দেশ হতে দেশান্তরে

পিকিং ভাবনা, প্লুটো ভাবনা

সেলিম সোলায়মান

রবিবার , ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ

এখানকার বসার সিটগুলো সব খালি দেখেই সম্ভবত সবাই মেঝেতে ব্যাগ রাখার বদলে, নিজের পাশের সিটেই ব্যাগ রেখেছে। তারপরও ব্যাপারটা ভাল লাগলো না, তাই এই, তোমরা ব্যাগগুলো সিটের উপরে রেখেছো কেন ? অন্য মানুষদেরও তো বসার জায়গা দরকার। কাঁধ থেকে নিজের ব্যাগে মেঝেতে নামিয়ে রেখে, নিজে একটা চেয়ার দখল করতে করতে এ কথা বলতেই, সামনের আসন থেকে ছুটে এলো ক্ষেপণাস্ত্র -“এখন তো এখানে মানুষই নাই কোন আর। আসুক আগে মানুষ, তখন না হয় তাদের জন্য জায়গা করে দেবো, ব্যাগ গুলো মেঝেতে নামিয়ে রেখে” বলে উঠলো লাজু ! নির্ভুল নিশানার সেই ক্ষেপণাস্ত্রের বিপরীতেএই মুহূর্তে আমার হাতে কোন এন্টিমিসাইল গান থাকায় , অবশ্য তা থাকলেও যে তা ব্যবহার করা সঠিক হতো না, সে কথা মেনে তাই নজর ফেললাম ডানদিকের কাঁচের দেয়াল ভেদ করে রানওয়ের দিকে , যেখানে অলসভাবে দাঁড়িয়ে আছে নানা আকারের বেশ কটা উড়োজাহাজ ।
মেঘলা আকাশের নীচে সটান শুয়ে থাকা বিশাল রানওয়েতে ছোট্ট ছোট্ট লরি,গাড়ি যাচ্ছে এদিক সেদিক, অলস ভাবে দাঁড়িয়ে ঝিমুতে থাকা উড়োজাহাজগুলোর দিকে। হাঁটাহাঁটি করছে কিছু এয়ারপোর্ট কর্মী রানওয়ের নানা জায়গায় । এক ঝলকে ওসব দেখেই চোখ তুললাম আকাশে। নাহ, আকাশ আছে এখনো আগের মতই মুখ ভার করে। গুমোট আকাশ চোখে পড়তেই, এরকম আবহাওয়ায় পরিবার নিয়ে বিমান ভ্রমণের সুপ্ত ভয়টি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই, মায়ের পাশের সিটে চুপচাপ বসে থাকা; বিমান ও এয়ারলাইন্স বিষয়ে আমার বিশেষজ্ঞ পুত্র অভ্রকে ডাকলাম আমার পাশে এসে বসতে।
সেই যে মনে এসেছিল যে যতো কম জানে কোন বিষয়ে, তার ভাবনা ততো কম। ওর এইরকম নিশ্চুপ বসে থাকায় ভাবলাম এরকম মেঘলা আবহাওয়ায়, আকাশ ভ্রমণের ব্যাপারে আমার মনে মাঝে মধ্যেই যে ভয়টা মাথাচাড়া দিচ্ছে, উঁকিঝুঁকি মারছে, সেটা নিশ্চয় ওকে এক্কেবারে ঝাপটে ধরে রেখেছে। যদিও জানি না মনে যদি ওর ভয় থেকেই থাকে; তবে কাটাবো তা কেমন করে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের লিফটে আটকা পড়ে যে ভয়টা পেয়েছিল ও, তাতে তো ও ঘোষণা দিয়েছিল যে, এই চায়নায় আর সে লিফটে উঠছে না। সে সময়, আমরা সবাই সাথে আছি, অতএব তোমার ভয় কি, এসব বলে সেই সংকল্প থেকে তাকে টলানো গেছে। তার উপর ঐ বিড়ম্বনাটির জন্য হোটেল কর্তৃপক্ষের তিন তিনবার চমক দেখানো আক্কেল সেলামী দেওয়ার ফলে, সেটা তো এখন আমাদের জন্য মজার এক অভিজ্ঞতাতেই পরিণত হয়েছে। ফলে সেই ভয়ের সাথে এই ভয়কে মেলানো ঠিক হবে না। তার উপর মনে হলো এরকম আবহাওয়ায় বিমানে ভ্রমণের ভয় যদি থেকেই থাকে অভ্রর, তবে সেটা তাড়াবো কিভাবে? এ ক্ষেত্রে “আমরা সবাই আছি তোমার সাথে” এ রকম আশ্বাসবাণী তো এক্কেবারে ফাঁকা বুলির মতো হাস্যকর শোনাবে।
বুঝলাম এ মুহূর্তে এ সমস্যাটির কোন যৌক্তিক সমাধান নাই আমার হাতে,তারপরও ভাবলাম, ডেকে ওকে জড়িয়ে ধরেটরে একটু চাঙ্গা করি, আর সাথে এটা বলি যে ঝুকি পূর্ণ আবহাওয়া হলে, এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ ফ্লাইট দেরিতে ছাড়বে; কিম্বা প্রয়োজনে বাতিল করে দেবে, তাও জেনেশুনে ন্যূনতম ঝুঁকি নিয়ে প্লেন উড়াবে না তারা।
আমার ডাকে সাড়া দিয়ে ততক্ষণে অভ্র পাশে এসে বসতেই, জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলাম কি ভাবছিলে বাবা?
“চলো না বাবা, ঐ শপটা একটু দেখে আসি। না আমি আর ভাইয়া কিছু কিনবো না , শুধু দেখবো। আর আমার জন্য না, ভাইয়া শুধু একটা বিটস হেডফোনে দেখবে” -বুঝলাম যে, নিরাপত্তা তল্লাশি শেষে এদিকটায় আসার পথে দু ভাই যে সম্ভাব্য ইলেক্ট্রনিঙ শপ টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে , অভ্র এখন সেটার কথাই বলছে। আর এও বুঝলাম যে খোলাখুলি ঘোষণা না দিলেও, দু ভাই মিলে তাদের নিজেদের শপিং লিস্টে, ঐ যে বিটস না কি যেন নামের হেড ফোনের কথা বললো, ওটা ঢুকিয়ে নিয়েছে। এটা একটা মজার ব্যাপার দুই ভাইয়ের মধ্যে। এমনি তে দু’জন মুহূর্তে মুহূর্তে ঝগড়াঝাটি যতই করুক নিজেদের মধ্যে, সবসময়ই লক্ষ্য করেছি কোন দামি খেলনা বা কিছু কেনার প্রস্তাব আকারে আমার কাছে পেশ করার আগে , নিজেরা একজোট হয়ে নেয় দুজনে। আর এ ব্যাপারে দীপ্রই বেশীর ভাগ সময় উদ্যোগ নেয় দু জনের সমঝোতার । অবশ্য আরো ছোট বেলা থেকেই, মানে যখন কম দাম বেশী দাম এ ব্যাপারে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে দীপ্রর , তখন থেকেই যখনই ওর পছন্দের কোন খেলনাকে ওর মা, বেশী দাম বলে ঘোষণা দিতো, তখনই “সে বলতো এটা আমার পছন্দ না” বা “আমার এটা লাগবে না“। অন্যদিকে অভ্রর এসব নিয়ে কখনোই তেমন মাথা ব্যথা নেই । কোণ জিনিষ পছন্দ হলেই সোজা সে সেটা দাবী করে বসতো। তাই কোন সময় দীপ্রর নিজের কাছেই যে জিনিষটির দাম বেশী মনে হওয়ার পরও , ঐটিকে তার পাওয়ার তীব্র ইচ্ছে হয়, তখন সে সুন্দর অভ্রকে তার দলে টেনে নেয়, ওকে দিয়েই প্রস্তাবটা পেশও করায় । যেমন করেছে আজ সকালে। তা যতই করুক এই রকম চালাকি ওরা, সহজেই ওটা বুঝে গিয়ে, মনে মনে হাসি প্রতিবারই। ভাবি ছোট বেলা থেকেই ওরা এটা রপ্ত করলো কিভাবে?
এ নিয়ে মাঝে মাঝেই চিন্তা করে নিজে নিজে বুঝতে চেষ্টা করেছি যে, আচ্ছা গোটা প্রাণিজগতের মধ্যে শুধু কি মানুষেরই এই রকম কৌশলগত পরিকল্পনা, মানে ইংরেজিতে যাকে বলে ট্যাক্টিক্যাল প্লানিং , তা করার ক্ষমতা আছে? নাকি সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে এমন অন্য প্রাণির মধ্যেও তা আছে? অল্পবিস্তর যত টুকু জানি, সম্ভবত এই রকম ঘটনা সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করা প্রাণিদের মধ্যে, এমন কি মানুষ বাদে সবচেয়ে উচ্চবুদ্ধিমত্তার প্রাণি শিম্পাঞ্জি , ওরাং ওটাং ওদের মধ্যেও নেই। আর মানুষেরই মধ্যে যদি তা থেকেই থাকে, তবে তা এলো কোত্থেকে? এটা কি সে পরে শিখেছে নাকি এটা ছিল তার শুরু থেকেই যখন সে বসবাস করতো গুহায়? কিন্তু এরকম পরিকল্পনা করতে হলে , যা দরকার কোন প্রাণির তা হলো সম্ভবত ভাষার উপর ভাল দক্ষতা সাথে সেটি অন্যের কাছে কার্যকর প্রকাশ করতে পারে ক্ষমতা । অন্যদিকে মগজে থাকা দরকার প্রচুর তথ্যের ভাণ্ডার। উন্নত মগজে এ দুটোই সম্ভব । কিন্তু মানব ইতিহাসের প্রত্যুষে, গুহাবাসী মানুষের ভাষা তৈরির ক্ষমতা কতোটুকু ছিল, সেটাই তো জানি না। আর তথ্য ভাণ্ডারই বা কতটুকু ছিল , যখন সে ঘোরাফেরা করতো দু তিন বা চার বর্গমাইল এলাকার মধ্যে। নাহ এ ব্যাপারে আরো খোঁজ খবর নিতে হবে , পড়তে হবে , তারপর তা নিয়ে চিন্তা করা যাবে। আপাতত মনোযোগ দিই অভ্রর দিকে। আদ্র করতে করতে ওকে তাই বললাম এখনো ঐ দোকান খুলেছে বলে মনে হয় না, বাবা ; আরেকটু পর যাবো ঐদিকে ।
“আচ্ছা বাবা, বেইজিঙে এ ও কি আমরা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলেই থাকবো “? এইমাত্র পেশ করা দাবির প্রতি আমার সমর্থনের নিশ্চয়তা পেয়ে জিজ্ঞাসা করলো আশ্বস্ত অভ্র-নাহ বাবা, বেইজিং এ আমরা রিজেন্ট হোটেলে থাকবো, বলেই সামনে মেঝেতে রাখা পিঠব্যাগটা কোলে নিয়ে, ওটার চেইন খুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কারণ অভ্রের প্রশ্নে মনে পড়লো যে, বেইজিং এয়ারপোর্ট থেকে, হোটেলে যাবার ব্যাপারটা তো সুরাহা করিনি এখনো। মানে জানি না, যাবো কিভাবে। যতটুকু মনে পড়ে, সায়মা মানে অফিসের কাজে আমাকে যে সহকর্মীটি সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে, সেই সায়মা এই ভ্রমণেরও যাবতীয় কাগজপ্‌ত্র থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজ গুলো করে, সবকিছু একান্ত নিষ্ঠার সাথে গুছিয়ে দিয়েছে একটা ফাইলে। ওর দেয়া, সেই ফাইলটা বের করে দেখে এখনি নিশ্চিত হয়ে নেয়া দরকার ব্যাপারটা । সারাক্ষণ মনে খচ খচ চিন্তা নিয়ে ঘুরতে ভাল লাগে না আমার।
“বাবা রিজেন্ট হোটেলটাও কি, ইন্টারকন্টিনেন্টালের মতো ফাইভ স্টার হোটেল”? কি কারণেই যেন ফাইভ স্টার হোটেল নিয়ে অভ্রর একটা আলাদা মোহ আছে , জিজ্ঞাসা করলো সে তাই।
হ্যাঁ বাবা, তাই। জবাব দিয়ে ভাবলাম বলি, কোন কিছু নিয়েই কারো অতিরিক্ত মোহগ্রস্থ থাকা উচিৎ নয়। আর হোটেল নিয়ে তো নয়ই। হোটেল তো হলো রাত কাটানোর জায়গা। ওটা নিয়ে মোহ থাকা বা ওটা নিয়ে অকারনে ভাব দেখানো উচিৎ নয়।এ জীবনে কারো সময়, পরিস্থিতি তো সব সময় এক থাকবে এমনতো নয়। অতএব পুত্রদের যেকোন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেয়ার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। ভাবলাম বলি তা এখন অভ্রকে।
সে মুহূর্তে আমারই মনের দ্বিতীয়জন বলে উঠলো যে, এ বক্তৃতাটা দেওয়ার এটা উপযুক্ত সময় নয়। শুধু শুধু এই বক্তৃতা দিয়ে অভ্র কাছে নিজেকে বিরক্তিকর করে তোলার দরকার নেই। কারণ হোটেল নিয়ে ওর এই উৎসাহের কারণেই তো, আমি নিজেই আক্রা দামের এই হোটেলটা বুকিং করেছিলাম, লাজুর প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও । যুক্তি দিয়েছিলাম , বছরে তো আমি বহুবারই দাপ্তরিক প্রয়োজনে এ জাতীয় হোটেলে থাকি, তা থেকে ওর যখন সাধ হয়েছে , থাকি না হয় পরিবার নিয়েও দু চার পাঁচদিন নিজের পয়সায় সবাইকে নিয়ে। যখন পারবো না তখন থাকবো না। কষ্ট করে টাকা জমিয়ে রেখে কি লাভ? যদিও ঐ যুক্তি লাজুর কাছে কোন যুক্তিই মনে হয় নি; অবশ্য স্ত্রীর কাছে স্বামীর কোন যুক্তি যে যুক্তি তা যেহেতু জানি না; তাই অনেকটা গোঁয়ার্তুমি করেই এরকম পরিস্থিতিতে যেরকম পুত্রদের বা অন্য কারো ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে ফেলি । এবারও করেছি তাই। অতএব এখন তাকে এটা নিয়ে কথা বলা যুতসই হবে না। সে যাক, ততক্ষণে ব্যাগ হাতড়ে বের করে ফেলেছি, সায়মার সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়া ফাইলটা। ওটার পাতা উল্টে বেইজিং অংশ খুঁজে বের করতে ব্যস্ত যখন, তখন অভ্র জিজ্ঞেস করলো-“বাবা বেইজিং এর রিজেন্ট হোটেলের কাছে কোন পেট শপ আছে কি?
এই এক অক্ষমতা আমার! কোন কাজ করার জন্য যখন মনোনিবেশ করি, ঐ মুহূর্তে ভিন্ন কিছু জিজ্ঞেস করে মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটালে খুবই বিরক্ত লাগে। অভ্রর প্রশ্নেও সেটিই ঘটলো। অতএব বিরক্ত হয়ে ওকে থামতে বলতে যাবো যখন, তখনই ওর উচ্চারিত “পেট শপ” শব্দদ্বয় মনে করিয়ে দিলে যে, অভ্রর আসলে ঢাকায় ফেলে আসা প্লুটোর কথা মনে পড়েছে। প্লুটো মানে সেই যে কুকুরের বাচ্চাটার কথা বলেছিলাম সেটা; যেটিকে হেলেন রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে দীপ্র অভ্র কে দিয়েছিল, পোষার জন্য; এ ব্যাপারে লাজুর চরম অনীহা থাকা সত্ত্বেও, আর ফ্লাটের অন্যান্য বাসিন্দাদের সম্ভাব্য আপত্তি সত্ত্বেও। এই ভ্রমনের আগে,অভ্রর দেয়া প্লুটো নামের সেই কুকুরের বাচ্চাটিকে রেখে আসতে হয়েছে আমাদের ফ্ল্যাটের কেয়ার টেকারের জিম্মায়।
বুঝলাম, মায়ের পাশে চুপচাপ বসে থাকা অভ্রর মনে, নিশ্চিত প্লুটোই তার স্বভাবসুলভ লাফঝাপ মারছিল কিছুক্ষণ আগে, যেমন সে করে আর কি ,স্কুল ফেরত তার মতোই খুদে দুই মনিবের সাথে দেখা হলেই। এই যখন মনের অবস্থা অভ্রর, সেক্ষত্রে কাজের ব্যাঘাত ঘটানোর কারনে ওর সাথে বিরক্তি প্রকাশ করাটা চরম নির্দয় একটা ব্যাপার হবে। অতএব, ফাইলের পাতা ওলটানো বাদ দিয়ে, গভীর মমতায় জিজ্ঞেস করলাম-কেন বাবা? প্লুটোর জন্য কিছু কিনতে হবে নাকি? প্রশ্নটা করলাম, কারন আমি নিশ্চিত এ ব্যাপারে শতভাগ। যেদিন থেকে এই প্লুটো আমাদের ঘরে এসে জায়গা করে নিয়েছে সে থেকে যে কবারই বাইরে গেছি প্রতিবারই অভ্র, নিজের চাহিদার সাথে লিস্টিতে যোগ করেছে প্লুটোর জন্য নানান জিনিষপত্র । লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

x