নজরুল ইসলামের অসামপ্রদায়িকতা

প্রতিমা দাশ | বুধবার , ২৫ মে, ২০২২ at ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ

নজরুল এক ভাষণে বলেছিলেন কেউ বলেন, আমি বাণী যবন, কেউ বলে আমি কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়, এরপরেই সমপ্রদায়গত মিলনের চেষ্টার কথা তুলে ভাষা নিয়ে খানিক সরস খেলা করেছেন, আমি মাত্র হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করার চেষ্টা করেছি। গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সামপ্রদায়িক বিভেদ কাজী নজরুল ইসলামকে সবসময় ব্যথিত করেছে। তাই তিনি বৈষম্যহীন অসামপ্রদায়িক মানব সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা সব সময় জোর দিয়েছেন। তিনি সচেতনভাবে হিন্দু-মুসলিম দের মধ্যে সমপ্রদায় নিরপেক্ষ সমপ্রীতি প্রত্যাশা করেছেন।

সত্য সুন্দর মানবকল্যাণের পূজারী নজরুল চেয়েছেন সকল সমপ্রদায়ের ঊর্ধ্বে মানুষের মুক্তি। তাঁর সাম্যবাদী কবিতায় বলেছেন, মানুষের মানুষের সব ধর্মীয় এবং জাতিগত ব্যবধান ঘুচে গেছে যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ মুসলিম জৈন, খৃষ্টান, পারস্য ইহুদি সাঁওতাল ভিল, গারো? কারণ, মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই এবং মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান! ভিখারি, চাষী, চণ্ডাল, রাখাল মানুষ হিসেবেই সবার অভিন্ন পরিচয় এসব বিচিত্র পরিচয়ের আড়ালে কবি তাঁর কবিতায় মানবপ্রেম শ্রেণি নির্বিশেষে সামাজিক সাম্যের কথা বলে গেছেন। নজরুলের আহবান হিন্দু মুসলমান সকলে মিলে মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বলুক আমার মানুষ ধর্ম। নজরুল ইসলাম সবসময় বিশ্বাস করতেন মানুষ হিসেবে স্বীকৃতির চেয়ে পরিচিত হয়ে ওঠা সব চেয়ে সম্মানের।

তাই কবি বলেছেন মানুষের মাঝে স্বর্গ নরক মানুষেতে সুরাসুর। নজরুল জোর দেন অন্তর ধর্মের ওপর। তিনি সব সময় চেয়েছেন হিন্দু মুসলমানের ঐক্য। যৌবনের প্রতি আবেদন আমার ধর্ম যেন অন্য ধর্মকে আঘাত না করে অন্যের মর্মবেদনার সৃষ্টি না করে। একই দেশে ফুলে ফসলে পুষ্টু দুই সমপ্রদায়ের বিরোধ অত্যন্ত নিন্দনীয়। অথচ রাজনৈতিক সামপ্রদায়িক নেতারা নিজও নিজও সমপ্রদায় কে ধর্মের নামে উগ্র মদ পান করিয়ে অযথা মাতাল করে তুলে বিরোধ সৃষ্টি করেছেন। আর শিক্ষাবঞ্চিত সাধারণ মানুষকে করে তুলেছেন নিজেদের হাতের পুতুল। তিনি মুসলিম তরুণদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছেন তরুণেরা যেন ‘কদর্য’ হানাহানির ঊর্ধ্বে থাকে। স্মরণ করিয়ে বলেছেন ‘ইসলাম ধর্ম কোনো অন্য ধর্মাবলম্বীকে আঘাত করিতে আদেশ দেন নাই। ইসলামের মূলনীতি সহনশীলতা।

পরমত সহনশীলতার অভাবে অশিক্ষিত প্রচারকদের প্রভাবে আমাদের ধর্ম বিকৃতির চরম সীমায় গিয়ে পৌঁছিয়াছে। তিনি যুব সমাজের উদ্দেশ্যে আরো বলেছেন মানুষকে মানুষের সম্মান দিতে না পারেন তবে আপনি বৃথাই মুসলিম। কাজী নজরুল ইসলাম আজন্ম অসামপ্রদায়িক চেতনাকে লালন করেছেন, তিনি সবসময় সাম্যের গান গেয়ে মানব সমাজকে এক করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও যখন আমরা মানুষে মানুষে হানাহানি বিদ্বেষ ধর্মের নামে সামপ্রদায়িকতা দেখি তখন মনে হয় যে আমাদের ঘরে ঘরে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ভাণ্ডার এবং সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞ নিয়ে আরো বেশি চর্চা করা উচিত। তবেই মানুষ মানবিক হবে, মানুষ মানবতা শিখবে।