পরমবন্ধু চিরনির্ভর চিরনির্ভার

লুসিফার লায়লা | শুক্রবার , ২৯ এপ্রিল, ২০২২ at ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ

 

 

`courage! life is worth all its suffering as long as there are faithful friends to weep with us’ Jean Christophe

রোমাঁ রোলাঁর ভাষায় ব্যথার অশ্রু মুছিয়ে দেয়া সঙ্গী আর সংস্কৃতে চাণক্যের দেয়া বন্ধুর সংজ্ঞা ‘উৎসবে ব্যসনে চৈব দুর্ভিক্ষে রাষ্ট্রবিপ্লবে। রাজদ্বারে শ্মশানে, যস্তিষ্ঠটি স বান্ধব’পাশে বন্ধুত্বের আস্ত আখ্যান নিয়ে চুপচাপ এসে বসে শঙ্খ ঘোষের ‘পরমবন্ধু প্রদ্যুম্ন’!

একবার নয়, বহুবার এই বইটার নানা পাতা থেকে কুড়িয়ে নিয়েছি পরমবন্ধু শব্দের প্রকৃত মানে। যাবতীয় বিজ্ঞাপিত সম্পর্কের মুখোশ খসে পড়া মুহূর্তে দ্বারস্থ হয়েছি শঙ্খ ঘোষের ‘পরমবন্ধু প্রদ্যুম্ন’ বইটার। নিস্তেজ আলোর সকালবেলায় উষ্ণতা ছড়িয়ে খুলে যাচ্ছে প্রীতিভাজনেষু কিংবা কেবল শঙ্খ সম্বোধনে লেখা প্রদ্যুম্ন ভাট্টাচার্যের চিঠি আর সেইসব চিঠির সাথে জুড়ে দেয়া ফুটনোটে শঙ্খ ঘোষের মন্তব্য। নিত্য যে বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলো আমরা যাপন করি সেগুলোকেও অন্য আলোয় এনে দেখার জন্যে হাতে তুলে নেয়া চাই ‘পরমবন্ধু প্রদ্যুম্ন’। আর এরই ভেতর দিয়ে জীবনের নানা অনুষঙ্গের একটা নতুন পাঠ উপস্থাপিত হতে পারে আমাদের জানাশোনা এবং চেনার জগতে।

টিকা টিপ্পনী’, আখ্যান ও সমাজ ঃ তারাশঙ্কর’ এর মত অল্প কিছু বইয়ের মধ্য দিয়ে অল্প সংখ্যক মানুষ চেনেন প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যকে। ব্যাক্তিগত পরিচিতির জগত থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাওয়া পরমবন্ধুর চিঠি আর ওঁর সাথে কাটানো অজস্র সময়কে নিয়ে শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন এবইটি। এই বইটার ভেতর দিয়ে আবারও নতুন করে জেনেছি ব্যাক্তি আমিকে মুখ্য করে তোলার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সামষ্টিক কল্যাণ কাজ । ‘ভারতকোষ’এর সহসম্পাদক হয়ে প্রায় সমস্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে অক্লান্ত পরিশ্রম করা মানুষটিকে নিয়ে ভারতকোষ প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন ‘ভারতকোষেএর সূত্র ধরে এখানেও জ্ঞানচর্চার এমন একটা আন্দোলন গড়ে উঠবে, যা কেবল কয়েকজনের বুদ্ধিচর্চাই নয়, হয়ে উঠতে পারে গোটা একটা সমাজ বদলের সূচক। তার জন্যে অপরিহার্য ওই চারটি কাজের (স্থায়ী সম্পাদকীয় দপ্তর, বিরতিহীন সম্পাদনা, বর্ষপঞ্জী, গবেষণাকেন্দ্র) ধারাবাহিক এক কেন্দ্র হয়ে উঠবে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ, এটাই ছিল তার ভাবনায়। হয়তো অলীক ভাবনা। কিন্তু নিভৃত এই ভাবনার দৃঢ় এক সাহস ছিল তার মনে।”

ভারতকোষ’এর প্রথম খন্ডে মুখবন্ধের প্রথম চারটি অংশ লিখেছিলেন প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য । এই তথ্য পাঠকের গোচরে নিয়ে এসেছেন শঙ্খ ঘোষ যখন প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য আর ওঁর নাম প্রকাশে বাধা দেয়ার জন্যে বেঁচে নেই। বিরানব্বই জন বাঘা বাঘা পন্ডিত আর বারটি বিভাগে ভাগ করে নিয়ে ভারতকোষএর বিশাল যজ্ঞ সামলাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করা মানুষটিকেও এক সময় সরে দাঁড়াতে হয়েছে । অনেক বড় স্বপ্ন সার্থক হয়ে না ওঠার যন্ত্রণা ওঁকে ব্যথিত করেছে কিন্তু নানা নতুন কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেকে উজাড় করেছেন । বড় স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে নিজেকে নিয়োজিত করবার ওঁর যে উদ্যম সে প্রসঙ্গে ওঁরই লেখা থেকে পাঠ করতে চাই– ‘অহংবর্জন আত্মবোধের উৎস। কিন্তু অহংকার বর্জন কি সম্ভব ? আত্মতা অর্জন না করলে, অহংবর্জন অসম্ভব। আবার আত্মবিসর্জন না দিলে আত্মপ্রতিষ্ঠা হয় না। অহংবিসর্জন মানে ; বিশ্বকে আত্মীকরণ, এবং নিজেকে জ্ঞেয় রূপে তদ্গত চোখে দেখার ক্ষমতা । ক্রমাগত, ক্রমাগত।’ এই অংশটি উদ্ধৃতি দেবার সময়ে শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন এই অংশটি তিনিও মনে রাখতে চেয়েছেন সবসময়ে। যেহেতু এই বইটি প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যকে নিয়েই ফলে বার বার ঘুরেফিরে ওঁকেই আমরা খুঁজে পাব এই আলোচনায়।

বইটার শিরোনামে আপাত বন্ধুকীর্তনের মত শোনালেও, বইটির পাতায় পাতায় উঁকি দিচ্ছে দেশকাল, ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতির ভেতর সমকালীন ব্যাক্তিমানসের ভিন্ন বৈঠক। রয়েছে সাহিত্য, সংস্কৃতি, নতুন পথ মত, সমালোচনার আঙ্গিক, বিশ্বসাহিত্যের সাথে যোগ এবং এই সময়ের সাহিত্যচর্চার নবীন পাঠ। সমালোচনা সাহিত্য বলে আমাদের এদিকে তেমন করে কিছু তৈরি হয়নি।

কিন্তু তা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত পরিসরে সমালোচনার যে ঘরোয়া ক্ষেত্র সেখানে শঙ্খ ঘোষ এবং প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের পারস্পরিক আলোচনাগুলোর যে পরিচ্ছন্ন ছবি আমরা এই বইটিতে পাই সেটি আমাদের ভাবনাকে অনেকটা পথ দেখাতে পারে। এই বইয়ের ‘বিপন্ন মুখশ্রী’ নামের ছোট একটা পর্বে শঙ্খ ঘোষ সমালোচনা প্রসঙ্গে সহজ কথায় লিখেছেন ‘কেবল বইয়ের সমালোচনাতে নয়, সমস্তরকম শিল্পকাজেরই সমালোচনায় আজ এমন এক অবিনয়ী আত্মতৃপ্তির ছায়া দেখা যায় যে মনে হয় সমালোচকই হতে পারেন একমাত্র যোগ্য স্রষ্টা । কোন একটা সৃষ্টির অথবা নির্মাণের পথ দিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন যে কর্মী, তাঁর সেই পথশ্রম আর পদ্ধতিকে লক্ষ করাটা হয়ে ওঠে না বড়ো, সমালোচনায় থেকে যায় নিতান্ত বাইরের কিছু চারুকথন অথবা নির্দেশলিপি, অগাধ বাৎসল্য কিংবা উন্নাসিক ভৎর্সনা। যিনি কিছু লিখছেন তাঁর লেখার অনুগামী হবার মধ্যেও যে আনন্দ আছে একটা, সেটা আমরা ভুলতে বসেছি।’ শঙ্খ ঘোষের সাথে দ্বিমত করবার মত যথেষ্ট যুক্তি আমাদের হাতে আছে কি ? পাঠের ব্যাপ্তি, চিন্তার গভীরতা, ইতিহাস সচেতনতা, গ্রহণের ক্ষমতা এবং সহমর্মিতার মতো নানা বিষয় মিলিয়ে যে সমালোচক সত্তা তৈরি হয় তিনিই বা তাঁরাই দৃঢ় করতে পারেন সমালোচনা সাহিত্যের ভিত্তি।

কেমন হতে পারে সমালোচনার কাঠামো তারও পরিচ্ছন্ন আভাস মিলে যাবে এই বইয়ের নানা জায়গায়। উদাহরণ হিসেবে টানা যেতে পারে প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের লেখা চিঠির প্রসঙ্গ শঙ্খ ঘোষের নানা লেখার বিষয়ে। শঙ্খ ঘোষের ‘নিঃশব্দের তর্জনী’ বইটি পাঠের মুগ্ধতা এবং সেই সাথে বইটির নানা খুঁটিনাটি আলোচনা, দ্বিমত, বিশ্বসাহিত্যের নানা পাঠের সাথে মিলিয়ে উপস্থাপন এবং শব্দের ব্যবাহারভাবনা নিয়ে দীর্ঘ দুটো চিঠি লিখেছিলেন প্রদ্যুম্ন। বলাবাহুল্য শঙ্খ ঘোষ বইটির দ্বিতীয় সংস্করণে কিছু কিছু পরিবর্তনও ঘটিয়েছিলেন সেঅনুযায়ী। এই বইটিতে প্রকাশিত প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের সে চিঠি দুটো এবং অন্য আরও লেখার আলোচনা আমাদের সাহিত্য সমালোচনার সম্পদ হয়ে উঠতে পারে অনায়াসে।

শম্ভু মিত্রের নাটক, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা, তারাশঙ্করের ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ থেকে শুরু করে পূর্ববাংলার স্বাধীনতা প্রসঙ্গ সবই যেন প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে এবইতে। পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে করা প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের মন্তব্য এখন আমাদের ভাবনার অবকাশ তৈরি করে দেয়। সে ভাবনায় আলো ফেলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পুনঃবিবেচনার জন্যে আমাদের কাঠামো হয়তো এখনো প্রস্তুত নয়

পূর্ব বাংলায় ইতিহাসের আর একটা শর্ট সার্কিট হচ্ছে। মুক্তির ঠিক এই পথ আমার অভিপ্রেত না হলেও লড়াইয়ের প্রথম রাউন্ডে বাঙালি জাতিসত্তা যদি স্বাধিকার পায়, তা বরণীয় । জাগরণের ডাইনামিঙ নিচের তলায় কতটা ছড়াবে তার ওপর ইতিহাসের ক্লাইম্যাক্স নির্ভর করছে। যতদূর দেখছি, ভবিষ্যৎ সহজ নয়।’

বইটার এমন ভারি ভারি বিষয়ের ভেতর দিয়ে খুব সযত্নে উপস্থাপিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের দুই মনীষীর সংবেদী মন। তাত্ত্বিক আলোচনার খরস্রোত পাঠকের চিন্তার গতিকে আন্দোলিত করবে বার বার। আর দুটো মানুষের ব্যাক্তিগত সমর্পণ, অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস, মৃদু প্রগলভতা, ভাব প্রকাশের সারল্য এবং অসংকোচে প্রকাশিত আবেগ এই বইটার অসামান্য কৃতি। গভীর ভালবাসায় থেকেও নিজেদের কাজের ক্ষেত্রটিকে নৈর্বত্তিক জায়গায় দাঁড়িয়ে বিবেচনা করা যায়। সম্পর্কের বাঁধন কিছুমাত্র শিথিল না করেও দ্বিধা, ভিন্ন মত ও পথের বিষয়গুলো খোলা মনে আলোচনা করা চলে এমন সম্ভাবনা দিন দিন আমাদের জীবনযাপন থেকে মুছে যাচ্ছে। বন্ধু, স্বজনের ভিন্নরুচিকে সাদরে গ্রহণ করবার মন এখন ক্রমশ জটিলতায় ভরে উঠছে। সেখানে দাঁড়িয়ে ‘পরমবন্ধু প্রদ্যুম্ন’ যেন সম্পর্কের একটা ভিন্নপাঠ। সব কাজে বাহবা দিয়ে পিঠ চাপড়ে সম্পর্ককে পাকাপোক্ত করে রাখার মেকি চেষ্টা চোখে পড়ে সেইখানে এই বই খুলে দেবে নতুন জানালা। প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য সম্পর্কে শঙ্খ ঘোষ এই বইয়ের এক জায়গায় লিখেছেন “আমাদের দীর্ঘ সম্পর্ককালে, অতিসন্তর্পণে, কতযে কিছু শিখিয়েছে আমাকে। ‘শিখিয়েছে’ বলা ঠিক হলো না, বলা উচিত ‘শেখাতে চেয়েছে’।” শঙ্খ ঘোষ যা শিখেছেন এই সম্পর্ক যাপন করতে গিয়ে তারই খানিকটা যদি এই বইয়ের পাঠ থেকে পাঠক কুড়িয়ে নিতে পারে তবে সে পাঠ পাঠকের মননশীলতাকে নিবিড় পরিচর্যা দিতে পারে ।

আবেগের ক্ষেত্রে শঙ্খ ঘোষের নির্জন স্বর, পরিমিত প্রকাশের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছেন প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য । শঙ্খ ঘোষকে লেখা প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের চিঠি মাঝে মাঝে ধাঁধায় ফেলে দিতে পারে পাঠককে। মনে হতেই পারে এমন মুগ্ধতা, এতটা উষ্ণতা, আবেগের এমন প্রাচুর্য্য কেবল নারী পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেই সম্ভব। কিছু কিছু চিঠির নীচে দরকারী তথ্যের পাশাপাশি বন্ধুর আবেগের রাশ টেনে ধরতে শঙ্খ ঘোষ জুড়ে দিয়েছেন ব্যাক্তিগত মন্তব্য। প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যের চিঠির উত্তরে শঙ্খ ঘোষ কি লিখতেন সে কথা জানার সম্ভাবনা খুব ক্ষীন। বইটা পড়তে গিয়ে শঙ্খ ঘোষের সেই সব প্রতি উত্তরগুলোর অভাববোধ করেছি। পাঠক হিসেবে এই আক্ষেপ জমা থাক এই লেখায়।

বন্ধুত্বের দীর্ঘযাত্রাপথে ওঁরা নির্মাণ করেছেন সৃষ্টিশীল ভুবন, সে ভুবন আজকের পাঠকের জন্যে খুলে দিচ্ছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। শেষবার শঙ্খ ঘোষের জন্মদিনে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন জার্মান কবি ব্রেখটের কবিতার অনুবাদ। এই কবিতার শেষ লাইনে নতুন শুরু করবার যে আহবান তা শঙ্খ ঘোষকে প্রাণিত করেছে , আর যারা শঙ্খ ঘোষের বদান্যতায় এই বইয়ের সূত্রে সে অনুবাদ কবিতা পাঠের সুযোগ পেলেন সেইসব পাঠকের সমস্ত ক্ষয় হওয়া মুহুর্তে এই কবিতা হয়ে উঠুক উজ্জীবনের স্মারক।

সব কিছু বদলায়

সব কিছু বদলায়। তোমার শেষ নিশ্বাস দিয়ে

তুমি নতুন করে শুরু করতে পার ।

কিন্তু যা ঘটে গেছে তা ঘটে গেছে । যে জল

তুমি একবার মদে ঢেলে ফেলেছ তা তো

আর বের করে দেওয়া যায় না ।

যা ঘটে গেছে তা ঘটে গেছে । যেজল

তুমি একবার মদে ঢেলে ফেলেছ তা তো

আর বের করে দেওয়া যায় না, কিন্তু

সব কিছু বদলায়। তোমার শেষ নিশ্বাস দিয়ে

তুমি নতুন করে শুরু করতে পার ।