সারাদেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৯ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এসময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন ডেঙ্গুরোগী। চলতি বছর ডেঙ্গুতে একদিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তির রেকর্ড বলে পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ১৩০ জনের মৃত্যু হলো। এর মধ্যে শুধু আগস্ট মাসেই মারা গেছেন ৪৩ জন। এছাড়া সেপ্টেম্বরে গত ৭ দিনে ৩৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
গতকাল আজাদীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামে বেড়েই চলেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। চলতি সেপ্টেম্বরে এই এক সপ্তাহে রোগী ছাড়িয়েছে পাঁচশত জনেরও বেশি। অথচ গত আগস্টের পুরো মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ১ হাজার ২০২ জন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবার সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রকোপ কমাতে হবে।
এদিকে, ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাংলাদেশ সচিবালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন।
সভায় প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেন। বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, ময়লা–আবর্জনা পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়ার বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করার কথাও বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশও দেন।
তিনি বলেন, তাদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে। সভায় উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসুবিধা ও রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। তবে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তার রোধে নগরের ঝুঁকিপূর্ণ ১৯ ওয়ার্ডে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ মশক নিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। এ কর্মসূচি চলবে ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের স্বাক্ষরিত এ আদেশে জানানো হয়, ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়ার প্রকোপ কমাতে এবং মশার প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে এ ক্র্যাশ প্রোগ্রামের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গুর উপসর্গ মৃদু থাকে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে রোগের শুরুতেই সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে– উচ্চমাত্রার জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, মাংসপেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং শরীরে লালচে র্যাশ। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, অনবরত বমি, দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, অতিরিক্ত তৃষ্ণা, তীব্র দুর্বলতা কিংবা ত্বক ঠান্ডা ও ফ্যাকাশে হয়ে গেলে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এডিস মশা জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। তাই বাড়ির আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকলে তা দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে। জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানান তাঁরা। তাঁরা বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। কিন্তু বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও জনপদে জমে থাকা পানি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা, ছাদ ও নালা–নর্দমায় মশার বংশবিস্তার অব্যাহত রয়েছে। মশক নিধন কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত ও সমন্বিত নয়। কোথাও ওষুধ ছিটানো হলেও উৎস ধ্বংসের উদ্যোগ দুর্বল। ফলে একদিকে মশা নিধনে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে সংক্রমণও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চলবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। প্রতিটি এলাকায় নিয়মিত মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসের ব্যবস্থা করতে হবে।







