প্রবাহ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ২৫ জানুয়ারি, ২০২৩ at ৫:০৩ পূর্বাহ্ণ

আরাকানে রোহিঙ্গাদের

বর্তমানেও করুণ অবস্থা

আরাকান রাজ্যে বর্তমানেও রোহিঙ্গাদের চরম প্রতিকূলতা বিরাজমান। গত নভেম্বরে ওমরাহ ও যেয়ারত উপলক্ষে সৌদি আরবে অবস্থানকালে আরাকানের লোকজনের সাথে আলাপে অনুধাবন করতে পারি সেখানকার অবস্থা। জেদ্দায় অবস্থান করেন হযরত শাহ মাওলানা আবদুস সালাম (রহ.)’(আরাকানী হযরত) সরাসরি নাতি মাওলানা জহুরুল ইসলাম। ৬০ উর্দ্ধ বয়সের এ নাতি খুবই করুণভাবে তাদের পরিবারের চরম প্রতিকূলতার দীর্ঘক্ষণ বর্ণনা দেন। তিনি আরও বলেন, তাদের পরিবারের পাশাপাশি অন্যান্য রোহিঙ্গাদের অবস্থাও খুবই নাজুক।

আমার সহোদর মামাত ভাই দীর্ঘদিন মায়ানমারে ছিলেন। তার মেয়ের ঘরের নাতনী খুবই মেধাবী। বৃত্তি নিয়ে চট্টগ্রাম এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটিতে আসেন। আমাদের ভাইয়েরা যতটুকু পারে সহযোগিতার হাত বাড়ায়। জন্মদাতা বাবা মা, ছোট ২ বোন সেখানে; তারপরও সে চেয়েছিল এখানে থেকে যেতে। মানুষ কত প্রতিকূল অবস্থা হলে নিজের বাবা মা, বোনদের ছেড়ে এখানে থেকে যেতে চায়।

মায়ানমারের সামরিক জান্তা ৭/৮ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিধনযজ্ঞ চালিয়ে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করে। সরকারের নানা প্রচেষ্টার পরেও তাদের নাগরিক তারা ফেরত ত নিচ্ছেই না বরং বর্তমানে যারা আছে তাদের উপরও নিধনযজ্ঞ চলমান রয়েছে। তারা হয়ত চাচ্ছে আরাকান রোহিঙ্গা শূন্য হোক।

আরাকানের পেছনের ইতিহাসে দৃষ্টি দিলে জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকে আরাকান (রাখাইন) একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রই ছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা আরাকানের পাশাপাশি মায়ানমার দখল করার পর মায়ানমারের সাথে আরাকানকে যুক্ত করে দেয়।

ব্রিটিশদের দখলের পূর্ব পর্যন্ত সেখানকার ইতিহাস হচ্ছে বিভিন্ন গোষ্ঠীগুলির মধ্যে প্রাধান্য বিস্তারের নানান দ্বন্দ্বের।

ব্রিটিশরাই আরাকান ও মায়ানমার দখল করে বাঙ্গালীদের উৎসাহিত করে তথায় গিয়ে চাষাবাদ, ব্যবসাবাণিজ্য করত। ভারতবর্ষ মায়ানমার অঞ্চল থেকে বিদায় নিয়ে গেল ৭৫/৭৬ বছর হবে। কিন্তু রেখে গেল অনেক খারাপ কর্মকান্ড। বাংলা, পাঞ্জাব, কাশ্মীরকে ভাগ করে ফেলল। অপরদিকে আরাকানকে মূল মায়ানমারের সাথে ঢুকায় দিল।

মায়ানমার স্বাধীন থাকলে আজ রোহিঙ্গাদের এমন অবস্থা হত না। মূল মায়ানমারের সামরিক জান্তার শক্তি বাঙ্গালী রোহিঙ্গাদের উপর কাল হয়ে দাঁড়ায়। আরাকানে শুধু বাঙ্গালি রোহিঙ্গারা নয় অবাঙ্গালি শত শত বছরের বাসিন্দারাও মায়ানমারকে ব্রিটিশের মত জবরদখলী মনে করছে। মায়ানমারের সামরিক জান্তার সাথে থাইল্যান্ড সীমান্তে ঐ অঞ্চলের বাসিন্দারাও অস্ত্র হাতে নিয়েছে।

গত ক’মাস আগেও অবশিষ্ট রোহিঙ্গারা নির্মমতার স্বীকার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকতে চাইছিল। কিন্তু সরকারী সিদ্ধান্তে বিজিবি আটকে দেয়। যেখানে ৮/১০ লাখ রোহিঙ্গা অনিশ্চিতভাবে বসবাস করছে সেখানে আমাদের এই অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশে আরও কিভাবে সে দেশের মানুষ গ্রহণ করবে।

আরাকানী হযরত (রহ.)

হযরত শাহ মাওলানা আবদুস সালাম আরাকানী (রহ.) উপমহাদেশখ্যাত একজন সুফি দরবেশ, পীর। ধনী পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা বড় ব্যবসায়ী ছিলেন ব্রিটিশ মায়ানমারে। ফলে আরাকানী হযরত সাগরপথে নিয়মিত কলকাতা যাতায়াত করতেন। তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্‌রাসা ও আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সেখানে আজমগড়ী হযরতের নিকট মুরিদ হন। কঠোর রেয়াজতের মাধ্যমে সুফিতত্ত্বের উচ্চ মকামে পৌঁছে যান। আজমগড়ী হযরতের ৪৪ জন খলিফার মধ্যে তিনি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন।

১৯৪৪ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে আজমগড় থেকে নিজের পীরের নির্দেশে আদিষ্ট হয়ে আরাকান থেকে ২য় বিশ্বযুদ্ধ অবস্থায় প্রতিকূলে যোগাযোগ প্রথম চট্টগ্রাম আসেন। তা দক্ষিণ চট্টগ্রামের চুনতী হযরত শাহ মাওলানা নজির আহমদ (রহ.)’র বাড়ীতে, তাকে কয়েকটি ছবক তাওয়াজ্জু দেন। কয়েকদিনের ব্যবধানে শাহ মাওলানা নজির আহমদ (রহ.) ইন্তেকাল করলে তাঁর জানাযা পড়ান।

এ মহান সুফি দরবেশ আরাকানী হযরত ১৯৪৪১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষের পাশাপাশি এতদঞ্চলে তরিকতের বিশাল খেদমত করে গেছেন। সাতকানিয়া কেন্দ্রীয় খানকাহসহ অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে।

তিনি বাংলাদেশে হাজার হাজার মুরিদ রেখে গেছেন। তাঁর মুরিদগণ ছিলেন কঠোর শরীয়তের পাবন্দ। এদের মধ্যে থেকে ক’জনকে খেলাফত দানে ভূষিত করেন। তৎমধ্যে আমার রচিত “ওয়াইসী হয়ে আজমগড়ী সিলসিলা” গ্রন্থে মাত্র ১০ জনের নাম উল্লেখ করতে পেরেছি।

এই মহান সুফি সাতকানিয়া খানকাহ থেকে ১৯৬৮ সালে আরাকানের ভূসিধং নিজেদের রাজকীয় বাড়ীতে গমন করে সাপ্তাহখানেকের ব্যবধানে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ২ পুত্র। এক পুত্রের ঘরের নাতি জেদ্দা প্রবাসী মাওলানা জহুরুল ইসলাম। তাঁর সাথে সামনাসামনি ও মোবাইলে আলাপ হয়। এমনিতে তাদের প্রতিকূল অবস্থা ছিল। গত নভেম্বর দীর্ঘক্ষণ আলাপে চরম প্রতিকূল অবস্থা জানতে পারি। তিনি নিজ বাড়ীতে যেতে পারছেন না। বর্বর সামরিক জান্তা ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়। তাদের পরিবারবর্গ এখানে সেখানে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

যে সমস্ত দেশ এ বর্বর মায়ানমার জান্তা সরকারকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদেরকেও ভাল বলা যাবে না। জাতিসংঘের উচিত আরও সক্রিয় হওয়া দৃঢ়ভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকা।

আরাকানী হযরতের পরিবার নিয়ে ভাবার বিষয়, আজমগড়ী সিলসিলা বিশেষ করে আরাকানী হযরতের সিলসিলাভুক্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলেই রয়েছে হাজার হাজার অনুসারী। অনুগ্রহ করে চেষ্টা করবেন এই মহান দরবেশের পরিবারের কল্যাণে কিছু করা যায় কিনা।

এমনিতে দীর্ঘদিন যাবৎ আরাকানে রোহিঙ্গারা এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম ত নয়ই এক পাড়া থেকে অন্য পাড়াতে যেতে রয়েছে নানান বিধি নিষেধ। তারা নানান কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। উন্নত চিকিৎসার জন্য ইয়াঙ্গুন যেতে হলে রয়েছে আইনি জটিলতা।

আরাকানী হযরতের নাতির মত আরাকানের অনেক রোহিঙ্গা মায়ানমারের পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আরব রাষ্ট্রে কর্মরত। তারা হয়ত ঐ সমস্ত দেশ থেকে ইয়াঙ্গুন বিমান বন্দরে নামতে পারবে। কিন্তু আরাকানে নিজের পরিবারের কাছে পৌঁছা কঠিন। রয়েছে তাদের জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকি। ফলে আরাকানে পরিবারবর্গের অসহায়ত্ব অনেক দূর থেকে শুনা বাদে আর কোন গত্যন্তর নেই।

তাদের নাই কোন ভোটাধিকার, নাই কোন নাগরিকত্ব। শত শত বছর লাখ লাখ এসব লোক আরাকানে বসবাস করে আসছে।

চট্টগ্রাম থেকে আকিয়াব ও ইয়াঙ্গুনে নিয়মিত পানির জাহাজের যাতায়াত ছিল। বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাথে আরাকান ও মায়ানমারের রয়েছিল নিবিড় সম্পর্ক।

২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান যখন এখানে দখলে নেয় তখন বাঙ্গালীরা চরম প্রতিকূল অবস্থায় পড়ে যায়। যেহেতু তারা ব্রিটিশের পক্ষে ছিল। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ বিদায় নিলে মায়ানমারের সামরিক জান্তার রোষানলে পড়তে থাকে রোহিঙ্গারা।

আরাকান ত নয়ই সমস্ত মায়ানমারে বাঙালীরা নিজেদের নাম রাখতে পারে না। সেই দেশীয় নাম রাখতে বাধ্য করা হয়।

বিশ্ব বিবেক চেয়ে আছে, জাতিসংঘ অসহায়। মায়ানমারের সংখ্যালঘুরা নাগরিক অধিকার ফিরে পেয়ে স্বাভাবিক জীবন লাভ করবে, তা মনে হয়, সুদূর পরাহত।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, গবেষক।