প্রবাহ

বাগদাদে শায়িত হযরত বড় পীর (রহ.)

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:০৫ পূর্বাহ্ণ

বাগদাদ নগরের প্রাণ কেন্দ্রে শায়িত আছেন পীরানে পীর দস্তগীর হযরত শেখ মহিউদ্দিন আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)। চন্দ্র রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখ তাঁর ওফাত বার্ষিকী। কাদেরিয়া তরীকার ইমাম তাঁকে বড় পীর হিসেবে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। হিজরি ৬৬২ সনে তিনি বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। প্রায় ১ বর্গকিলোমিটার এরিয়া নিয়ে এই মহান ইমামের মাজার কমপ্লেক্সের। এখানে রয়েছে তাঁর মাজার সংলগ্ন বিশাল মসজিদ। মাজার ও মসজিদের বারান্দা সমান্তরাল। অতঃপর প্রকান্ড চত্বর। এর পর ওযুখানা, টয়লেট ইত্যাদি। অন্যদিকে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং স্টাফদের কক্ষসহ অফিসাদি । দক্ষিণ সংলগ্ন রাস্তা, তার দক্ষিণ পার্শ্বে মাদ্‌রাসা, মুসাফির খানা, গেস্ট হাউস এবং কনফারেন্স হল ইত্যাদি। এর সংলগ্ন তাঁদের পারিবারিক কবরস্থান। তাঁর নিকটে তার বংশধরগণের বাড়িঘর।

বাগদাদে যে কোন গাড়িওয়ালাকে হযরত বড় পীরের যেয়ারতে যেতে হলে বলতে হবে বাবুশ শেখ অর্থাৎ শেখের গেইট। মাজার কমপ্লেক্সের অনতিদূরে বড় রাস্তায় নির্মিত প্রকান্ড গেইটকে বুঝায়। যেহেতু বড় রাস্তা থেকে ছোট রাস্তা। তাঁর মাজারে যেতে ঐ প্রকান্ড গেইটটি গাড়িওয়ালাগণের কাছে অতি পরিচিত। বাগদাদবাসী বড় পীর (রহ.)কে শেখ হিসেবে সম্বোধন করে থাকেন।

হযরত বড় পীর (রহ.) ৪৭০ হিজরি রমজান মাসে ইরানে গিলান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। ফলে এ মহান ইমামকে ঐ অঞ্চলে হযরত সৈয়দ আবদুল কাদের গিলানী হিসেবে সম্বোধন করা হয়ে থাকে। ভাষাগত ব্যবধানে আমাদের এ অঞ্চলে গিলানীর স্থলে জিলানী বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে ইরানের গিলান একটি প্রদেশের নাম। রাজধানীর নাম রাস্ট। এ প্রাদেশিক রাজধানী থেকে প্রায় ২৫৩০ কিলোমিটার দূরত্বে হযরত বড় পীর (রহ.)’র মাতা হযরত উম্মূল খায়ের (রহ.)’র কবর। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ইরান সফরকালে এ গিলান প্রদেশে তাঁর মাতার কবর যেয়ারত করার সৌভাগ্য হয়।

হযরত বড় পীর (রহ.) মাতার গর্ভে থাকাকালীন তাঁর করামত (কেরামত/কারামত) প্রকাশ হতে থাকে। তাঁর পিতা হযরত ইমাম হাসান (.)’র সহিত এবং তাঁর মাতা বংশগতভাবে হযরত ইমাম হোছাইন (.)’র সহিত। এ কারণে তাঁকে আল হাসানী ওয়াল হোছাইনী বলা হয়ে থাকে। ঐতিহাসিকগণ সকলে একমত পোষণ করেন, তিনি অতুলনীয় রুহানী শক্তির অধিকারী ছিলেন। ফলে জন্মাবধি কখনও তিনি পবিত্র রমজান মাসে দিনের বেলায় মাতৃদুগ্ধ পান করেন নি।

তাঁর মাতা কর্তৃক বর্ণিত আছে, একবার ২৯ সাবান তারিখে রমজানের চাঁদ দেখা না যাওয়ার কারণে পরের দিন রোজা রাখতে হবে কিনা এ বিষয়ে কেহ কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারল না। এতে শহরের এক বুজুর্গের পরামর্শক্রমে সকালবেলা কয়েকজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন লোক আমার ঘরের সামনে এসে জানতে চাইলেন আমার মহান শিশু আজ সকালে দুধ পান করেছেন কি না? আমি বললাম চাঁদের কোন খবর পাই নাই। কিন্তু আজ সকাল থেকে আমার শিশুপুত্র মোটেও স্তন্য দুধ পান করতেছেন না দেখেই আমার মনে হচ্ছে আজ রমজান মাসের পহেলা তারিখ। আমার কথায় অবগত হয়ে আজ থেকে এ শহরে সবাই রোজা রাখা শুরু করে।

হযরত বড় পীর (রহ.) বাগদাদের নিজামিয়া মাদ্‌রাসা থেকে সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন। ইবাদত বন্দেগীতে নিজেকে মশগুল রাখতেন। বছরের পর বছর এশারের নামাযের ওজু দ্বারা ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। বহু বছর পর্যন্ত রাত্রিকালে নফল নামাজে দাঁড়িয়ে কোরআন মজিদ খতম করতেন।

তিনি সর্বপ্রথম তৎকালীন শ্রেষ্ঠ অলি হযরত শেখ আবু সাঈদ মাখযূমী (রহ.)’র হাতে বায়েত হন। অল্প দিনের মধ্যে তিনি রুহানী এলেমেও শির্ষ্য স্থানে উঠে যান।

ঐ সময় ইসলামের তখন ঘোর দুর্দিন ছিল। খলীফাগণ ভোগ বিলাসেও সুখ সম্বোগে মগ্ন এবং রাজ্য বিস্তারের মোহেমত্ব। সাধারণ মুসলমানগণ ইসলামী ভাব ধারা হতে বহুদূরে সরে পড়েছিলেন।

মোতাযেলা ও বেদাতী সম্প্রদায়ের সৃষ্ট নানা প্রকার কুসংস্কারে দেশ অচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। দুনিয়ার আলেমগণ ইসলামের সনাতন ন্যায়নীতিকে বিসর্জন দিয়ে ইসলামকে বিকল ও বিকৃত করে রেখেছিলেন। এমন সময়ে হযরত বড় পীর (রহ.) যাহেরী ও বাতেনী এলমে পূর্ণতা লাভ করেন। মৃতপ্রায় ইসলামকে সজীব করে তোলার জন্য আল্লাহ পাকের ইঙ্গিতে পুনরায় বাগদাদে আবির্ভূত হলেন।

হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)’র পীর হযরত শায়খ আবু সাঈদ মাখযূমী (রহ.) একজন জগৎশ্রেষ্ঠ আলেম ও কামেল ওলী ছিলেন। তিনি বাগদাদে একটি মাদ্‌রাসা প্রতিষ্ঠা করে নিজেই উহাতে শিক্ষকতা করতেন। হযরত বড় পীর (রহ.) বাগদাদে এসে পৌঁছলে হযরত আবু সাঈদ (রহ.)’র নিতান্ত আগ্রহ সহকারে তাঁর মাদ্‌রাসার শিক্ষকতা ও পরিচালনার ভার হযরত বড় পীর (রহ.)’র হাতে অর্পণ করেন। হযরত বড় পীর (রহ.)ও ইসলামের খেদমতের জন্য প্রথমে এই পথে চলার সমীচিন মনে করেছিলেন।

হযরত বড় পীর (রহ.) ভূমিষ্ঠ হয়ে রমজান মাসের সম্মানার্থে দিনের বেলায় মাতৃস্তনের দুগ্ধ বা অন্যকিছু পানাহার করতেন না। ইহা তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ করামত। তিনি শৈশবেই নিজের অস্তিত্ব ও আমিত্ব ভুলে গিয়ে নফসের কামনা বাসনাকে সম্পূর্ণরূপে দমন করে আল্লাহ তালার সহিত অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। আল্লাহ তালার বিধি নিষেধ পূর্ণরূপে মেনে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। আল্লাহ তালার ইচ্ছার মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করে দিয়েছিলেন। তৌহিদ ভাবের মধ্যে সর্বদা বিভোর হয়ে থাকতেন। শৈশবকালে এমন উন্নতর অবস্থা প্রাপ্ত হওয়া তাঁর শ্রেষ্ঠ করামত।

তারপরও তাঁর বহু অলৌকিক কার্যাবলী বহু পূস্তকে উদ্ধৃত দেখা যায়।

মূলত বিশ্বের ইতিহাসে পীরানে পীর বড় পীর হযরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)’র এত বেশি করামত বিভিন্ন গ্রন্থে লিখিত রয়েছে যে, তা আর কারও আছে বলে মনে হয় না। তিনি ওলীয়াগনের সর্দার, পীরগণের পীর, ইমামগণের ইমাম হিসেবে জনগণের কাছে মূল্যায়ন।

ইরাকের রাজধানী জ্ঞান বিজ্ঞানের নগরী ছিল বাগদাদ। ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.) সহ বহু বিশ্বখ্যাত ওলী দরবেশ এ বাগদাদে শায়িত। বিশেষত হযরত যুনায়েদ বোগদাদী (রহ.), হযরত ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.), হযরত বাহলুল দানা (রহ.), হযরত মারুফ কারকী (রহ.), হযরত মনছুর হাল্লাস (রহ.), হযরত সাহাবউদ্দীন সরওয়ার্দী (রহ.), আবু বকর শিবলী (রহ.) এ বাগদাদে শায়িত ।

বৃহত্তর বাগদাদকে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে, অর্থাৎ শিয়াসুন্নী। বাগদাদের এক প্রান্তে শায়িত রয়েছেন দুই মহান আহলে বায়িত তথা আওলাদে রসূল। হযরত ইমাম মুছা কাযীম (.) ও হযরত ইমাম যাওয়াদ তৌকি (.) শিয়াগণের বারো ইমামগণের মধ্যে ইনারা ৭ম ও ৯ম ইমাম। প্রায় শত একরের বিশাল এরিয়া নিয়ে এই মহান দুই ইমামের মাজার কমপ্লেক্স । রয়েছে তারকা মানের হোটেল, রেস্টুরেন্ট। শত হাজার শিয়াগণের সমাগম থাকে এখানে। অপরদিকে বাগদাদে সুন্নীগণের প্রধান আকর্ষণ হল হযরত বড়পীর (রহ.)’র মাজার। অবশ্য কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে ইমামে আযম আবু হানিফা (রহ.)’র মাজারেও মোটামুটি সুন্নীগণের যেয়ারতের সমাগম থাকে। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর মত ইরাকও তেল সমৃদ্ধ দেশ ছিল। অপর ছয়টি আরব রাষ্ট্রের মত ইরাকও বিশ্বের তেল বিক্রিত একটি দেশ। সাথে নানান ফল ফলার সবজি উৎপাদনকারী দেশ। দজলা, ফুরাত নদী এ দেশকে সমৃদ্ধ করেছে। ফলে ইরাকের এক দিনারে (টাকা) .৫০ মার্কিন ডলার পাওয়া যেত। ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। লৌহমানব সাদ্দাম হোসেনের কঠোরতায় সুন্নীরা দীর্ঘদিন ক্ষমতা ভোগ করতে ছিল। ১৯৮০ দশকে দীর্ঘ ৮ বছর ব্যাপী ইরানের সাথে নিষ্ফল যুদ্ধ, অতঃপর কুয়েত দখল। আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্বের যৌথ আক্রমণে কুয়েত ছেড়ে দিয়ে পিছু হঠা, আমেরিকার নেতৃত্বে কঠোর অবরোধে পড়ে ইরাকের অর্থনীতি ছারখার হয়ে যাওয়া,তেল বিক্রিসহ যাবতীয় রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়া,আকাশপথ বন্ধ থাকায় ইরাকের বিমানগুলো অলস বসে থাকায় ইরাকে ভয়াবহ প্রতিকূল অবস্থা এনে দেয়। এমনি পরিস্থিতিতে ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে যেয়ারতের উদ্দেশ্যে সপ্তাহ খানেকের প্রোগ্রামে বাগদাদ গমন করার সৌভাগ্য হয়। তা হয় আকাশ পথে জর্দানের রাজধানী আম্মান ঁেপৗছে। তথা হতে বাস যোগে প্রায় ৯৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাগদাদ পৌঁছি। এ এক সপ্তাহ হযরত বড় পীর (রহ.)’র মাজারের নিকটে একটি হোটেলে অবস্থান নিই। ফলে নিয়মিত যেয়ারত করার সৌভাগ্য হয়। এ সুযোগে কুফা, নজফ, কারবালা, মসৌল গমনের সৌভাগ্য হয় যেয়ারতের উদ্দেশ্যে।

পরবর্তীতে অনবিক বোমা রাখার মিথ্যা অযুহাতে আমেরিকার নেতৃত্বে পুনঃ ইরাক আক্রান্ত হয়। সাদ্দাম সরকার উৎখাত হয়। তাকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। সে হতে আজ অবধি ইরাকে ত্রিমুখী ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চলতেছে। আইএসের উত্থান, পরবর্তীতে উৎখাত,কুর্দিদের স্বাধীনতা প্রত্যাশা, শিয়াসুন্নী নেতৃত্বে দ্বন্দ্বে অশান্ত ইরাক। মনে হয় ইরাকে শান্তি সুদুর পরাহত।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলাম লেখক

 

x