বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা–সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সব ধর্ম–বর্ণের মানুষের নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সমপ্রতি পশ্চিমবঙ্গে একটা নির্বাচন হয়েছে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী এলাকা হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, কিন্তু নির্বাচন নিয়ে আমরা এ জন্য কোনো কথা বলতে চাই না। তবে আমরা দেখেছি নির্বাচনের আগে কয়েক লাখ ভোটারের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের ভোটদান থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। তাদের অধিকাংশ ছিল মুসলমান এবং মতুয়া সমপ্রদায়ের।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি হলে এনসিপিতে যোগদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ ও উৎসবমুখর অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দীন। আরিফ মঈনুদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করতে গিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা–৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে কালবৈশাখী ঝড় চলছে। বিএনপি সরকারে এসে তারা সংস্কার বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। ওয়াসিম যেই জায়গায় রক্ত নিয়েছে আমরা ওয়াসিমের রক্তের এই শহরে দাঁড়িয়ে আছি। অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, ওয়াসিম, আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধরা যে কারণে রক্ত দিয়েছিল বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই জায়গা থেকে তারা সরে আসছে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সমন্বয়কারী মীর শোয়াইব। বক্তৃতা করেন মহানগর সমন্বয়কারী সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান হৃদয়। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, আমি সংসদেও এটা বলেছি, সেখানে (পশ্চিমবঙ্গে) মুসলমানদের নির্যাতন করা হচ্ছে, তাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, এটার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। নির্বাচনের পরেও সেখানে মুসলিম নির্যাতন হচ্ছে, মতুয়া, দলিত ও সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা একটা কথা সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই– পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের ফলাফলের পরে বাংলাদেশের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এদেশের হিন্দু–মুসলমান–বৌদ্ধ–খ্রিস্টান সকলের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের দায়িত্ব আমাদের নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের শত্রুপক্ষ যারা বাংলাদেশবিরোধী, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী, তারা নানা উসকানি দিবে, সামপ্রদায়িকতা ছড়ানোর চেষ্টা করবে, নানা প্রোপাগান্ডা করবে। আমাদের এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। আমরা এটা দেখিয়ে দেব, দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘুদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হবে এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশকে বাংলার মুসলমান, দলিত, মতুয়া সমপ্রদায়সহ সকলের দায়িত্ব নিতে হবে এবং তাদের অধিকারের পক্ষে কথা বলতে হবে।
এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, আজ যারা নতুন করে যোগদান দিচ্ছেন এবং যারা আগে থেকেই আছেন, সবাইকে একটাই প্রতিজ্ঞা করতে হবে– আমরা নিজেদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব রাখব না। যে যেখান থেকেই আসুন না কেন, এনসিপির পতাকা তলে সবাই যোগ্যতা অনুসারে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। কারণ ঐক্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশে আবার সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশে জুলাই গণহত্যা ও সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি এনসিপিকে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেটি সংসদ এবং রাজপথে। আন্দোলনে আমাদের অনেক বোন রাজপথে থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। তাদের অধিকার রক্ষায় আমাদের কাজ করতে হবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা দেখতে চায় না আর একটি শিশুও হামের কারণে মৃত্যুবরণ করুক। সরকারকে বলবো, আপনারা পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা বৃদ্ধি করুন।
প্রধান বক্তার বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, প্রিয় চট্টগ্রামবাসী বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী আমাদের কাছে এসে দুঃখ প্রকাশ করে। ভাই দলটার জন্য ১৭ বছর নিজের অর্থ দিয়ে শ্রম দিয়ে পরিশ্রম দিয়ে জেল খেটেছি দলটার জন্য। কিন্তু আজকে দুঃখ হয় ওই বিএনপি হচ্ছে হাইজ্যাক হয়ে গিয়েছে আওয়ামী লীগের দ্বারা। যার কারণে আজকে ইসহাক সরকার ভাই আমাদের সামনে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে যেতে হবে। আপনাদেরকে মাথায় রাখতে হবে, নীরবে একটি বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। প্রত্যেকেই এনসিপিতে আসতে যাচ্ছে। বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী আমাদের এনসিপিতে যোগ দিতে চাচ্ছে বলে উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, তারা হয়তো অনেকে লজ্জায় এখন বলতে পারে না। আপনারা তাদের কাছে যাবেন। প্রত্যেকটা কমিটির যারা নেতাকর্মী আছে তাদের কাছে আমাদের এনসিপির দাওয়াত পৌঁছে দিবেন। আমরা বিশ্বাস রাখতে চাই যারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করেছে তারা বাংলাদেশ পন্থীদের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছে। সংস্কারের, আমাদের শহীদদের আকাক্সক্ষার বিরুদ্ধে চলে গেছে। কিন্তু বিএনপির লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী এখনো পর্যন্ত আমাদের স্পিরিটের সাথে আছে।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, চট্টগ্রামের অসংখ্য নারী নেত্রী এই জুলাইয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল। কিন্তু এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা তাদেরকে পুনর্গঠন করতে পারি নাই। তাদেরকে আমরা একত্রিত করতে পারি নাই। সে জন্য অনেক নারী নেতৃত্ব তারা রাজনীতি থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। সে জন্য নারী নেতৃত্বের মধ্যে যারা আছেন আপনাদেরকে অনুরোধ করব চট্টগ্রামে যে নারী শক্তি রয়েছে, নারীদের মধ্যে যে নেতৃত্বের ক্ষমতা, দক্ষতা রয়েছে আপনারা প্রত্যেকটা নারীর কাছে যাবেন। তাদেরকে পুনর্গঠিত করে রিঅর্গানাইজ করবেন। আমাদের বৃহত্তের যে লক্ষ্য এই লক্ষ্য নারীদেরকে আপনারা অংশগ্রহণ করাবেন।
ঢাকায় যখন আন্দোলন বন্ধ হওয়ার উপক্রম তৈরি হয়েছিল, চট্টগ্রাম থেকে আবার আন্দোলন শুরু হয়ে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা বিশ্বাস করতে চাই চট্টগ্রামে এনসিপির যেই বসন্ত চট্টগ্রামে সমপ্রসারিত হয়েছে সেই বসন্ত সারা বাংলাদেশের প্রত্যেকটি পথে প্রান্তরে প্রত্যেকটি জেলা উপজেলায় প্রত্যেকটি হাটে মাঠে ঘাটে পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে যাবে।
অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করতে গিয়ে এনসিপি ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকার বলেছেন, ঢাকা বিজয় হয়েছে। আজকে চট্টগ্রাম বিজয়ের যাত্রা শুরু হয়েছে। যারা জুলাইয়ের সঙ্গে বেইমানি করেছে তাদের সঙ্গে জনগণের কোন সম্পর্ক নেই।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি করছে। সনদ বাস্তবায়নে বিভিন্ন তালবাহানা শুরু করেছে। সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে আমরা রাজপথে আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে দাবি আদায় করে নিবো। জুলাইয়ে আমার ভাই হত্যার বদলা আমরা নিবোই। অনুষ্ঠানে এলডিপি, সোস্যাল এক্টিভিস্ট, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় দেড় হাজার নেতা–কর্মী এনসিপিতে যোগদান করেন।














