দেশের সার্বিক উন্নয়নে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি জরুরি

| শুক্রবার , ২১ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ

দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ খাতে অর্থায়ন বাড়িয়ে দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিল বাস্তবায়নে বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক ও পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) মধ্যে চুক্তি সই হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ এবং পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের। এর আগে গত ২৩ মে দেশের কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে পিকেএসএফের মাধ্যমে বিশেষায়িত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার এ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তহবিল ব্যবহারে দেশব্যাপী কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে পিকেএসএফ। কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা সম্ভাবনাময় ব্যবসাগুচ্ছ ও মাইক্রোএন্টারপ্রাইজে বাড়ানো হবে অর্থায়ন। পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে ব্যবসা সমপ্রসারণ ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। পিকেএসএফ জানিয়েছে, কর্মসূচিটি তিনটি প্রধান উপাদানের সমন্বয়ে বাস্তবায়িত হবে। এগুলো হলোআর্থিক পরিষেবা প্রদান, ব্যবসাগুচ্ছভিত্তিক ভ্যালু চেইন উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন। এর মাধ্যমে শুধু ঋণ বিতরণ নয়, উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সক্ষমতাও বাড়ানো হবে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, তহবিলটি আবর্তক তহবিল হিসেবে পরিচালিত হবে। ফলে একবার অর্থায়ন করা অর্থ পুনরায় ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে নতুন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায় অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে। এতে তৃণমূল পর্যায়ে অর্থের প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ খাতে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামীর বাংলাদেশে বেকারত্ব সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। এরই মধ্যে বেকারত্বের প্রভাব প্রকট হয়ে উঠতে শুরু করেছে দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের অভাবে ছোটুবড় সব শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালা ও মোটরবাইক রাইডারদের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে। ঢাকাসহ অন্যান্য মহানগরের বস্তিগুলোয় বাড়ছে মানুষের চাপ। বেঁচে থাকার তাগিদে বা একটু বেশি আয়ের আশায় মানুষ গ্রাম থেকে ছুটে এসেছে নগরে। এর মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা রাজধানী ঢাকার। জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্ট ২০২৫ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার পর ঢাকা এখন ৩ দশমিক ৬৬ কোটি জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল মহানগরে পরিণত হয়েছে। ধারণক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত জনবসতির কারণে ঢাকার পরিবেশ বহু আগেই বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। সে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমাহীন যানজট। প্রতিদিন বিনষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২২এর একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে কর্মজীবীদের ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ বা ছয় কোটি মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে আশানুরূপ প্রবৃদ্ধি না হওয়ায় কর্মক্ষম মানুষ বাধ্য হয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডে শ্রম দিচ্ছেন। শ্রমের বিনিময়ে তারা কেউ ধনী হয়েছেন এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই, কেবল টিকে থাকার লড়াইয়ে তারা নিমগ্ন। শহরাঞ্চলের অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মজীবীদের একটি বিশাল অংশ বস্তিতে অমানবিক জীবনযাপন করেন। আরেকটি অংশ ফুটপাত, রেলস্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড বা মার্কেটের বারান্দায় ভ্রাম্যমাণ জীবনযাপন করেন। তিনবেলা খাবার জোগানোই তাদের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। নগরমুখী অভিবাসীর এ বিশাল জনগোষ্ঠী পরিবেশ দূষণ, যানজট, পানি ও বিদ্যুতের ওপর চাপসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। অর্থনীতিকে বিকেন্দ্রীকরণ না করে ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের কুফল নগরবাসীকে এখন ভোগ করতে হচ্ছে। এদিকে পরিকল্পনার অভাব, দারিদ্র্য, অদক্ষতা, পশ্চাদপদ শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে দেশের বেকার সমস্যা বাড়ছে। বেকারত্ব সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করেছে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি সমীক্ষা থেকে জানা যায় ২০২৪ সালে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় নয় লাখ। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে উচ্চশিক্ষিত বেকাররাই সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, যেকোনো দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হিসেবে ধরা হয় ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, নতুন কর্মসংস্থান বেড়েছে তার তুলনায় একেবারেই সামান্য। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম হয়ে উঠলেও তাদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়নি। এমনকি বিভিন্ন খাতের সবচেয়ে উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান বা ফ্রন্টিয়ার ফার্মগুলোও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং অর্থনৈতিকরাজনৈতিক নানা দুর্বিপাকে চাকরি হারিয়েছেন অনেকে। এতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ও নতুন কর্মসংস্থানের গড় প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে কর্মহীনতা বৃদ্ধির গড় হার। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সার্বিক উন্নয়নে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি নতুন কর্মপরিবেশের উপযোগী শ্রমশক্তি তৈরিও জরুরি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে