বিশ্বের ইতিহাসে দুই পরাশক্তির কথা জাগরুক থাকবে। এক এশিয়ার পারস্য অপর ইউরোপের রোম। খ্রিস্টাব্দের শুরুতে এবং খ্রিস্টপূর্বে এই দুই শক্তির যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিহাস রয়েছে।
ইসলামের আগমনের পর পারস্য টুকরা টুকরা হয়ে ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে। ইসলামের শুরুতে রোমানদের পূর্বাঞ্চল তথা জেরুজালেম কেন্দ্রিক মুলকে শাম অতঃপর ইস্তাম্বুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে আসে। পারস্যে জন্মগ্রহণ করেন অনেক জ্ঞানী–বিজ্ঞানী ব্যক্তিত্ব। শত হাজার বছর আগে ইন্তেকাল করে গেলেও অবদানের কারণে তাদের স্মৃতি জাগরুক থাকবে। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান–বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ইরান অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ।
১৯৩৫ সালে ইতিহাসখ্যাত পারস্য থেকে ইরান নামধারণ হয়। ১৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৯৫ বর্গ কিলোমিটারের আজকের ইরান। জনসংখ্যা প্রায় ৮ কোটি। ইরানীরা শিয়ামতাবলম্বী। আমাদের ধর্মীয় জগতের অধিকাংশের মত শিয়ারা বাতিল ফিরকা, অমুসলিম নয়। তবে শিয়ারা আহলে বায়েতের প্রতি ফানা বলা যাবে। তেমনি আশেকে রসূল। ধর্মীয় দিকে ইরানী শিয়ারা আহলে বায়েত আউলাদে রসূলের প্রতি এত বেশি ত্যাগী যে ওমাইয়া আমলে পবিত্র মদিনা থেকে হিজরত করে আসা ইরানে শত শত আউলাদে রসূলের কবরকে শত হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে মাজার বা মাজার কমপ্লেক্স তৈরি করে রেখেছে।
অপরদিকে যারা জ্ঞানী–বিজ্ঞানী ইরানে শায়িত তাদের কবরগুলিকেও ভিন্ন আদলে অতি গুরুত্ব দিয়ে কবর কমপ্লেক্স করে রেখেছে।
১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের রাষ্ট্রীয় এবং জনগণের জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। রাজতন্ত্রীয় অতি বিলাসিতা পরিহার করা হয়। অপরদিকে আমাদের ভারতবর্ষের মত অতি গরীব পরিবার দেখা মেলা ভার। ইরানে যে সমস্ত জ্ঞানী গুণীরা জন্মগ্রহণ করেন তৎমধ্যে অন্যতম-Mohlasham kasham (poet), Nimayoshij (poet), Hafez Serazi (poet), Kamal-Al-Molk (Painter), Rodaki (Poet, Musician), Nasir Khasru(Poet), Imam Razi, khaja Abdullah Ansari (Philospher), Vensisbafghi, Ibn-Sina (Philoshper), Hakim Addghasem, Ferdowsi (Poet), Omar khayyam (Philoshper). তবে শেখ সাদীর প্রতি আলাদা আবেগ রয়েছে।
ইরানের বড় বড় শহরগুলোতে কোন না কোন জ্ঞানী বিজ্ঞানীর কবর কমপ্লেক্স চোখে পড়বে। তবে আমার যেয়ারত করার সৌভাগ্য হয় সিরাজ নগরীতে হযরত শেখ সাদী ও হাফেজ সিরাজী, তেহরানে আল রাজি, নিশাপুরে ওমর খৈয়াম, হামেদানে ইবনে সিনা, তুসে মহাকবি ফেরদৌসি, তাব্রীজের নিকটে নাসির উদ্দিন তুসি অন্যতম।
ইরানীরা আহলে বায়েত বা ইমামজাদাগণের কবরগুলোকে এত শত হাজার কোটি টাকা খরচ করে ব্যাপকভাবে সাজিয়ে রেখেছেন যে যা অকল্পনীয় অসাধারণ। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন হবে।
ওমাইয়া আমলে দামেস্ক কেন্দ্রিক রাজতন্ত্রের হুমকি মনে করে আহলে বায়েত আউলাদে রসূলগণের প্রতি খবরদারী নজরদারি বাড়িয়ে দেয়া হয়। এতে শত শত আউলাদে রসূল পারস্যে হিজরত করেন। ইরানে ছোট বড় শহরগুলোর মধ্যে এক বা একাধিক আহলে বায়েত বা ইমামজাদা শায়িত। এই ইমামজাদাগণের মাজার কেন্দ্রিক মসজিদ গেস্ট হাউস একাধিক বিভিন্নমানের হোটেল নিয়ে ছোট বড় কমপ্লেক্স।
শিয়ারা ১২ ইমামে বিশ্বাসী। অষ্টম ইমাম আলী রেজা ইরানের মাশাদে শায়িত। ১ বর্গ কি.মি বা কম বেশি এরিয়া নিয়ে ইমাম আলী রেজার মাজার কমপ্লেক্স। এ মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণে কত শত হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে আল্লাহই জানে। ইরানের ধর্র্মীয় শহর কোমে শায়িত রয়েছেন ইমাম আলী রেজার বোন হযরত মাসুমা। তার মাজার কমপ্লেক্সও বিশাল।
অপরদিকে জ্ঞানী–বিজ্ঞানীগণের সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ছোট বড় সমাধি সৌধ। এই সৌধ অনেকটা বাগান বেষ্টিত বলা যায়। এখানে মিউজিয়াম, অফিস, ওয়াশরুম ইত্যাদি। জ্ঞানী–বিজ্ঞানীগণের সমাধি সৌধে ইরানীগণের আনাগোনার ব্যাপকতা দেখেছি। ইরানীরা তাদেরকে গুনী ব্যক্তির সমাধি হিসেবে মূল্যায়ন করে। সেই মতে জুতা স্যান্ডেল না খুলে নির্বিগ্নে হাঁটা চলা ঘুরাঘুরি করতে থাকে। কর্তৃপক্ষ এই জ্ঞানী–বিজ্ঞানীর ভাবমূর্তি বাড়াতে তার অবদান বা বাক্যগুলো বাগানের গাছের ভিতরে সাউন্ড বক্স দিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। এতে জ্ঞানী–বিজ্ঞানীর গুরুত্ব ভাবমূর্তি বাড়িয়ে তুলা হয়েছে।
তেহরান থেকে প্রায় ৮ শত কি.মি দক্ষিণে সিরাজনগরীতে গিয়েছিলাম হযরত শেখ সাদী (রহ.)’র যেয়ারত করতে। এখানেও দেখলাম ইরানী নর–নারীর ব্যাপক উপস্থিতি। কিন্তু তাদের কাছে সম্মানবোধ হল তিনি হলেন একজন জ্ঞানী–বিজ্ঞানী। এতে আমি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ি। এত কষ্ট করে তেহরান থেকে আকাশপথে বিমানে এত দূর এসেছি একজন মহান আশেকে রসূলের কবরের পাশে এসে সালাম দিতে। ইরানে অন্যান্য জ্ঞানী–বিজ্ঞানীর সাথে হযরত শেখ সাদীর তুলনা ঠিক হবে না। তিনি যেমনি অসাধারণ জ্ঞানী তেমনি একজন আশেকে রসূল সুফি ব্যক্তিত্ব।
ইরানীরা ধর্মীয় দিকে ইমামজাদা বা আউলাদে রসূলগণের মূল্যায়ন করে থাকেন। আরেকদিকে জ্ঞানী–বিজ্ঞানীগণের মূল্যায়ন। অন্যদিকে তথা বিশ্বখ্যাত সুফি, দরবেশগণকে তারা বিবেচনা রাখে বলে মনে হয় না। যেমন ইরানের নিশাপুরে শায়িত রয়েছেন–হযরত ফরিদ উদ্দিন আত্তার (রহ.); মাশাদের নিকটবর্তী শহর তূসে শায়িত হযরত ইমাম গাজ্জালী (রহ.); বাস্তামে শায়িত হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.); খেরকানে শায়িত হযরত আবুল হাসান খেরকানী (রহ.) সহ একাধিক সাহাবা তাবেঈ তবে–তাবেঈসহ অনেক ইমাম সুফি দরবেশ ইরানের মাটিতে শায়িত রয়েছেন। ইরানীদের কাছে এদের প্রতি মূল্যায়নে মনে হয় অনীহা।
বস্তুতঃ প্রাচীন পারস্য আজকের ইরানীরা সভ্য সাহসী জাতি। তারা সহজে পরাজয় স্বীকার করার পাত্র নয় বলা যাবে।
আল্লাহর রসূল (স.)’র আমলে পারস্যের বাদশাহ ছিলেন খসরু পারভেজ। তিনি পারস্যের বাদশাহ হিসেবে অহংকারে বলীয়ান হয়ে আল্লাহর রসূল (স.)’র চিঠির প্রতি অবমাননা করেছিলেন। চিঠি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলা হয়। ক’দিনের ব্যবধানে এই খসরু পারভেজ নিজ পুত্রের হাতে নিহত হন। আমিরুল মোমেনীন হযরত আবু বকর (র.), পরবর্তীতে হযরত ওমর (র.)’র আমলে বিশাল পারস্য টুকরা টুকরা হয়ে ইসলামের ছায়াতলে আসে।
আমি জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনটি দেশ ভ্রমণ করার পরামর্শ রাখি। তৎমধ্যে ১. ইরান ২. তুরস্ক ৩. ইন্দোনেশিয়া।
ইরানে নারী–পুরুষের জীবনযাত্রা খুবই সুন্দর অনুকরণীয় অনুসরণীয়। ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনীর নেতৃত্বে ইরানীদের জীবনযাত্রায় বিলাসিতা যেমনি উঠে যায় তেমনি নারীদের ব্যাপক বিচরণ ঠিক থাকলেও তা হচ্ছে শালীনতার ভিতর। ইরানের নারীদের ব্যাপক বিচরণ ভাববার বিষয়। পুরুষেরা সশস্ত্র বাহিনীসহ শক্তিশালী বড় বড় কর্মকান্ডে নিয়োজিত বলা যাবে। মহিলাদের হোটেলে রেস্টুরেন্টে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অফিস আদালতে ব্যাপক বিচরণ পরিলক্ষিত হবে। ইরানীদের ঘরে কাজের লোক তথা খাদ্দামা থাকবে না। যার কাজ সে করবে। স্বামী–স্ত্রী যার গাড়ি সে ব্যবহার করবে। মা কর্মস্থলে যাওয়ার সময় শিশু সন্তানকে ডে কেয়ারে রেখে আসবে অথবা কর্মস্থলে পাশে শুয়ায়ে রাখবে।
ইরানীরা নিজেরাই কার, ট্রাক, বাস, ট্রেনসহ অনেক প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরির পাশাপাশি রপ্তানিও করে। ইরান অনেকটা আমদানির চেয়ে রপ্তানিকারক দেশ বলা যেতে পারে।
আমার পরপর তিনবার ইরান সফর করা হয়। তৎমধ্যে তেহরান বাদে কোম, গিলান, বাস্তাম, খেরকান, সেমনান, মাশাদ, তূস, নিশাপুর, ইস্পাহান, সিরাজ, কেরমান, হামেদান, তাব্রীজ, উরুমিয়া, কাস্পিয়ান সাগরের তীরসহ বিশাল ইরানের বিভিন্ন স্থানে গমন করা হয়।
ইরানীরা মৌলিকভাবে শিয়া মতাবলম্বী। তাদের সাথে আমাদের আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের রয়েছে ব্যাপক মত পার্থক্য। যারা উদার শিয়া তাদেরকে কাফের বলা কঠিন। বাতিল ফিরকা বলা যাবে।
শিয়াদের সাথে আমাদের বড় ব্যবধান বিধায় জুমাসহ তথায় কোন মসজিদে তাদের পেছনে ইক্তেদা করলে এই নামাজ পুনঃ পড়ে দিতাম। বস্তুত ইসলামের এই ক্লান্তিলগ্নে বৃহত্তর স্বার্থে শিয়া–সুন্নি ঐক্য হওয়াটা কল্যাণকর মনে করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।













