প্রবাহ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী

বুধবার , ৬ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
14

নবী পাক (স.) কর্তৃক অধীনস্থদের প্রতি দয়া
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী পাক (স.) বলেছেন: যে ব্যক্তি তার কৃতদাসকে থাপ্পড় মেরেছে বা পিটিয়েছে তার কাফ্‌ফারা হল তাকে আযাদ করে দেয়া। (মুসলিম)
হযরত আবু মাসউদ আল আনসারী (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি চাবুক দিয়ে আমার এক কৃতদাসকে প্রহার করছিলাম,হঠাৎ আমার পিছন থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম,হে আবু মাসউদ সাবধান! কিন্তু রাগের কারণে আমি আওয়াজটা স্পষ্ট করে বুঝতে পারছিলাম না। যখন আওয়াজটি আমার নিকটবর্তী হল তখন আমি দেখতে পেলাম যে, (ঐ আওয়াজকারী ছিলেন) নবী পাক (স.)’র যিনি বলেছিলেন যে ,হে আবু মাসউদ সাবধান! হে আবু মাসউদ সাবধান! আমি এই আওয়াজ শুনে নিজের চাবুক নিচে ফেলে দিলাম, নবী পাক (স.) বললেন: হে আবু মাসউদ স্মরণ রাখ তুমি এই কৃতদাসের উপর যতটা ক্ষমতাবান আল্লাহ তোমার উপর এর চেয়ে অধিক ক্ষমতাবান, আমি বললাম আজকের পর আমি আর কোন কৃতদাসকে প্রহার করব না, অন্য এক বর্ণনায় বর্ণিত রয়েছে, হযরত আবু মাসউদ বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ (স.) আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য তাকে আযাদ করে দিলাম। নবী পাক (স.) বললেন: যদি তুমি এরূপ না করতে তাহলে জাহান্নামের আগুন তোমাকে জ্বালিয়ে দিত বা আগুন তোমাকে স্পর্শ করত। (মুসলিম)
হযরত মুয়াবিয়া ইবনে সুয়াইদ (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি তোমাদের এক কৃতদাসকে থাপ্পড় মেরেছিলাম,এরপর আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম, যোহরের সামান্য আগে ফিরে এসে মসজিদে আমার পিতার পেছনে নামাজ আদায় করলাম। নামাজের পর আমার পিতা আমাকে ও কৃতদাসকে ডাকল এরপর কৃতদাসকে বলল: তার কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ কর,তখন কৃতদাস আমাকে ক্ষমা করে দিল। (মুসলিম শরীফ)
হযরত আয়েশা (র.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী পাক (স.)’র সাহাবাগণের মধ্যে এক ব্যক্তি তাঁর নিকট উপস্থিত হয়ে আবেদন করল, ইয়া রাসূলুল্লাহ (স.) আমার কিছু কৃতদাস আছে যারা আমার সাথে মিথ্যা বলে, খিয়ানত করে, আমার কথা শুনেনা, তাই আমি তাদেরকে গালিগালাজ এবং প্রহার করি। কিয়ামতের দিন তাদের ব্যাপারে আমার কি অবস্থা হবে?
নবী পাক (স.) বললেন: তোমার অধীনস্থদের খিয়ানত,অবাধ্যতা এবং মিথ্যা বলা ওজন করা হবে এবং তুমি তাদেরকে যে শাস্তি দিয়েছ তাও ওজন করা হবে, যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অপরাধের তুলনায় কম হয় তাহলে তুমি সাওয়াব পাবে, আর যদি তোমার দেয়া শাস্তি তাদের অপরাধের সমান সমান হয় তাহলে তোমার কোন শাস্তিও নেই আবার কোন সাওয়াবও নেই,আর তোমার দেয়া শাস্তি যদি তাদের অপরাধের তুলনায় বেশি হয় তাহলে অতিরিক্ত শাস্তি দেয়ার কারণে তোমাকে শাস্তি ভোগ করতে হবে,তখন ঐ ব্যক্তি নবী পাক (স.)’র সামনে কাঁদতে লাগল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন তুমি কেন কাঁদছ,তুমি কি কোরআন মাজীদের এই আয়াত তেলাওয়াত কর না? আমি কিয়ামতের দিন ন্যায় বিচারের মানদন্ড স্থাপন করব, সুতারাং কারও প্রতি জুলুম হবে না। যদি কোন আমল সরিষা দানা পরিমাণও হয়, আমি তা উপস্থিত করব এবং হিসাব গ্রহণের জন্য আমিই যথেষ্ট। (সূরা আম্বিয়া-৪৭) এ কথা শুনে ঐ ব্যক্তি বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ (স.) আমি আমার ব্যাপারে এর চেয়ে আর ভাল কিছু দেখছি না যে, আমি তাদেরকে আযাদ করে দিব, আমি আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি যে তারা সবাই আযাদ”। (আহমদ,তিরমিযী)
বস্তুতঃ বাংলাদেশসহ উপ মহাদেশে এবং আরব রাষ্ট্রগুলোতে ঘরের কাজের লোক রাখার প্রবণতা তুলনামুলকভাবে বেশি। যা ইরান,তুরস্কসহ পশ্চিমা বিশ্বে নাই বললেই চলে। আমাদের দেশে স্বচ্ছল হলেই গরীব ঘরের ছেলে মেয়ে তথা কাজের লোক বা কাজের মেয়ে স্বাভাবিক ব্যাপার।
তারাও মানুষ, শুধু ব্যবধান হল অর্থ। অর্থাৎ যার ঘরে থাকতেছেন তারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল,যারা থাকতেছেন তারা আর্থিকভাবে দুর্বল। শুধু একটাই ব্যবধান আর তা হল অর্থ সম্পদ। অতএব ওদের প্রতি অমানবিক আচরণ কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের মহান নবী পাক (স.) ও তাঁর মহান সাহাবাগণের নির্দেশ, চরিত্র, আদর্শ, অনুসরণ করা আমাদের কর্তব্য।
বহুকাল পূর্ব হতে সারা বিশ্বে দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। দাস-দাসীদের প্রতি যথেষ্ট দুর্ব্যবহার করা হত। তাদেরকে মানব সমাজের মধ্যেই গণ্য করা হত না। অতি ইতর শ্রেণি হিসাবে তাদের সহিত পাশবিক আচরণ করা হত। তাদের ব্যাপারে মানবাধিকারের কোন প্রশ্নই উঠত না। ঘটনাচক্রে কেউ একবার দাস হলে পরবর্তীকালে সে ‘আযাদ’হয়ে গেলেও কলংকের তিলক তার ললাট হতে মুছত না। কারও পূর্ব পুরুষের কেউ ক্রীতদাস হলে পরবর্তী বংশধররাও দাসরূপে গণ্য হত। দাস-দাসীগণকে ভোগ্যপণ্য হিসাবে ব্যবহার করা হত। তারা ছিল মনিবগণের মনোরঞ্জনের পাত্র। মাতা এবং কন্যা উভয়েই দাসী হলে মাতৃত্ব ও সন্তানত্বের ভেদাভেদটুকুর প্রতি মর্যাদাও প্রদর্শন করা হত না। দাস-দাসীদের খোরপোষ দানও ছিল মনিবের একান্ত অনুগ্রহের বিষয়। মনিবরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে বিভোর রইলেও দাস-দাসীদের ভাগ্যে জুটিত অর্ধাহার অনাহার। মানবতার এই গ্লানিকর যুগে সাম্যের অনুপম এক আহ্বান নিয়ে এই ধরাধামে আবির্ভুত হয়েছিলেন নবী পাক (স.)। তাঁর আহ্বান ছিল মানবাধিকার,সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের। মনিব ও দাস,শুধু এই পার্থক্যের কারণে একজন অন্যজন হতে তুচ্ছ বা মর্যাদাশালী হবার অধিকার রাখে না। তাঁর শিক্ষা ছিল মনিবরা যা ভক্ষণ করবে দাস-দাসীদিগকে সেই আহার্যই দিতে হবে,মনিবরা যা পরিধান করবে দাস-দিগকে তা পরাবে। শ্রেণি ভেদ নিয়ে ঠাট্টা ও বিদ্রুপ করার অধিকার নেই।
ইসলামের বৈপ্লবিক ঘোষণা: বিশ্বমানবতার এই অধঃপতনের যুগেই ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। ইসলাম দাসদিগকে তাদের হারানো মানবিক মর্যাদা পুনরায় ফিরিয়ে দিল। প্রভু ও দাস উভয়কে সম্বোধন করে ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করল
“ তোমরা একে অপরের সমান”
ইসলাম স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিল,যে ব্যক্তি আমাদের কোন দাসকে হত্যা করবে তাকে উহার বদলা হিসাবে হত্যা করা হবে। কেউ তার নাক কর্তন করলে তার নাকও কর্তন করা হবে। যে তাকে খাসী (পুরুষত্বহীন) করবে তাকেও তদ্রুপ করা হবে। (বুখারী,মুসলিম,আবু দাউদ,,তিরমিযী ও নাসাঈ)
“তোমরা সকলেই আদমের সন্তান এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি হতে”। (মুসলিম,আবু দাউদ)। ইসলাম মনিবকে কখনও প্রভু হিসাবে মর্যাদা দেয় নাই,বরং মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানের জন্য তাকওয়া এবং আল্লাহ ভীতিকেই ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছে। বলা হয়েছে: “তাকওয়া ছাড়া কোন আরব কোন আজমীর চেয়ে,কোন শ্বেতাংগের চেয়ে কোন কৃষ্ণাংগ কিংবা কৃষ্ণাংগের চেয়ে কোন শ্বেতাংগ মর্যাদায় উন্নত হতে পারে না। (বুখারী)
ইসলাম মনিবগনকে তাদের অধীনস্থ দাস -দাসীর সহিত ইনসাফপূর্ণ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন: “ মাতা-পিতার সহিত সদ্ব্যবহার কর তোমাদের অধীনস্থ দাস-দাসীদের প্রতি বদান্যতা প্রদর্শন কর। নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারী ও গর্বিত ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না।
ইসলাম মানুষের নিকট এই সত্যও পেশ করেছে যে, মনিব ও দাসের মূল সম্পর্ক মনিব ও গোলাম কিংবা হুকুমদাতা ও হুকুমকারীর নয়;বরং তা হল ভ্রাতৃত্ব ও ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক। অতএব ইসলাম মনিবকে তার অধীনস্থ দাসীকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহ বলেন:
‘তোমাদের মধ্যে কারও স্বাধীন ঈমানদার নারী বিবাহের সামর্থ্য না থাকিলে তোমরা তোমাদের অধিকারভুক্ত ঈমানদার দাসী বিবাহ করিবে;আল্লাহ তোমাদের ঈমান সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত। তোমরা একে অপরের সমান;সুতরাং তাহাদিগকে বিবাহ করিবে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে এবং তাহাদিগকে তাদের মাহ্‌র ন্যায়সংগতভাবে দিবে।
দাসদের সম্পর্কে মানবীয় ধারণা: ইসলাম মনিবদিগকে এই ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছে যে,দাসগণ তাদের ভাই। বিশ্বনবী (স.) বলেন: “ তোমাদের দাসগণ তোমাদের ভাই। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যার অধীনে তার কোন ভাই থাকবে সে যেন তার জন্য সেইরূপ খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করে যেরূপ সে নিজের জন্য করে এবং যে কাজ করার মত শক্তি তার নাই সেই কাজ করার হুকুম যেন সে তাকে না দেয়। একান্তই যদি সে সেইরূপ কাজের হুকুম দেয় তবে সে নিজে যেন তার সাহায্য করে। (বুখারী)
ইসলাম দাসদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও অনুুভূতি-উপলদ্ধির প্রতিও যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেছে। নবী পাক (স.) বলেন: তোমাদের কেউ যেন (দাসদের সম্বন্ধে) এরূপ না বলে, সে আমার দাস এবং সে আমার দাসী। এর পরিবর্তে বলতে হবে ,ঐ আমার সেবক এবং এই আমার সেবিকা।
হাদিসের এই শিক্ষা অনুযায়ী হযরত আবু হুরায়রা (র.) যখন দেখতে পান,এক ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছে এবং তার গোলাম তার পেছনে পদব্রজে যাইতেছে তখন তিনি ঐ ব্যক্তিকে বলিলেন,তাকে ঘোড়ার পিঠে তোমার পেছনে বসিয়ে দাও। কেননা সে তোমার ভাই। তোমার ন্যায় তাহারও একটি প্রাণ আছে।
ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর দাসদের জীবনে যে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয় তার ফলে তারা আর বেচাকেনার পণ্য থাকল না। মানব ইতিহাসে এই প্রথমবারই তারা স্বাধীন মানুষের মর্যাদা ও অধিকার লাভের সৌভাগ্য অর্জন করল। ইহার পূর্বে তাহাদিগকে মানুষ বলে গণ্য করা হত না। তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য হল,তারা অন্যদের সেবা করবে এবং মনিবের অত্যাচার-উৎপীড়ন ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নীরবে সহ্য করবে। দাসদের সম্পর্কে এইরূপ ন্যক্কারজনক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাহাদিগকে বেধড়ক হত্যা করা হত,বর্বরোচিত ও পাশবিক শাস্তির চর্চাস্থল গণ্য করা হত,চরম ঘৃণা মনে করা হত এবং কঠিন কাজ করতে বাধ্য করা হত। কারও অন্তরে তাদের জন্য সামান্যতম দয়া বা সহানুভূতির উদ্রেক হত না। ইসলামে নবী পাক (স.) দাসদিগকে এই করুণ অবস্থা হতে উদ্ধার করে স্বাধীন মানুষের সহিত একই কাতারে দাঁড় করিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। ইসলামে নবী পাক (স.)’র এই র্কীতি কোন মুখরোচক ঘোষণা মাত্র নয়, বরং মানব ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য, উহা পাতায় পাতায় ইহার সাক্ষ্য বর্তমান। ঐতিহাসিক বিদায় হজ্বের ভাষণে নবী পাক (স.) সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে দাস-দাসীদের প্রতি সদাচরণ করতে, তাদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্য করতে এবং তাদের প্রতি দয়াপরবশ হতে নির্দেশ প্রদান করেন:
“তোমাদের দাসগণ,তোমাদের দাসগণ। তোমরা যা ভক্ষণ কর তা তাদেরকে ভক্ষণ করতে দিবে। তোমরা যেরূপ কাপড় পরিধান করবে তদ্রুপ কাপড় তাদেরকেও পরিধান করতে দিবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক,গবেষক ও কলাম লেখক

x