নীতি বাক্যের পুঁথি, নারীর অগ্রগতি এবং আত্মসচেতনতা

সাদিয়া মেহজাবিন | শনিবার , ২৬ নভেম্বর, ২০২২ at ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ

‘বোরাত’ নামক একটি ইংরেজি মুভি দেখছিলাম। সিনেমা নিয়ে খুব বেশি সমালোচনা বা আলোচনা করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে এ-দুর্দিনে কেন সিনেমা নিয়ে আলাপ তা পরে বলবো। আগে সিনেমার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিই, ‘বোরাত’ নামক একজন ব্যক্তি। তিনি এত দিন জেলে ছিলেন, পরবর্তীতে তাকে জেল থেকে বের করে একটি মিশনে পাঠানো হয়। ‘বোরাত’ খুব ক্ষুদ্র এক জেলা থেকে এসেছে। নাম কাজাখ। সেখানে তারা প্রযুক্তির খুব বাইরে, পুরুষেরা কেবল কাজ করেন, নারীদের পশুপাখির সাথে তুলনা করা হয়, কম বয়সে বিয়ে দেওয়া হয়, মেয়ে শিশু জন্মের পর তাদেরকে একটা সত্য গল্পের বই ধরিয়ে দেওয়া হয় । কালক্রমে মিশন পূরণ করতে এবং দেশের জন্যে সুফল বয়ে আনতে ‘বোরাত’ ইউএসএ’র প্রধানমন্ত্রীকে তার একমাত্র মেয়ে যার বয়স ১৫ তাকে উপহার হিসেবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। মেয়েকে সে পশুপাখির মত হাতে পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখে। তাকে নানানভাবে সেখায় কীভাবে প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে তাকে তার রূপ- সাজ- ব্যবহার পরিবর্তন করতে হবে। মেয়েও তার বাবার সকল কথাকেই সত্য ভেবে মেনে চলে। মেয়েও খুশী সাজ রূপ নিয়ে কেননা ছোটবেলা থেকে সিন্ড্রেলা দেখে বড় হয়েছে। সে সেখানে দেখে মানিয়া নামের মেয়েটি খাঁচায় বন্দী থাকে এবং একজন রাজপুত্র তাকে বাঁচাতে আসে। তাই এসব বিষয়ে অনেক আগ্রহী। ‘বোরাত’ প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করতে তার মেয়ের স্তনকে আরো আকর্ষণীয় বানাতে ব্রেস্ট সিলিকন ইমপ্লান্ট সেন্টারে তাকে নিয়ে যায়। অনেক বেশি টাকার প্রয়োজন যা তাদের কাছে ছিল না। তাই ‘বোরাত’ ভাবলো সে কোনো এক চাকরি করবে এবং মেয়েকে কারো বাসায় রাখবে। ‘বোরাতে’র মেয়ে টুটুয়া যে মহিলার বাসায় ছিল সেখানে সে দেখে মহিলারা গাড়ি চালাতে পারে, তারা সাংবাদিক হতে পারে অর্থাৎ পুরুষদের মতো মহিলারাও এখানে সকল কাজ করছে। টুটুয়া এসব দেখে ভয় পেয়ে যায় এবং মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করে এসব সম্ভব কিনা। তখন মহিলা তাকে বোঝায় হ্যাঁ নারীরাও সব করতে পারে। টুটুয়াকে রাতে গল্প শুনাতে গিয়ে খেয়াল করেছে সে কেবল তার বাবার দেওয়া সত্য গল্পের বইটি পড়বে। যেখানে লেখা থাকে কোনো নারীর শারীরিক চাহিদা থাকতে পারে না, যোনীতে হাত দিলে মৃত্যু হবে, নারীরা একলা চলতে পারে না, পুরুষদের সমতুল্য ভাবা পাপ। এইরকম হাজার ভুলেভরা ছিল সেই সত্য গল্পের বইটি। এসব দেখে টুটুয়াকে মহিলাটি বোঝায় তার বাবা তাকে মিথ্যা বলছে। এখন নারীরা সব পারে। নারীদেরও সমান অধিকার আছে। এবং টুটুয়া যদি তার ব্রেস্ট ইমপ্লান্ট করতে না চায় তাহলে এ-কম বয়সে তার সার্জারির ভেতর দিয়ে যাওয়া উচিত নয়। এবং সে যেমন আছে সেভাবেই সুন্দর। টুটুয়া সব শুনে তার বাবাকে ছেড়ে চলে যায়। এভাবে অনেকদিন পর তার বাবা তার ভুল বুঝতে পারে এবং পরে তাদের গ্রামটি একটি নারীবাদী গ্রামে পরিণত হয়।

এ-সিনেমা দেখার পর সর্বপ্রথম যে ভাবনাটি মাথায় আসে, আসলেই তো সিনেমার সাথে আমাদের সমাজের সত্য কত মিল। ধরুন প্রগতির চর্চায় এখন নারীরাও সমান অধিকারের কথা বলছে কিন্তু তা কতখানি সত্য কিংবা মিথ্যা এ সিনেমা থেকে? আমাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় না কোনো বই কিন্তু অদৃশ্য একটি পুঁথির নীতিবাক্য এখনো প্রচলন আছে সমাজে। নারী কি করতে পারবে কিংবা পারবে না অথবা কি কি করা দরকার সব আমাদেরকে শিখিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই নীতি বাক্যগুলো তৈরি করছে কারা? মূলত সমাজের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা যারা কেবল নিজেদের সুবিধা বোঝে, তারাই এসবের কারিগর। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই নীতিবাক্যগুলো যে ভুল তা পুরুষেরাও জানে কিন্তু সুবিধার লোভে তারাও এ-রীতি মেনে । নীতি বাক্যগুলো ভুল এটা বুঝে যারা এর প্রতিবাদ করছে তারা মূলত নারীবাদী গালি খাচ্ছে এবং প্রগতির চর্চা করা মুখোশধারী পুরুষেরা হাসি তামাশা করছে। সবকিছুর পর সিনেমাতে খেয়াল করে দেখলাম টুটুয়ার ভুল ভাবনা সুধরাতে কিন্তু এগিয়ে আসছে নারীরাই। নারীবাদী নারীরাই টুটুয়াকে বুঝিয়ে দিচ্ছে সত্য তা না যা তোমাকে দেখানো হচ্ছে। বাস্তবজীবনে খেয়াল করে দেখলে বোঝা যায় আসলেই তো অজানাতে অনেক ভুল শেখানো হচ্ছে আমাদের। কিন্তু মজার একট বিষয় কি জানেন? অনেক পুরুষরাও নারীবাদী কিন্তু খুব কম পুরুষ সাম্যবাদী কেননা যখনই মনে হচ্ছে ক্ষমতা আর ধরে রাখা যাচ্ছে না তখন তারা তাদের মুখোশের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এসে হিপোক্রেসি দেখাচ্ছে এবং নারীর উপর ক্ষমতার চর্চা করতে চাচ্ছে। আদতে কি তবে নিজে বাঁচলে বাপের নাম বলে এবার নিজেদের অধিকার নিয়ে লড়াই এবং অধিকার বুঝে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। কমবয়সী নারী যাদের টার্গেট তাদেরকে চিহ্নিত করা এবং সর্বস্তরে নারীদের সুরক্ষার জন্যে তৃণমূলেও নারীবাদ পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। কখন রাজপুত্র এসে বাঁচাবে সে আশা না করে নিজেদের মুক্তির পথ নিজেদেরই বের করতে হবে।