পরিবেশের অবক্ষয়, জীবাশ্ম জ্বালানির নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে ওঠায় বৈদ্যুতিক যানবাহন (ঊঠ) এসব সমস্যা সমাধানের একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ব্যাটারি ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক মোটর এবং চার্জিং অবকাঠামো এসবই হলো বৈদ্যুতিক গাড়ির মূল প্রযুক্তির অন্তর্ভুক্ত উপাদান। অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত প্রথাগত যানবাহনের তুলনায় বৈদ্যুতিক যানবাহন বেশ কিছু সুবিধা প্রদান করে; যেমন দূষণ হ্রাস, জ্বালানি দক্ষতার উন্নয়ন এবং পরিচালন ব্যয় কম হওয়া। তবে এর পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে, যা এদের ব্যাপক প্রচলনে বাধা সৃষ্টি করছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ ক্রয়মূল্য, সীমিত ড্রাইভিং রেঞ্জ, অপর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামো এবং ব্যাটারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা। বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং টেকসই পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। সামগ্রিক বিবেচনায়, বৈদ্যুতিক যানবাহন একটি পরিচ্ছন্ন ও টেকসই ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
বৈদ্যুতিক যানবাহন এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চালিত হয়; এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনে জীবাশ্ম জ্বালানি (ডিজেল, অকটেন, গ্যাস) পোড়ানোর পরিবর্তে রিচার্জেবল ব্যাটারি প্যাকে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করা হয়। বৈদ্যুতিক যানবাহন গ্রিড থেকে প্রাপ্ত বৈদ্যুতিক শক্তির ৭৭%-এরও বেশি অংশকে চাকার শক্তিতে রূপান্তরিত করে, যা প্রথাগত অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন (ICE) চালিত যানবাহনের ১২% থেকে ৩০% কর্মদক্ষতার তুলনায় অনেক বেশি।
প্রচলিত গাড়ির তুলনায় বৈদ্যুতিক যানবাহনে সচল যন্ত্রাংশের সংখ্যা অনেক কম থাকে (যেমন তেল পরিবর্তন, স্পার্ক প্লাগ বা মাল্টি–স্পিড ট্রান্সমিশনের প্রয়োজন হয় না), ফলে এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও ঝামেলা কম হয়। যদিও পেট্রোলচালিত গাড়ির প্রাথমিক ক্রয়মূল্য কম হয়, তবুও সামগ্রিক জীবনচক্রের বিচারে বৈদ্যুতিক যানবাহনগুলোই অধিক সাশ্রয়ী হিসেবে প্রমাণিত হয়।
ব্যাটারি প্যাক থেকে বৈদ্যুতিক মোটরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে একটি চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে এবং দ্রুত টর্ক (ঘূর্ণন শক্তি) সৃষ্টির মাধ্যমে চাকাগুলোকে ঘোরায়। গাড়ি ধীর করার সময় বা ঢালু পথে নামার সময় বৈদ্যুতিক মোটরটি জেনারেটর হিসেবে কাজ করে; এটি গতিশক্তি সংগ্রহ করে এবং তা পুনরায় ব্যাটারি চার্জ করার কাজে লাগায়।
একটি ইভি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর নির্ভর করে। ট্র্যাকশন ব্যাটারি প্যাক হলো ‘জ্বালানির ট্যাঙ্ক’; এটি গাড়িকে শক্তি দেওয়ার জন্য উচ্চ–ভোল্টেজের ডাইরেক্ট কারেন্ট বিদ্যুৎ সঞ্চয় করে। ইলেকট্রিক মোটর হলো ‘ইঞ্জিন’; এটি ব্যাটারির বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে চাকা ঘোরায়। পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স কন্ট্রোলার (ইনভার্টার) হলো ‘মস্তিষ্ক’; এটি ব্যাটারি থেকে মোটরে বৈদ্যুতিক শক্তির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং গাড়ির ত্বরণ নির্ধারণ করে। অনবোর্ড চার্জার একটি সাধারণ ওয়াল আউটলেট বা হোম চার্জার থেকে আসা অল্টারনেটিং কারেন্ট –কে ব্যাটারির প্রয়োজনীয় DC শক্তিতে রূপান্তরিত করে।
সব ধরনের বৈদ্যুতিক যানবাহন জ্বালানি সাশ্রয় ও জ্বালানি খরচ কমাতে এবং বায়ুর মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করতে সহায়তা করতে পারে। পরিবহনের শক্তির উৎস হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের উন্নতি ঘটায়, সুরক্ষাগত সুবিধা প্রদান করে এবং একটি নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অবদান রাখে।
বৈদ্যুতিক গাড়িতে ব্যবহৃত উন্নত মানের ব্যাটারিগুলো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার উপযোগী করে তৈরি করা হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর কার্যক্ষমতা কমে আসে। অনেক বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্যাটারির জন্য ৮ বছর বা ১,০০,০০০ মাইল পর্যন্ত ওয়ারেন্টি সুবিধা প্রদান করছে। আবহাওয়ার পাশাপাশি ব্যাটারির আয়ুষ্কালের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী অন্যান্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে গাড়ি চালানোর ও চার্জ দেওয়ার ধরন, ব্যাটারি সেলের গঠন ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং গাড়ি–ব্যাটারি–পরিবেশের তাপীয় ব্যবস্থাপনা।
যদিও বৈদ্যুতিক গাড়ির জ্বালানি খরচ সাধারণত একই ধরনের প্রচলিত গাড়ির তুলনায় কম, তবে কেনার সময় এর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে। উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দাম প্রচলিত গাড়ির সমান হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির চালিকাশক্তির যন্ত্রাংশগুলোর উচ্চ কার্যক্ষমতার কারণে এ ধরনের গাড়ি জ্বালানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারে। যেহেতু সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং পিএইচইভি –গুলো সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বৈদ্যুতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল, তাই প্রচলিত গাড়ির তুলনায় এদের জ্বালানি সাশ্রয়ের হিসাব ভিন্নভাবে করা হয়। এ ক্ষেত্রে ‘মাইলস পার গ্যালন অফ গ্যাসোলিন ইকুইভ্যালেন্ট’ এবং প্রতি ১০০ মাইলের জন্য ‘কিলোওয়াট–আওয়ার’ হলো বহুল ব্যবহৃত পরিমাপক। গাড়ি চালানোর ধরনের ওপর ভিত্তি করে, বর্তমানের হালকা–শ্রেণির সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক গাড়িগুলো ১৩০ MPGe–এর বেশি দক্ষতা দেখাতে পারে এবং মাত্র ২৫–৪০ শডয বিদ্যুৎ খরচ করে ১০০ মাইল পথ চলতে পারে। সাধারণত, একই ধরনের প্রচলিত গাড়ির তুলনায় এইচইভিগুলো ভালো জ্বালানি সাশ্রয় করে এবং এদের জ্বালানি খরচও কম হয়। পাবলিক চার্জিং স্টেশনগুলো গ্যাস স্টেশনের মতো সর্বত্র সহজলভ্য নয়। সরকারি সংস্থাগুলো মিলে দ্রুতগতিতে পাবলিক চার্জিং স্টেশনের একটি জাতীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।
মোট সংখ্যার বিচারে চীন সবচেয়ে বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহার ও বিক্রি করে। অন্যদিকে, মাথাপিছু ব্যবহারের হার এবং বাজারের হিস্যার দিক থেকে নরওয়ে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে। চীন বৃহত্তম বাজার; মোট সংখ্যা ও বিক্রির দিক থেকে বিশাল ব্যবধানে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালে দেশটিতে ১ কোটি ১০ লাখেরও (১১ মিলিয়ন) বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা তাদের নতুন যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রির প্রায় ৫০% থেকে ৫৩% এবং বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির প্রায় দুই–তৃতীয়াংশ। এ ছাড়া মোট বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যার দিক থেকেও চীন সবার চেয়ে এগিয়ে আছে (২ কোটিরও বেশি গাড়ি)।
যুক্তরাষ্ট্র মোট বিক্রির সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালে এখানে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে (যা বাজারের প্রায় ১০% হিস্যা)। ইউরোপ (জার্মানি, যুক্তরাজ্য, সুইডেন, ফ্রান্স) বৈদ্যুতিক গাড়ির আরেকটি বড় আঞ্চলিক কেন্দ্র, যদিও মোট গাড়ির সংখ্যার বিচারে এখানকার দেশগুলো চীনের তুলনায় পিছিয়ে আছে। নরওয়ে শতাংশের হিসেবে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে। এখানে নতুন যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রির প্রায় ৯৫% থেকে ৯৭%-ই বৈদ্যুতিক গাড়ি। এর পেছনে রয়েছে ব্যাপক কর ছাড় এবং সরকারি সহায়তা। নেপাল বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে; এখানে নতুন গাড়ি বিক্রির প্রায় ৬৮% থেকে ৭৩%-ই বৈদ্যুতিক গাড়ি। সিঙ্গাপুর, আইসল্যান্ড ও সুইডেন–এই দেশগুলোও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তালিকার কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে; এখানে নতুন গাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারের হিস্যা ৫৫% থেকে ৬৩%-এর মধ্যে।
সারা বিশ্বে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়েক শ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি বিআরটিএতে নিবন্ধিত হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে গাড়ির উচ্চ শুল্ক কমাতে হবে। দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমবে। সরকারি তথ্য মতে, দেশে ৭০ লাখের মতো বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চলাচল করে। বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে চার্জিংয়ের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাবে; তাই দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনা আরও উন্নত করতে হবে। গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন লেভেলের টেকনিশিয়ান ও দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে।
বৈদ্যুতিক গাড়ির মূল্য দেশে মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে গাড়ি সংযোজন ও উৎপাদনের সুবিধা সৃষ্টি করতে হবে। ব্যাটারি, গাড়ির যন্ত্রপাতি, রক্ষণাবেক্ষণের যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ সহজলভ্য করার জন্য উদ্যোক্তা ও জনবল তৈরিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার, বিশেষজ্ঞ, একাডেমিয়া, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সকলে কাজ করলে দেশে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে।
পরিবেশবান্ধব ও পরিচ্ছন্ন পরিবহন ব্যবস্থার প্রচলন বাড়ছে এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন এর একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে। ব্যাটারি প্রযুক্তির উন্নয়ন, অধিকতর দক্ষ পাওয়ারট্রেন এবং চার্জিং স্টেশনের ক্রমবর্ধমান নেটওয়ার্কের কারণে বৈদ্যুতিক যানবাহনগুলো প্রথাগত জ্বালানিচালিত গাড়ির সঙ্গে সফলভাবে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম। জ্বালানি ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়িতে অর্থায়ন অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়নের মাধ্যমে এদের বিক্রি বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্যতার কারণে আগামী বছরগুলোতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন পরিবহন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ আমূল বদলে দিতে পারে; কারণ এগুলো অধিকতর টেকসই ব্যবস্থা, পরিবেশের ওপর কম নেতিবাচক প্রভাব এবং উন্নত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো বহুবিধ সুবিধা প্রদান করে। সরকার, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করে, তবে একটি পরিবেশবান্ধব ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক যানবাহন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে। লেখক: প্রকৌশলী










