মানবমন এক পরম বিস্ময়। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ যেভাবে পথ চলেছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি ছিল তার সহজাত প্রবৃত্তি বা ‘ইনস্টিন্কট‘। এটি মানুষের এমন এক জন্মগত সফটওয়্যার, যা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই মানুষকে বাঁচতে, লড়তে এবং ভালোবাসতে শেখায়। আর একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই)। আপাতদৃষ্টিতে একটি সম্পূর্ণ জৈবিক এবং অন্যটি সম্পূর্ণ যান্ত্রিক মনে হলেও, গভীরে তাকালে দেখা যায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে মানুষেরই সহজাত প্রবৃত্তির এক নিখুঁত ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি। প্রকৃতি ও প্রযুক্তির এই দুই ভিন্ন স্রোত যেখানে এসে মিশেছে, সেখানেই উন্মোচিত হয় মানবমনের এক নতুন রূপকথা।
যুগের পরিবর্তনে মানুষের আদিম প্রবৃত্তিটিই আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এআই–এর ‘মেশিন লার্নিং‘ ব্যবস্থাটি কোটি কোটি তথ্যের মহাসমুদ্র ঘেঁটে মানুষের অজান্তেই লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন প্যাটার্ন খুঁজে বের করে। আদিম মানুষ যেভাবে প্রকৃতির ইশারা পড়ে সিদ্ধান্ত নিত, আধুনিক এআই ঠিক সেভাবেই ডেটা অ্যানালিটিক্সের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ব্যবসার ধরণ বা শেয়ার বাজারের উত্থান–পতন বলে দিচ্ছে। মানুষের আদিম চোখ আজ রূপান্তরিত হয়েছে এআই–এর দূরদর্শী অ্যালগরিদমে। মানুষের আরেকটি দারুণ প্রবৃত্তি হলো পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া বা অভিযোজন। একটি শিশু যখন প্রথম হাঁটতে যায়, সে বারবার আছাড় খায়। কিন্তু প্রতিটি পতন থেকে তার শরীর ও মস্তিষ্ক ভারসাম্য বজায় রাখার নতুন কৌশল শেখে। একেই প্রযুক্তির ভাষায় বলা হচ্ছে ‘রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং‘। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন একটি রোবট বা স্বয়ংক্রিয় গাড়িকে যখন কোনো নতুন রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া হয়, সেও শুরুতে ভুল করে। কিন্তু প্রতিটি ভুলের জন্য সে তার সিস্টেমে এক ধরনের ‘পেনাল্টি‘ বা নেতিবাচক নম্বর পায় এবং সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য পায় ‘রিওয়ার্ড‘ বা পুরস্কার। মানুষের শত সহস্র বছরের ঠেকে শেখার এই সহজাত প্রবৃত্তিটিকেই আজ কোডিংয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভেতর সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি কেবল বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়, তা আনন্দেরও উৎস। আদিম মানুষ গুহার দেয়ালে ছবি এঁকেছে, মনের আনন্দে গান গেয়েছে। এই সৃজনশীলতা মানুষের ভেতরের এক অদম্য তাগিদ। বর্তমান যুগের জেনারেটিভ এআই (যেমন মিডজার্নি বা চ্যাটজিপিটি) যখন কোনো দুর্দান্ত ছবি আঁকে বা কবিতা লেখে, তখন তা আমাদের চমকে দেয়। তবে এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মানুষের সৃজনশীলতা হলো তার হৃদয়ের গভীর অনুভূতি, দুঃখ কিংবা ভালোবাসার এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ।
অন্যদিকে, এআই–এর সৃষ্টি হলো কোটি কোটি মানুষের তৈরি করা শিল্পের ব্যাকরণ, রঙ এবং শব্দের গাণিতিক বিন্যাস। মানুষের প্রবৃত্তি যেখানে আবেগ দিয়ে ক্যানভাস রাঙায়, এআই সেখানে সম্ভাবনা আর পরিসংখ্যান দিয়ে নিখুঁত ছবি ফুটিয়ে তোলে। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির যেমন আলোকময় দিক আছে (যেমন দয়া মায়া ও সহানুভূতি), তেমনি এর অন্ধকার দিকও রয়েছে (যেমন লোভ, হিংসা ও আগ্রাসন)। কিন্তু এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখে মানুষের ‘বিবেক‘ এবং সামাজিক মূল্যবোধ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিজস্ব কোনো বিবেক বা নৈতিকতাবোধ নেই। সে মূলত একটি নিরপেক্ষ আয়না। তাকে যে ধরনের ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং মানুষের তৈরি যে ‘কোড‘ বা নির্দেশনাবলী দেওয়া হবে, সে সেভাবেই আচরণ করবে। তাই এআই–কে নিয়ন্ত্রণ করতে মানুষের উচ্চতর নৈতিক প্রবৃত্তির প্রয়োগ আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
সহজাত প্রবৃত্তিগুলো হলো আমাদের মানবমনে এক বিশাল বুনো বাগান। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো সেই বাগানের পরিচর্যা করার জন্য মানুষেরই তৈরি করা একটি আধুনিক ও শক্তিশালী যন্ত্র। যন্ত্রটি বাগানকে আরও সুন্দর করে তুলতে পারে, আবার অসতর্ক ব্যবহারে পুরো বাগান ধ্বংসও করে দিতে পারে। দিনশেষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই উন্নত হোক না কেন, তা মানুষেরই মেধার তৈরি এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রার যুগে মানুষের উচিত তার ভেতরের দয়া, প্রেম এবং বিবেকের মতো সেরা প্রবৃত্তিগুলো দিয়ে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পরিচালিত করা। তবেই প্রকৃতি ও প্রযুক্তির এই যুগলবন্দী মানবসভ্যতাকে নিয়ে যাবে এক অনন্য উচ্চতায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক












