পাঠক ভাবনায় ‘ওরা ফেরেনি কেউ’

অমিত সরকার | বৃহস্পতিবার , ২৩ জুন, ২০২২ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ

প্রতিবছর উপন্যাস কিনলেও পড়া হয় না সময়ের অভাবে। কিন্তু বই কিনে না পড়াটা আমার স্বভাব নয়। না পড়া বইয়ের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। তারপরও অনেকগুলো বই কিনে নিলাম কিছুদিন আগে। সাথে আসল কথাশিল্পী, কবি, অধ্যাপক বিচিত্রা সেনের ‘ওরা ফেরেনি কেউ’। সমপ্রতি উপন্যাসটি পড়ে শেষ করলাম। এটি তার দ্বিতীয় উপন্যাস। প্রথম উপন্যাস ‘অনামিকার অহর্নিশ’ পাঠ করে একজন শক্তিমান কথাসাহিত্যিকের উন্মেষ দেখতে পেয়েছিলাম, ফলে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস পাঠের একটি তাগিদ ভেতরে ভেতরে থেকে গিয়েছিল। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘অনামিকার অহর্নিশ’, যেখানে এক নারীর জীবন কেন্দ্রিক, সেখানে ‘ওরা ফেরেনি কেউ’ একটা পরিবারের সামাজিক সংগ্রামের ইতিহাস।

১. কাহিনির পটভূমি পূর্ববঙ্গের এক বনেদি হিন্দু পরিবারকে কেন্দ্র করে। যার ব্যাপ্তি বৃটিশ ভারত, পূর্ব পাকিস্তান, একাত্তর হয়ে সামপ্রতিক বাংলাদেশকে ছুঁয়ে যায়। মনো ডায়ালগে বর্ণিত উপন্যাসে ক্রমাগত বর্ণনার মধ্যে এগিয়ে গেছে। গল্প বয়ানের ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা নেই। ঘটনা বর্ণনায় ভাষা পরিমিত।

পারিপার্শ্বিকতার ডিটেইল বর্ণনা করতে গিয়ে মূল ঘটনার বর্ণনা এবং চরিত্রের ওপর পাঠকের মনোসংযোগ বিনষ্ট করে না। সংলাপে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার খুবই দুর্দান্ত। অঞ্চল ভেদে আঞ্চলিক ভাষার যে রূপ বৈচিত্র্য তা উপন্যাসে লেখক ভালোভাবে কাজে লাগিয়েছেন। এমনিতে গল্প, উপন্যাসে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে অনেকে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগেন। এ ক্ষেত্রে লেখক খুবই উদার, যদিও বিষয়টি অন্যান্য জেলার মানুষদের কিছুটা বাধাগ্রস্ত করতে পারে, তবে বর্ণনার টান টান প্রবাহ পাঠকের সে বাধা দূর করে দেবে বলে আমার মনে হয়েছে।

২. বার্মা তথা রেঙ্গুন ছিল তৎকালীন দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের সৌভাগ্যের স্বর্ণদ্বার। ভাগ্য পরিবর্তনে চট্টগ্রামের মানুষ রেঙ্গুনে পাড়ি জমাত। এসব কর্মঠ, পৌরুষদীপ্ত পূর্ব পুরুষদের প্রেমে মজে যেত রেঙ্গুনের সহজ, সরল, উদারমনা বার্মিজ সুন্দরী রমণী। অতঃপর বিয়ে। অথচ দেশে তাদের অনেকের ছিল সংসার, পরিবার পরিজন। ফলে তাদের বিরহ, নিয়ত উৎকণ্ঠা, নানা মানবিক সংকট তৎকালীন সমাজে ছিল নিত্য। উপন্যাসের প্রারম্ভিক কেন্দ্রীয় চরিত্র নন্দলাল। নন্দলাল ভাগ্যান্বেষী একজন বাঙালি যুবক। নিজের ভাগ্যকে পরখ করতে প্রত্যন্ত গ্রাম ছেড়ে চট্টগ্রাম শহর, তারপর পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রিটিশ শাসিত বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনে। কথাশিল্পী উপন্যাসে নন্দলাল চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে প্রায় বিস্মৃত হয়ে ওঠা এই বিশেষ অঞ্চলের সামাজিক এবং মানবিক ইতিহাসের এক নির্ভরযোগ্য চিত্র পাঠকের নিকট হাজির করেছেন, যা সমসাময়িক কথাসাহিত্যে বলতে গেলে প্রায় অনুপস্থিত।

নন্দলালের রেঙ্গুনে অবস্থান, বার্মিজ রমণীর সাথে সংসার, অথচ দেশে ফিরে পরিস্থিতির চাপে পড়ে কিশোরী বধূ মনিবালার সাথে বিবাহে বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, পরিশেষে বার্মার সংসারকে চিরতরে ত্যাগ করে দেশে ফেরা, ব্যবসায়িক বিপর্যয়, হতাশা, এবং মৃত্যুর দীর্ঘকালীন অভিঘাত এবং সংগ্রাম বিধবা মনিবালা ও তার পরিবার কিভাবে বয়ে বেড়িয়েছিল তারা বর্ণনা পেতে আপনাকে উপন্যাসের দ্বারস্থ হতে হবে।

৩. মনিবালা যেন ত্রিকালের সাক্ষী গ্রামের বয়সী বৃক্ষের মত। মৃত স্বামীর, জমিজিরাত, সংসার সব সামলায়। একমাত্র ছেলে আদিত্য নারায়ণকে মানুষ করার ব্রত নেয়। বাবার মত ছেলেও উচ্চ শিক্ষার জন্য চট্টগ্রামের বনেদি ঘোষ পরিবারের মেস বাড়িতে উঠে আসেন। সেখানেই দেখা হয় কলকাতায় পড়ুয়া তরুণী মালবিকা ঘোষের সাথে তাদের বিবাহ, বিবাহের পূর্বে কমলা রোদের মত মিষ্টি রোমান্টিকতার যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে পাঠক অনুমান করতে পারবেন, সে সময়ের রক্ষণশীল পরিবেশের মধ্যে প্রেম ভালোবাসা কিভাবে লতিয়ে ওঠে। এই দুইটি চরিত্র তৎকালীন মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের একেবারে আদর্শ প্রতিনিধি। তাদের মার্জিত প্রেম ভালোবাসা, দাম্পত্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ পাঠককে আকৃষ্ট করবে।

বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হিসাবে আদিত্য নারায়ণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন।বাংলাদেশর স্বাধীনতা পূর্বে পাকিস্তানের যে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন চলছিল তাতে তিনি ভালোভাবে জড়িয়ে যান। ফলে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের কোপানলে পড়েন আদিত্য নারায়ণ ও তাঁর তিন জ্ঞাতিজন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা পরিচয় গোপন করে পালিয়ে বেড়ান নানান আশ্রয়ে। এক পর্যায়ে হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। দেশ স্বাধীন হয় কিন্ত, কিন্তু তারা কেউ ফেরেন না। পাওয়া যায় না লাশের কোনো চিহ্ন, কোনো রকমের হদিশ। অনন্ত অপেক্ষারত মনিবালা তার সন্তানের জন্য, মালবিকা তার প্রেমময় স্বামীর জন্য। দেশ স্বাধীনের পর পুরুষ বিহীন এই পরিবার যে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে জীবনকে টেনে নিয়ে গেছে শেষ অবধি তার একটা বিস্তীর্ণ আখ্যান লিখে রাখা যেতো, কিন্তু লেখক পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাননি।

৪. যদিও পড়তে পড়তে মনে হতে পারে উপন্যাসটি একটি পরিবারের উত্থান পতনের ইতিহাস। কিন্তু চরিত্রগুলো তৎকালীন সমাজ ও পরিবেশ বিচ্ছিন্ন নয় বলে বর্ণনায় অবধারিতভাবে উঠে এসেছে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। পরিমিত বর্ণনার (আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের আগে ও পরের ঘটনাবলী) ভেতর দিয়ে মূল কাহিনীর বিন্যাস এবং বিস্তার। সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সাবলীল বিবরণ এবং পর্যবেক্ষণ তাই এই উপন্যাসের একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। আদিত্য নারায়ণ যদিও এক জন সরকারি চাকুরীজীবী তবে তার প্রবল শিল্পীসত্তা এবং দেশপ্রেম। বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন রাজনীতির তুুখোড় মাঠকর্মী। আদিত্য এবং পার্শ্ব চরিত্রগুলো আমাদের মুক্তিসংগ্রামের আগুনঝরা দিনগুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষী।

৫. লেখকের লিখন শৈলীর সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ঘটেছিল তার ছোট গল্প এবং উপন্যাস পাঠের মাধ্যমে। আমি মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করেছি অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে একজন সফল ছোট গল্পকার থেকে একজন দক্ষ উপন্যাস রচয়িতার উত্তরণ। আমার জানা মতে তাঁর প্রথম উপন্যাস পাঠক মহলে সাড়া জাগিয়েছিল। তার দ্বিতীয় উপন্যাস পড়া শেষ করে বুঝলাম, লেখক পাঠকের আস্থার জায়গাটুকুতে ভালো রকম সেবা-যত্ন করেছেন।

৬. উপন্যাসটি কালের সুদীর্ঘ ক্যানভাস জুড়ে বিস্তৃত-সেই বৃটিশ আমল থেকে হালের বাংলাদেশ পর্যন্ত। এ ধরনের উপন্যাসের কলেবর অনেক বৃদ্ধি পেয়ে পাঠস্পৃহা কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারতো। লেখক সচেতনভাবে আধুনিক ব্যস্ততম পাঠকের মনস্তত্ত্বের জরুরি বিষয়টি মাথায় রেখে উপন্যাসের যবনিকা টেনেছেন সফলভাবে। লেখকের এই দক্ষতা দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার মত নয়।

বাংলা নামের যে দেশের জন্ম তার সাথে মিশে আছে নাম না জানা অগুণতি মানুষের আত্মত্যাগ। এইসব মানুষের রেখে যাওয়া পরিবারের নিভৃততম দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি, চাওয়া না পাওয়ার সামাজিক মূর্ত দলিল কথাশিল্পী বিচিত্রা সেনের উপন্যাস ‘ওরা ফেরেনি কেউ’। উপন্যাসটি লেখকের সচেতনে অথবা অসচেতনে হয়ে উঠেছে মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস।

পরিশেষে, বলবো, ‘ওরা ফেরেনি কেউ’ এ সময়ের পাঠকদের অবশ্যই পাঠ করার মতো একটি বই। বৃহত্তর পরিসরে উপন্যাসটির যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি।

লেখক : সাহিত্যকর্মী