দূরের দুরবিনে

অজয় দাশগুপ্ত

শুক্রবার , ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ

ওডারল্যান্ড : একজন বীরপ্রতীকের অসামান্য কীর্তিগাথা
এখন চলছে বিজয়ের মাস। এ মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি। গর্ব করি। কিন্তু ইতিহাস বিষয়ে পালনীয় কর্তব্য করি? আজ আমি এমন একজন মানুষের কথা লিখবো যিনি মারা যেতে পারেন জেনেও বাঙালির জন্য ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বাঙালির জন্য ঝুঁকি নেয়ার কেউ তিনি ছিলেন না। না বাঙালি না বাংলাদেশি না ভারতীয় বা পাকিস্তানি। ডাচ মানে হল্যাল্ডের মানুষ। পরে আমাদের মতো অভিবাসী হয়েছিলেন অষ্ট্রেলিয়ায়। বাটার বড় পদবীর রাশভারী কর্মকর্তা। আর ইনি ই হয়ে উঠেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যে দেশে বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন আহমেদ থেকে খালেদ মোশারফের কথা মানুষকে ভুলিয়ে রাখা হতো সে সমাজে তাঁকে মনে করবে কে? আর যারা যখন সরকারে তারা মুখে যাই বলুক সবসময় নিজেদের হাইলাইট করতে ব্যস্ত। ফলে এসব মানুষকে আমরা জানি না। জানলেও চিনি না। আর চিনলেও মনে রাখি না। অথচ এঁরাই আমাদের সেইসব মানুষ যাদের কারণে আজ কেউ মন্ত্রী কেউ আমলা কেউ রাজনীতিবিদ। তাঁর কথা জানার পরপর ই আমি উত্তাল হয়ে পড়েছিলাম তাঁর সান্নিধ্য আর দেখা পাবার জন্য।
পার্থে তখন তিনি শেষ দিনগুলো পার করছিলেন। ভীষণ ইচ্ছে ছিলো তাঁর সাথে দেখা করার। কিন্তু তখন আমি নতুন অভিবাসী। মাত্র এসেছি এই দেশে। নিজেরা থিতু হবার সংগ্রাম করছি। সে সময় সম্ভব ছিলো না অতটা পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া। কিন্তু আমি প্রায়ই ফোন করতাম। নাম্বার যোগাড় হবার পর আমার অবিরাম চেষ্টার ফসলে তাঁর স্ত্রী একবার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বারণ ছিলো উত্তেজিত হবার। শেষ জীবনে বিশ্রাম আর শান্তিতে থাকা ভদ্রলোক বাংলাদেশের কথা শুনেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। কারণ আছে তাঁর। তখন বাংলাদেশ শাসন করছিলো বাংলাদেশের জন্মবিরোধী রাজাকার ও জগাখিুচুড়ি দল বিএনপির জোট। তাদের কাজ কর্মে কোন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার খুশী হবার কারণ ছিলো না। বিশেষত একজন বিদেশি যিনি আমাদের জন্য তাঁর ক্যারিয়ার পরিবার ও জীবন বাজী রেখেছিলেন। জানা যায় পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর উল্লাসরত তাঁর এক কর্মচারীকেও বরখাস্ত করেছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু সৈয়দ নজরুল ও তাজ উদ্দীনের মৃত্যু তিনি সহজভাবে নিতে পারেন নি। ফোনে তাঁর রাগ অভিমান আর ক্রোধ শুনেছি। তলায় জমে থাকা বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুরাগ ছিলো স্পষ্ট।
আর পাঁচজন বিদেশির মতোই অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ডব্লিউ এ এস ওডারল্যান্ড চাকরি করতে এসেছিলেন এ দেশে। এ দেশ তখন পাকিস্তানের পূর্বাংশ। ১৯৭১ সাল। পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয়। স্বাধিকারের দাবিতে দৃঢ়সংকল্প বাঙালির আন্দোলনে উত্তাল সমগ্র দেশ।
ওডারল্যান্ড ওই বছরের শুরুতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়ে যোগ দিয়েছেন বাটা শু কোম্পানিতে। টঙ্গীতে তাঁর কার্যালয়। দেশের পরিস্থিতি আঁচ করতে মোটেই অসুবিধা হয়নি তাঁর। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ মার্চ বাঙালিদের গণহত্যা ওডারল্যান্ডকে অত্যন্ত বিচলিত করে তোলে। জঘন্য গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিকাণ্ড, নারী নির্যাতন ওডারল্যান্ডের মনে এক পুরোনো ক্ষতকেই যেন নতুন করে জাগিয়ে তোলে। রক্তের ভেতর আবার সেই পুরোনো ডাক অনুভব করেন তিনি যুদ্ধে যাওয়ার। বহুজাতিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কর্তা ৫৪ বছর বয়সী ওডারল্যান্ড আবার ঝাঁপিয়ে পড়েন যোদ্ধার ভূমিকায়।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানে অবাধে চলাচলের সুযোগ ছিল তাঁর। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে হত্যা-নির্যাতনের ছবি তুলে সেসব ছবি গোপনে বিদেশের গণমাধ্যমে পাঠাতে থাকেন। সেই সঙ্গে চেষ্টা করেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যোগাযোগ সৃষ্টির। একটা পর্যায়ে তিনি গভর্নর লে. জে. টিক্কা খান ও পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লে. জে. নিয়াজি, রাও ফরমান আলীসহ পাকিস্তানি সেনাদের মাথা-মুরব্বিদের সঙ্গে দহরম-মহরম করে তথ্য সংগ্রহের কাজটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই করছিলেন তিনি, যেমন করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান সেনাশিবিরে গিয়ে। অস্ট্রেলিয়া ওডারল্যান্ডের পিতৃভূমি হলেও ১৯১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর তাঁর জন্ম হল্যান্ডের রাজধানী আমস্টারডামে। জীবিকার তাগিদে ১৭ বছর বয়সে তিনি একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন, পরে সেখান থেকে বাটা শু কোম্পানিতে। জার্মানির নাৎসি বাহিনী হল্যান্ড আক্রমণ করলে তিনি ডাচ সেনাবাহিনীতে সার্জেন্ট হিসেবে যোগ দেন। নাৎসিরা ১৯৪০ সালে বিমান হামলায় হল্যান্ডের রটারডাম শহর বিধ্বস্ত করে দেয়, হল্যান্ড চলে যায় তাদের দখলে। ওডারল্যান্ড বন্দী হন জার্মানদের হাতে। তবে কৌশলে তিনি বন্দিশিবির থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধফেরত সৈনিকদের ক্যাম্পে কাজ করতে থাকেন। যোগ দেন ডাচ-প্রতিরোধ আন্দোলনে। ডাচদের বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জার্মান ভাষা রপ্ত ছিল তাঁর। এই সুযোগ নিয়ে তিনি জার্মানদের গোপন আস্তানায় ঢুকে পড়েন। তথ্য সংগ্রহ করে পাঠাতে থাকেন মিত্রবাহিনীর কাছে। ১৯৪৩ সালে তিনি কমান্ডো বাহিনীতে যোগ দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কমান্ডো সৈনিক ওডারল্যান্ড এই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগিয়েছেন ঢাকায় নানাভাবে। প্রথম পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ করলেও শুধু এতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি তিনি।
এমন একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আমাদের সাথে। যিনি নিজের পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে নিয়াজীর সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। আর সে সুযোগে হোটেল ইন্টারকনটিনেন্টাল থেকে সব খবর পৌঁছে যেতো মুক্তিবাহিনীর কাছে। পদে পদে বিপদকে মাথায় রেখে এই মানুষটি লড়াই করেছেন। বাংলাদেশে ঢাকায় তাঁর নামে একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর সম্ভবত একবার গিয়েছিলেন । কিন্তু ইতিহাস বিকৃতি আর মুক্তিযুদ্ধের অপমান মানতে পারতেন না বলে আর যান নি। আমাদের সমাজে এখনো যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি এখনো যে তর্ক তার নিরসনে এদের জানা জরুরি। এত বছর পর আমরা কিন্তু আমাদের শিশু কিশোর ও তারুণ্যকে জানাতে পারি নি। ওডারল্যান্ড বাংলাদেশ কে কেমন ভালোবাসতেন তা তাঁর একমাত্র সন্তান এ্যনি হ্যামিলটনের কথাতেই জেনেছি। এ্যনি এসেছিল সিডনিতে বাংলা সংস্কৃতি সম্মলেনের আয়োজনে। পিতা তাকে বলতো বাংলাদেশ আমার মন। আমি বাংলাদেশকে ভালোবাসি। এই মানুষটি আমাদের পতাকা সঙ্গীত ও স্বাধীনতার এক মূর্ত প্রতীক। জর্জ হ্যারিসন রবিশংকর, আঁদ্রে মালরো এমন কিছু মানুষের পাশাপাশি ইনিও আমাদের মনে করিয়ে দেন আমরা একা না। আমাদের মা জননী দেশ কখনো একা ছিলো না।
প্রত্যেক বিজয়ী জাতির ইতিহাসে এমন কিছু বীর থাকেন যাঁরা সময়ের ধারক আর দূ:সময়ের ধ্রুবতারা। আমাদের দেশ ও জাতির জীবনে ইনি তেমনই একজন। আমি কামনা করি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আমলে তাঁর বীরত্বের কাহিনীর বহুল ্‌ প্রচার। শেখ হাসিনা যখনই এদেশে এসেছেন পার্থে গেলে তাঁর শ্রদ্ধা জানিয়ে আসতে ভুল করেন নি। তাঁর ধমনীতে মুক্তিযুদ্ধের রক্ত।ইনি ই আমাদের একমাত্র বিদেশি বীর প্রতীক।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

x