নৃশংস, অমানবিক হৃদয়বিদারক

ভালোবাসা থেকে বিয়ে, প্রতারণা

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ২ জুলাই, ২০২২ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

পাশবিক এক ঘটনার নিদারুণ উদাহরণ হতে পারে আলোচ্য ঘটনাটি। বরিশালের মেয়েটি প্রেমিক স্বামী ও পাঁচ মাস বয়সী শিশু সন্তানসহ ঢাকায় থাকতেন। স্বামী সেখানে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। কিন্তু আড়ালে স্বামী তার নিজের মাসহ করতেন দেহ ব্যবসা। মেয়েটিকেও বাধ্য করতেন দেহ বিকিয়ে দিতে। বিয়ের আগে কখনোই বুঝতে পারেনি, তার ভালোবাসার মানুষটি এত জঘন্য! কিন্তু কিছুই করার নেই। মা নেই তার, বাবা অসুস্থ। ভাই একজন যাও আছে, সে বৌ নিয়ে আলাদা সংসার পেতেছে। বাদ্য হয়ে তাই স্বামী ও শাশুড়ির কথা মতো কাজ করতে থাকে। তাতেও যে শেষ রক্ষা হয়নি! দুই/তিন মাস আগে স্বামী অন্য একটি মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যান। একে তো মেয়েটি ঢাকায় কিছু চিনেন না। পরিচিত কেউ নেই তার। তারপরও কয়েকদিন অপেক্ষা করেছিলেন স্বামী ফিরে আসবে-এই আশায়। কিন্তু না, স্বামী ফিরেনি। মেয়েটি নিরুপায় হয়ে শিশুকে নিয়ে ফিরে যায় তার বাবার বাড়ি বরিশালের মুলাদী থানা এলাকায়।

মেয়েটি জানান, স্বামীর খালাতো ভাই পরিচয় দিয়ে ইব্রাহীম নামে এক যুবক তার সাথে দেখা করতে আসে কয়েকদিন আগে তার বাড়িতে। জানায়, তার স্বামী কামালই ইব্রাহীমকে পাঠিয়েছে মেয়েটিকে নিয়ে যেতে। এতদিন মনমরা হয়ে থাকা মেয়েটির মন চনমন করে উঠে এ কথা শুনে। ইব্রাহীম লাউড স্পিকারে ফোনে কামালের সাথে কথাও বলে। কামালের কণ্ঠ চিনতে পারে। কামাল তাকে বলে ইব্রাহীমের সাথে চট্টগ্রামে চলে আসতে, এখানে তার অপেক্ষায় আছে কামাল। ইব্রাহীমের সাথে যেতে সংশয় প্রকাশ করেনি মেয়েটি।

গত ২৩ জুন রাতে ‘সুন্দরবন’ নামে লঞ্চে চেপে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ইব্রাহীমের সাথে যাত্রা করেন। লঞ্চ ছাড়ার পর ইব্রাহীম তাকে একটা কেবিনে নিয়ে গিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করে। মেয়েটি বলেন, বাধা দেয়ার অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি, অসহায় হয়ে গেছি, যখন আমার সন্তানকে হত্যার হুমকি দেয় ইব্রাহীম। পরে ইব্রাহীমের আরও দুই বন্ধুও যোগ দেয় তার সাথে। রাতভর ৩ জন মিলে ৭ দফা ধর্ষণ করে। ভোরে সদরঘাট নেমে তিনি আর হাঁটতে পারছিলেন না। তিনি হয়ে পড়েন তাদের হাতের পুতুল।

চট্টগ্রামে মেয়েটিকে একটি বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেই বাসায় একজন নারী ও একজন পুরুষ ছিল। বাসায় একজন নারীকে দেখতে পেয়ে কিছুটা হলেও সাহস পান তিনি। কিন্তু কে জানত, সেই নারীও একই চক্রের একজন সদস্য হবেন! উল্টো সেই বাসায় অষ্টমবারের মতো তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে কাপড় ভিজে যায় রক্তে। তিনি বলেন, রক্তাক্ত আমায় দেখে তারা একটু ভয় পেয়ে যায়। দ্রুত আমাকে একটি প্রাইভেটকারে তুলে কিছুদূর গিয়ে রাস্তার এক পাশে ফেলে তারা দ্রুত চলে যায়। আমার তখন দাঁড়ানোর শক্তি ছিল না। এক রিকশাওয়ালা আমায় দেখতে পেয়ে থানায় নিয়ে যায়। ওই থানার ওসি স্যারের কারণে আমি এখনো বেঁচে আছি। তিনি আমার অবস্থা দেখে দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সেখানে চিকিৎসার পুরো খরচ তিনিই দেন। এখনো তিনি খবরাখরর নিচ্ছেন। রিকশাওয়ালা মেয়েটিকে যে থানায় নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই থানাটি ছিল আকবরশাহ থানা।

আকবর শাহ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওয়ালী উদ্দিন আকবর আজাদীকে বলেন, বাচ্চাসহ সে যখন থানায় আসে তখন তার অবস্থা দেখে আমরা চমকে উঠি। রিকশাওয়ালার কাছে কিছুটা শুনি। তবে মেয়েটির কাছ থেকে ঘটনা শোনার চেয়ে তাকে আগে হাসপাতালে পাঠানো জরুরি বলে মনে করেছি। আমাদের দুজন নারী কনস্টেবলকে তার সাথে রেখেছি। চমেক হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে তার চিকিৎসা চলছে। পরে তার কাছে পুরো ঘটনা শুনে আমরা সংশ্লিষ্ট থানার সাথে যোগাযোগ করি। ঘটনা যেহেতু লঞ্চে হয়েছে, সে কারণে ঘটনাস্থল বিবেচনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলাটা দায়ের করা হয়েছে। এটি তদন্ত করবে সদরঘাট নৌ পুলিশ।

তিনি বলেন, এই ঘটনায় তার কাছ থেকে যে বর্ণনা পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতে ইব্রাহীমসহ তিনজনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। যতদূর জানি তার বাবার সাথে নৌ পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তার যোগাযোগ হয়েছে। মেয়েটির মা নেই। বাবা অসুস্থ। বড় ভাই পৃথক হয়ে গেছে বিয়ের পরপরই। সবকিছু মিলে এটি নৃশংস, অমানবিক, হৃদয় বিদারক একটি ঘটনা। সামাজিক ও পারিবারিক দূষণের জ্বলজ্যান্ত একটি উদাহরণ এটি।