বাগান করা, ফুল নিয়ে লেখালেখি, গবেষণা্ততাই বন্ধুরা নাম দিয়েছে ফুল মিয়া। আর এই ফুল মিয়া তানিফ–তাহির ‘ফুল মামা’।

অনেকদিন পর তানিফদের বাসায় বেড়াতে এসেছেন ফুল মামা। খবর পেয়ে পাশের বাসার রাইয়ান, পুনক, রাফি, রাহাত, সিয়াম, সিমিরাও এসে হাজির। মামা সবাইকে নিয়ে বসলেন গল্পের আসরে। শুরুতেই ফুল মামার প্রশ্ন, ‘আচ্ছা বলো তো, পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দর বস্তু কি?’

কেউ বলল, চাঁদ। কেউ বলল, আকাশ। আবার কেউ কেউ বলল, সাগর–নদী ইত্যাদি।

‘গুড। তোমরা ঠিকই বলেছো। তবে এসব আমাদের নাগালের বাইরে। চাইলেই ছোঁয়া যায় না। কিন্তু পৃথিবীতে এমন একটি সুন্দর বস্তু আছে– যা আমরা ছুঁতে পারি, ঘ্রাণ নিতে পারি, সৌন্দর্য বর্ধনেও ব্যবহার করতে পারি। সেই জিনিসটার নাম কেউ বলতে পারলে না।’

তানিফ বলে ওঠল, ‘ফুল।’

‘ভেরি গুড। ফুল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর বস্তুর মধ্যে একটি। যুগ যুগ ধরে ফুলকে মানুষ কখনো রূপের, কখনো গুণের উপমা হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। কারণ ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করে এবং ঘ্রাণ নিয়ে মানুষ আনন্দ পায়। শুধু তাই নয়, এমন অনেক ফুল আছে, যা জীবন রক্ষার ওষুধ তৈরির কাজেও ব্যবহার হয়।’

পুনক বলল, ‘বিভিন্ন পূজোয়, উৎসবে ফুল দিয়ে ঘর সাজানো, মালা তৈরি করা যায় জানতাম। কিন্তু ওষুধ তৈরি হয়, জানতাম না।’

‘শুধু কী তাই। বাংলা সাহিত্যে সেই প্রাচীনকাল থেকে আজও ফুলের গুণগান লেখা হচ্ছে। তোমরা বড় হয়ে বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে পড়াশোনা করলে দেখবে, মধ্যযুগের কবি–সাহিত্যিকরা শত শত বছর ধরে কবিতা, গল্প–উপন্যাস রচনা করে বাংলা সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন। আর সবশ্রেণির কবিতা ও সাহিত্যে ফুলের কথা আছে। আচ্ছা, ফুল নিয়ে একটা কবিতা বলতে পারবে কেউ?’ তাহি বলল, ‘মামা আমি পারবো।’

‘ওকে বলো।’

‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা/ ফুল তুলিতে যাই/ ফুলের মালা গলায় দিয়ে/ মামার বাড়ি যাই।’

‘চমৎকার। এবার রাফি বলতো, এই চমৎকার কবিতাটি কার লেখা?’

‘বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’

‘গুড বয়। বাংলার আরেক কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তাঁর বিখ্যাত ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ কবিতায় বাংলার সৌন্দর্য প্রকাশের উপকরণ হিসেবে ফুল ব্যবহার করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ফুলের নামে একটি কবিতার বই ‘মহুয়া’ এবং ‘রক্তকরবী’ নামে একটি নাটক লিখেছেন। এছাড়া তিনি হাজার হাজার গান ও কবিতায় ফুলের কথা লিখে গেছেন। তেমনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘দোলন–চাঁপা’ ও ‘ফণিমনসা’ নামে দুটি কবিতার বই, ‘ঝিঙে–ফুল’ নামে একটি শিশু সাহিত্য, ‘শিউলী মালা’ নামে একটি গল্পগ্রন্থ, ‘গীতি শতদল’ এবং ‘রক্তজবা’ নামে দুটি গানের বই রচনা করেছেন। এসব গান ও কবিতায় ফুলের কথা অসংখ্যবার বলেছেন কবি নজরুল।

কবি জীবনানন্দ দাশ ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যে বাংলার অজস্র প্রকার ফুলের কথা লিখেছেন। বিখ্যাত ‘কাজলা দিদি’ কবিতার কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী কবিতায় শোকাচ্ছন্ন এক পরিবেশের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন– ‘পুকুর ধারে নেবুর তলে/ থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে/ ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা/ একলা জেগে রই/ মাগো আমার শোলক বলা/ কাজলা দিদি কই।’

এ কবিতা থেকে লেখক হুমায়ুন আজাদ তাঁর বইয়ের নাম রেখেছেন ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না’। তেমনি কবি গোলাম মোস্তফা, সুফিয়া কামাল, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কবি ফররুখ আহমদ, কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাকবি কায়কোবাদ, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কবি কামিনী রায়, আধুনিক ধারার কবি শামসুর রাহমানসহ অগণিত কবি–সাহিত্যিক ফুলের সৌন্দর্যকে নানা উপমায় বর্ণনা করেছেন।

ফুল মামার মুখে যেন খৈ ফুটছে। ফুল নিয়ে বলে যাচ্ছে তো যাচ্ছে, শেষেই হচ্ছে না। সবাই তন্ময় হয়ে ফুলের গল্প শুনছে আর ভাবছে– মামা ফুল নিয়ে কতকিছু জানেন!

‘কিগো মামারা, ফুলের কথা শুনতে বিরক্ত লাগছে?’

‘খুব ভাল লাগছে মামা।’ সবাই একসঙ্গে বলে ওঠল।

‘বেশ। এতক্ষণ বললাম ফুল নিয়ে কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং গানের কথা। কিন্তু আমরা কি জানি, পৃথিবীতে ফুলের সংখ্যা কত?’

‘মামা কত?’ রাহাদ আর রাইয়ানের পাল্টা প্রশ্ন।

‘বিজ্ঞানীদের মতে আড়াই লাখের বেশি। পৃথিবীতে এত বর্ণিল এবং বিচিত্র ফুল আছে যার একাংশও আমরা চিনি না। জানি না। তবে আমরা কিছু ফুলের নাম জানি এবং চিনি। বিশেষ করে গোলাপ, গাঁদা, শিমুল, রজনীগন্ধা, রক্তজবা, জুঁই, বেলী, শাপলা, পদ্ম, বকুল, গন্ধরাজ, কনকচাঁপা, দোলনচাঁপা, শেফালী, পলাশ, চন্দ্রমল্লিকা, কদম, কৃষ্ণচূড়া, হাসনাহেনা, সূর্যমুখী, অপরাজিতা, নয়নতারা ইত্যাদি।’

সবশেষে ফুল মামা বললেন, ‘ফুলের কাহিনী বলে শেষ করা যাবে না। পবিত্রতার প্রতীক ফুল রূপে–বৈচিত্র্যে–ভালবাসায় অনন্য। তাই শিশুদের তুলনা করা হয় ফুলের সঙ্গে। ফুল যেমন তার রূপ, সৌরভ দিয়ে মানুষের মনকে পুলকিত ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে উন্নত করে। তেমনি শিশুরা মেধা–মননে যোগ্য হয়ে বেড়ে উঠার মধ্য দিয়ে একটা দেশ তথা সমাজকে আলোকিত ও সমৃদ্ধ করে।’

ফুল মামার কথায় সবাই হাত তালি দেয়। মামাও দু’হাত বাড়িয়ে সবাইকে জড়িয়ে নেন বুকে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধজোছনা
পরবর্তী নিবন্ধঅদ্ভুতুড়ে দ্বি-চিড় পরীক্ষা