কিছু কিছু মর্মান্তিক ঘটনা ঘটার পর পত্রপত্রিকায় নারী নির্যাতন নিয়ে লেখালেখির ছড়াছড়ি পড়ে যায়। সামপ্রতিক সময়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় বাপের বাড়ি থেকে নাশতা কম পাঠানোর কারণে সিফাতুন নামে এক নারী শাশুড়ি রিজিয়া বেগমের নির্যাতনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এই নির্যাতনে রাশেদা বেগম এবং সুমি আক্তার নামে আরও দুজন নারী সহযোগিতা করেন বলে সিফাতুনের পরিবারের সূত্রে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
নারী নির্যাতনে নারীর সম্পৃক্ততা একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। অনেক সময় শাশুড়ি, ননদ বা পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্য নির্যাতনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন কিংবা নির্যাতনকারীকে উসকে দেন। পুত্রবধূকে মানসিক ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করার পেছনে যৌতুক আদায় কিংবা পুত্রসন্তান না হওয়ার মতো বিষয়ও কারণ হিসেবে কাজ করে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বড় হতে গিয়ে অনেক নারী অবচেতনভাবেই পুরুষতান্ত্রিক ধ্যানধারণা ধারণ করেন। ফলে তাঁরা পুত্রবধূ বা অন্য নারীদের ওপর শোষণের পক্ষে অবস্থান নেন কিংবা তাঁদের ওপর বিভিন্ন নিয়মকানুন চাপিয়ে দেন।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্যাতনকারীরা ঘরের মানুষ। বলাবাহুল্য, পারিবারিকভাবে নারী নির্যাতনের পেছনে অনেক সময় অন্য এক বা একাধিক নারীর সম্পৃক্ততা থাকে। তাই আমরা প্রায়ই দেখতে পাই, শাশুড়ি বা ননদের নির্যাতনে গৃহবধূ নিহত হয়েছেন কিংবা আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন। যদিও সহিংসতার প্রধান অপরাধীদের মধ্যে পুরুষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, তবু বিভিন্ন পরিস্থিতিতে নারীরাও কোনো না কোনোভাবে নারী নির্যাতনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ নারী নিজ ঘরে নির্যাতিত হন এমন একটি পরিসংখ্যান প্রায়ই আলোচনায় আসে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য সদস্যদের, এমনকি ঘরের নারীদের মনোভাব ও আচরণও কোনো কোনো ক্ষেত্রে দায়ী হতে পারে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে আমরা নারী নির্যাতনকে পারিবারিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখে আসছি।
এ প্রসঙ্গে আমাদের নারীদের মানসিকতা নিয়ে একটি ছোট্ট গল্প মনে পড়ছে। এক শাশুড়ি গল্প করছেন, ‘আমার ছেলেটা খুব খারাপ, বউয়ের কথা শোনে। আর আমার মেয়ের জামাই অসম্ভব ভালো, আমার মেয়ের কথার বাইরে যায় না।’ অন্যদিকে, ঘরের বউয়ের মানসিকতা এমন ‘আমার মা অসুস্থ, আমি বাপের বাড়ি যাচ্ছি।’ অথচ শাশুড়ি অসুস্থ হলে সে বলে, তোমার মাকে তুমি দেখো, আমি একা সব সামলাতে পারছি না।
এমন দ্বৈত মানসিকতা নিয়েই আমাদের সমাজের কিছু নারী বেড়ে উঠেছেন। যে পরিবারে নারী নির্যাতন হয়, সেখানে অন্য নারীরাও অবস্থান করেন। তাঁদের নিষ্ক্রিয়তা কিংবা প্ররোচনার কারণে নির্যাতনের শিকার নারীটি আরও অসহায় হয়ে পড়েন। পরিবারে একসময় যে নারী নিজেই নির্যাতিত হয়েছেন, বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়ার পর তিনি কখনো কখনো ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের ওপর ঘটে যাওয়া নিপীড়নের প্রতিশোধ নেন কিংবা সেই নির্যাতনের ধারাবাহিকতা অন্য নারীর ওপর প্রয়োগ করেন।
কখনো কখনো এই দ্বিচারিতার কারণে নারী হয়ে ওঠেন নারীর শত্রু। এ ধরনের মানসিকতার কারণে নারীরাই যখন অন্য নারীর ওপর নির্যাতন চালান, তখন নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে পারে। অনেক সময় পুরুষেরাও নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে পরিবারের অন্য নারীদের দ্বারা প্রভাবিত হন। কিন্তু পরিবারের কোনো নারী যদি সেই নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তাহলে পুরুষের পক্ষে নির্যাতন চালিয়ে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বামীর পাশাপাশি শাশুড়ি বা ননদের হাতেও বাংলাদেশের অনেক নারী নির্যাতিত হন। আবার কখনো কখনো কোনো নারী নানা কারণে আত্মহননের পথ বেছে নেন। সে ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা যথাযথভাবে তদন্ত না করেই পরিবারের কোনো নিরপরাধ নারীর ওপর দায় চাপানো হলে তা তাঁকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে।
অনেকের ধারণা, এ ধরনের ঘটনা শুধু গ্রামেই ঘটে। কিন্তু করুণ সত্য হলো, শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল নারীদেরও কখনো কখনো শেখানো হয় যে পুরুষের নির্যাতনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ শিক্ষা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী থাকলেই যে একজন নারী সামাজিক ও পারিবারিক নির্যাতন থেকে মুক্ত থাকবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।
নারীরা অর্থনৈতিকভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল থাকায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও অবস্থান হারানোর ভয়ে অনেক সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন না। একজন নারী নির্যাতনকারীর অপরাধের পেছনে পরিবারেরও দায় থাকতে পারে। সমাজে নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয়, যৌতুকপ্রথার বিস্তার এবং আর্থিক লাভের আকাঙ্ক্ষা নারী নির্যাতন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করে।
তাই নারী নির্যাতন বন্ধ করতে এবং একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে হলে পিছিয়ে পড়া সমাজকে উন্নত মানসিকতার দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। পারিবারিক অসুস্থ শিক্ষা ও বৈষম্যমূলক মূল্যবোধ পরিহার করে বাস্তবসম্মত, মানবিক ও সুন্দর চিন্তাভাবনার সমাজ গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে অনেক সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীই অন্য নারীকে বলেন, “স্বামীর ওপরে কথা বলা যাবে না। তাই স্বামীর নির্যাতন একটু–আধটু সহ্য করতে হবে।” এমন রীতি আমাদের সমাজে যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এটি পরোক্ষভাবে পুরুষকে নারী নির্যাতনে উৎসাহিত করতে পারে। ধর্মীয় বিশ্বাসের ভুল ব্যাখ্যা কিংবা সামাজিক রীতিনীতির দোহাই দিয়ে নির্যাতনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
নারী নির্যাতনে নারীর সম্পৃক্ততা থাকলেও সামগ্রিক সহিংসতা ও অপরাধের কাঠামো এবং বহু ঘটনার পেছনে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক সম্মান রক্ষা কিংবা সামাজিক চাপের কারণে নারীরা অন্য নারীর ওপর হওয়া নির্যাতনের প্রতিবাদ না করে নীরব থাকেন অথবা অপরাধ আড়াল করতে সহায়তা করেন। এই নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা নির্যাতনকারীদের আরও সাহসী করে তুলতে পারে।
একটি শিশু যখন বেড়ে ওঠে, তখন মা ও পরিবার থেকেই সর্বপ্রথম শিক্ষা গ্রহণ করে। এ প্রসঙ্গে নেপোলিয়নের একটি উক্তি কমবেশি আমাদের সবারই জানা। নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।” এখানে শিক্ষিত মা বলতে শুধু সনদধারী শিক্ষিত নারীকে বোঝানো হয়নি; বরং উন্নত মানসিকতা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মায়ের কথাই বলা হয়েছে। মানুষ স্বশিক্ষিত হয় মূলত অভিজ্ঞতা অর্জন ও বাস্তবতা অনুধাবনের মাধ্যমে। একজন মায়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না–ও থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যদি উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন ও স্বশিক্ষিত হন, তাহলে তাঁর সন্তানদের মধ্যেও অনুরূপ মূল্যবোধ গড়ে ওঠার আশা করা যায়।
পৃথিবীর সকল নারী হয়ে উঠুন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে মানব ঢাল। পারস্পরিক সহমর্মিতা, সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে বন্ধ হোক নারী নির্যাতন।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।











