দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল অপরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়। এতে প্রতি বছর ব্যয় হয় কোটি কোটি ডলার। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ শেষ হলে একই অপরিশোধিত তেল দেশে পরিশোধন করে প্রতি ব্যারেলে প্রায় ২০ মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে বছরে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরো কমলে সাশ্রয়কৃত অর্থের পরিমাণ আরো বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক লাভের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় এক দশকের বেশি সময় বিলম্ব হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফা বেড়েছে, পরিবর্তন হয়েছে অর্থায়নের উৎস, সংশোধন হয়েছে বাস্তবায়ন কৌশল। অবশেষে প্রকল্পের গতি বাড়াতে আন্তর্জাতিক দরপত্রে ‘ওয়ান স্টেজ, টু এনভেলপ’ পদ্ধতি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অচিরেই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে টেন্ডার আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
৭ জুলাই অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন–কনসেশনাল লোনের সভায় প্রকল্পটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। সরকার প্রকল্পটিকে একটি শিল্পপ্রকল্প হিসেবে বিবেচনা না করে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
নগরীর পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে মাত্র ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। অথচ দেশের মোট জ্বালানি তেলের চাহিদা ৭০ লাখ টনের কাছাকাছি। ফলে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, জেট ফুয়েল ও অন্যান্য পরিশোধিত জ্বালানির বড় অংশ বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হয়। এতে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি খাতে, অর্থনীতিতে।
ইআরএল–২ চালু হলে বছরে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন ক্ষমতা যুক্ত হবে। অর্থাৎ মোট সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে ৪৫ লাখ টনে। এতে দেশের চাহিদার অর্ধেকের বেশি তেল অভ্যন্তরীণভাবে পরিশোধন করা সম্ভব হবে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজাউর রহমান কমিটির ওই বৈঠকে জানিয়েছেন, প্রকল্পটির আর্থিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (এফআইআরআর) ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (ইআইআরআর) ২৩ দশমিক ২১ শতাংশ। অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে এ ধরনের রিটার্ন ইতিবাচক বলে মনে করা হয়। ইআরএল–২ চালু হলে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল থেকে প্রায় ২০ ডলার সাশ্রয় হবে। বছরে যার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জ্বালানি খাতে প্রতি বছর যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে তাতে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত লাভজনক। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানির দাম সাধারণত অপরিশোধিত তেলের তুলনায় বেশি থাকে। দেশে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়লে সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় অংশ দেশে থেকে যাবে।
ইআরএল–২ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয় বেশ আগে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে মূলত এক যুগ ধরে এটি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, নকশা পরিবর্তন, অর্থায়ন সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার মধ্যে আটকে ছিল। এ সময়ে বৈশ্বিক নির্মাণ ব্যয়, যন্ত্রপাতির মূল্য, ডলার বিনিময় হার এবং প্রকৌশল ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হলে অনেক কম খরচে এই সুবিধা পাওয়া যেত। বিলম্বের কারণে একদিকে যেমন নির্মাণ ব্যয় বেড়ে গেছে, তেমনি প্রতি বছর শত শত মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় থেকেও বঞ্চিত হয়েছে দেশ।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার বৈশ্বিক নীতির কারণে বর্তমানে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইএসডিবি) থেকে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নিচ্ছে। ঋণের প্রথম ধাপে প্রায় ৫২০ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার এবং দ্বিতীয় ধাপে ৪৮৩ মিলিয়ন ডলার পাওয়া যাবে। ঋণের মেয়াদ ২০ বছর, গ্রেস পিরিয়ড পাঁচ বছর। সুদের হার হবে ছয় মাসের সিকিউরড ওভারনাইট ফিনেন্সিং রেট বা এসওএফআরের সঙ্গে অতিরিক্ত ১ দশমিক ৬ শতাংশ যোগ করে। বর্তমান হিসাবে কার্যকর সুদের হার প্রায় ৫ দশমিক ৪৪৬ শতাংশ।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহ্রিয়ার কাদের ছিদ্দিকী ওই বৈঠকে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ পাওয়া এখন কঠিন। আইএসডিবির সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক থাকায় বাংলাদেশ এ অর্থায়নের সুযোগ পেয়েছে।
সূত্র বলেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবার প্রচলিত দীর্ঘ দরপত্র প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ‘ওয়ান স্টেজ, টু এনভেলপ’ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ পদ্ধতিতে প্রথমে কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করা হবে। শুধু যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক প্রস্তাব খোলা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে মূল্যায়নের সময় কমবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কয়েক মাস এগিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, বিপিসির পাইপলাইনে জ্বালানি তেল খালাসের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে নতুন দিগন্তের হাতছানি দিচ্ছে। গভীর সমুদ্রে নোঙর করা বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে অপরিশোধিত তেল মহেশখালী হয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। আগামী নভেম্বর নাগাদ এই প্রকল্প পুরোপুরি চালু হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে জ্বালানি তেল খালাসে সময় ও অর্থ দুটিই উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সাশ্রয় হবে।
এসপিএমের পূর্ণ অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে হলে দেশে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ইআরএল–২ চালু হলে এসপিএমের মাধ্যমে আরো বেশি অপরিশোধিত তেল এনে দ্রুত পরিশোধন করা সম্ভব হবে। ফলে দুটি প্রকল্প পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
সূত্র বলেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্বাভাবিক হওয়ার পর বিপিসি আবারও লাভজনক অবস্থানে ফিরেছে। ইআরএল–২ চালু হলে পরিশোধন মার্জিন বাড়বে, আমদানি ব্যয় কমবে এবং বিপিসির নগদ প্রবাহ আরো শক্তিশালী হবে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সরকারের রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায়ও।
দেশে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং বিমান চলাচলের সম্প্রসারণের সঙ্গে জ্বালানি তেলের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও যুদ্ধের কারণে তেলের মূল্য ওঠানামাও বাড়ছে। শুধু আমদানিনির্ভর পরিশোধিত জ্বালানির ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে সরবরাহ ও দাম উভয় ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সে বিবেচনায় ইআরএল–২ প্রকল্পকে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।












