দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৫:০২ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

বেশ সময় নিয়ে আমরা ঘুরলাম। ঘুরলাম মিরাকল গার্ডেনের হেথায় হোথায়। ফুলের এই অনন্য জলসা আমাদের মুগ্ধ করলো। দুনিয়ার বহু জায়গায় মরুর বুকে বহু কিছু করা হয়েছে। কিন্তু মরুর বুকে এভাবে মরা গাছে ফুল ফোটানোর মতো আয়োজন চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। মিরাকল গার্ডেনের যাদুকরী সব কারবার জীবনে ভুলবো বলে মনে হচ্ছিল না। বিশাল বাগানের পরতে পরতেই শুধু মুগ্ধতা। বাগানের ভিতরে একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদটিও ফুল এবং গাছগাছালী দিয়ে এত নান্দনিকভাবে তৈরি করা হয়েছে যে মন ভরে যাচ্ছিল। মিরাকল গার্ডেনের নানা আয়োজনে বিভোর এই আমার ভিতরে বাইরে শুধু একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল, কী করে সম্ভব? কি করে সম্ভব? আসলেই, কী করে সম্ভব এই অসাধ্য সাধন!

নানা পথ মাড়ালাম। বহুক্ষণ ঘুরলাম। ফিরে আসার জন্য পথে নেমেও মুখে কোন কথা বের হচ্ছিল না। একটি ঘোরের ভিতর গাড়িতে বসে ছিলাম। দুবাই প্রবাসী জাহাজের ক্যাপ্টেন আমার বন্ধু মোস্তফা ভাই রাতের ডিনার করানোর জন্যও সন্ধ্যা নামার আগেই তোড়জোড় শুরু করলেন। উনাকে কোনভাবে থামানো হলো। অনুরোধ করা হলো যে, আপাতত আমাদের হোটেলে নামিয়ে দিন। রাতের ব্যবস্থা পরে দেখা যাবে। দুয়েক দিনের মধ্যে মোস্তফা ভাইর বাসায় গিয়ে রাতে খাবো এমন সুনিশ্চিত আশ্বাস দেয়ার পর উনি ছাড়লেন। আমাদের দুবাই নভোটেল হোটেলে নামিয়ে বিদায় নিলেন তিনি।

আমার দুরন্ত কৈশোরের বন্ধু লায়ন মীর্জা আকবর আলী চৌধুরী। একই এলাকায় আমাদের বাড়ি। তার নামের সাথে আমার নামের দারুণ মিল। তার ঘরনির সাথেও মিল রয়েছে আমার ঘরনির। তার কপালটিও চার আঙ্গুলের, আমারটিও। কিন্তু এই চার আঙ্গুলের কপালের পার্থক্য বিস্তর। সে চট্টগ্রামের লায়ন্স ক্লাবের অনেক বড় নেতা। আমি চুনোপুটি। সে শিল্পপতি, আমি কোনরকমে টিকে আছি! তবে আমার কলেজ জীবনের দোস্তটি কিন্তু আমাকে ভুলেনি। অনেক টাকাকড়ি, গাড়ি বাড়ির মালিক হলেও বন্ধু হিসেবে এক কথায় সে অসাধারণ।

আমার এই অসাধারণ বন্ধুটির সাথে চট্টগ্রামে লায়নিজমের সাথে জড়িত প্রায় সকলেরই রয়েছে অনেক ঘনিষ্ঠতা। হোটেলের লবিতে বসে আমরা রাতের বেলা কি করা যায় তা নিয়ে নানা আলোচনা করলাম। লায়ন জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী, লায়ন কামরুজ্জামান লিটন, লায়ন বিজয় শেখর দাশ, লায়ন কাঞ্চন মল্লিক, স্লোগান সম্পাদক লায়ন মোহাম্মদ জহির, লায়ন মুছা বাবলু, লায়ন প্রদীপ দেবসহ অনেকেই আমরা জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম। নভোটেল একটি চেইন হোটেল। পুরো পৃথিবীতে এই হোটেল রয়েছে। রয়েছে খ্যাতিও। তারকাখচিত হোটেল হিসেবে দুবাই নভোটেলে বহু দেশের বহু মানুষ। লবিতেও অনেক মানুষ। লবির পাশেই বেসমেন্টে হোটেলের ডিসকো। সেখানেও হয়তো নানা দেশের নানা মতের নানা মানুষের আনাগোনা। কেউ বন্ধু নিয়ে, কেউবা বান্ধবীকে বগলদাবা করে ঢুকে যাচ্ছিল ডিসকোতে। আমরা লবিতে বসে নানাজনের নানা কিছু দেখে সময় পার করছিলাম।

লায়ন মীর্জা আকবর আলী চৌধুরীর বন্ধুবান্ধবে গিজগিজ করছে দুবাই। অনেকেই তাকে নিয়ে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য ফোন করছিল। অনেকেই খাওয়ানোর জন্য। আকবর আমাদের কয়েকজনকে ঘুরতে যাবো কিনা জিজ্ঞেস করলো। আবারো দুবাইর রাস্তায় রাস্তায় আমাদের ঘুরে বেড়ানো শুরু হলো। রাতের একটি বড় অংশ কাটিয়ে আমরা যখন হোটেলে ফিরলাম তখনো ডিসকো থেকে হল্লা ভেসে আসছিল।

সকালে যখন ঘুম ভাঙলো তখন মরুর বুকে সূর্য বেশ রোদ ছড়াতে শুরু করেছে। সকালে তেমন কোন তাড়া না থাকায় রয়ে সয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। নাস্তা পর্ব সেরে আমাদের বাসে তোলা হলো। আবুধাবী দেখাতে নিয়ে যাওয়া হবে আমাদের। আমাদের ট্যুর অপারেটর অথেনটিক ট্যুরিজমের লায়ন আনোয়ারুল আজিম ভাইর ব্যস্ততা বেশ চোখে পড়ার মতো। বেচারা মোটাতাজা মানুষ। বেশি দৌড়ঝাঁপ করতে পারেন না। আবার নিজেদের প্রোগ্রাম। না ছুটেও উপায় থাকে না। তিনি আমাদেরকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কাউকে কাউকে রুম থেকে ডেকে আনিয়ে বাসে তুললেন। বিশাল বাস। ট্যুরিস্ট বাস। আমাদের বাস আবুধাবীর পথে যাত্রা করলো।

সংযুক্ত আরব আমীরাত পুরোটাই মরুভূমি। এই মরুর বুকে পেট্রোডলারের কারামতিতে এমন সব কাণ্ডকারখানা ঘটছে যা চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। মরুর বুকে গড়ে তোলা এক একটি শহর পৃথিবীকে তাক লাগানোর প্রতিযোগিতা করছে। দর্শনীয় স্থানের আধিক্যের জন্য সংযুক্ত আরব আমীরাতের নাম গীনেজ বুকে ঠাঁই পেয়েছে। দর্শনীয় স্থানের জন্য গিনেজ বুকে নাম! তাও আবার মরুভূমিতে! ভাবা যায়!!

সর্বোচ্চ ভবন, জাদুকরী বাগান, কিংবা সাগরের বুকে পাম্প টি আকৃতির বিশাল এক উপশহর মিলে হেথায় হোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। আর এসব দেখতে ইউরোপ আমেরিকার পর্যটকদের ঢল লেগে থাকে সংযুক্ত আরব আমীরাতের দেশে দেশে।

লায়ন আনোয়ারুল আজিম ভাই আমাদের সাথে বাসে উঠেছেন। তিনি আমাদেরকে আবুধাবীতে কোথায় কোথায় যাবো তার একটি বর্ণনা দিলেন। তিনি শুরতে আবুধাবীর শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদের নাম বললেন। মসজিদ? আমি যেন কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম! মসজিদে কেন যাবো? টুরিস্টদের মসজিদ দেখাবে? আমি মনে মনে হাসলাম। কি যে করে এরা? মসজিদে গিয়ে আমরা নামাজ কালাম পড়লেও লায়ন বিজয় শেখর দাশ, লায়ন কাঞ্চন মল্লিক বা লায়ন প্রদীপ দেব কি করবেন? লায়ন হিসেবে আমার অবস্থান বেশ পেছনের কাতারের। তাই চুপচাপ থাকলাম। বাসে সিনিয়র লায়নদের অনেকেই আছেন। যা বলার উনারা বলবেন। আমি পেছনে পেছনে হাঁটলেই হবে।

আমাদেরকে মসজিদের কাছেই বাস থেকে নামানো হলো। বিশাল এক মসজিদ। দূর থেকে দেখেই এক অনন্য স্থাপনার মতো লাগছিল। আমি তড়িঘড়ি করে নেটে প্রবেশ করলাম। ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে আমার চোখ কেবল কপালে উঠছিল। এত চমৎকার একটি মসজিদের ব্যাপারে অন্ধকারে থাকায় নিজেকে বেশ দুর্ভাগা মনে হতে লাগলো।

আবুধাবীর শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদের নামকরণ করা হয়েছে আরব আমীরাত এর প্রয়াত রাষ্ট্র প্রধান শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাইয়ানের নামানুসারে। মসজিদটি আরব আমিরাতের সবচেবড় মসজিদ। এটি দুনিয়ার অষ্টম বৃহত্তম মসজিদ। পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর এই মসজিদটি শুধু ধর্মীয় উপাসনালয়ই নয়, একই সাথে একটি জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পর্টও। আর তাই শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই নয়, নানা ধর্মের নানা মতের এমনকি নাস্তিকেরাও অনায়াসে এই মসজিদে ঢুকে নানা কিছু দেখে মুগ্ধতায় চোখ বড় করে।

সংযুক্ত আরব আমীরাতের মসজিদগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। মসজিদের পেছনে লাখ লাখ ডলার খরচ করেন এরা। মসজিদের অবকাঠামোর পাশাপাশি সাজসজ্জায়ও খরচ করা হয় মোটা অংকের টাকা। অধিকাংশ মসজিদে রাতের বেলায় আলোর মেলা বসে। অপরূপ হয়ে উঠে প্রায় প্রতিটি মসজিদ। আর এখনতো আমরা দাঁড়িয়ে আছি আবর আমীরাতের সবচেয়ে বড় এবং সুন্দর মসজিদে। আবুধাবী, আল আইন, দুবাই, শারজাহ, আজমান, ফুজিরা, রাস আল খাইমাসহ এদের প্রতিটি প্রদেশে হাজার হাজার দৃষ্টিনন্দন মসজিদ থাকলেও এটি সবচেয়ে সেরা। শেখ জায়েদ গ্রান্ড মসজিদের চারটি মিনার রয়েছে। মিনারগুলোর উচ্চতা ৩৫১ ফুট বা ১০৭ মিটার। ছোট বড় সাত আকারের ৮২টি গম্বুজ বিশিষ্ট শ্বেত মার্বেল পাথরে নির্মিত মসজিদটিতে ৬০৫৭০ বর্গ ফুটের পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কার্পেট রয়েছে। ইরানের একটি খ্যাতনামা কার্পেট কোম্পানি ইরানী শিল্পী আলী খালিদির ডিজাইনে বিশ্বের বৃহত্তম এই গালিচা নির্মানে সময় নিয়েছিল দুই বছর। এতে ইরানের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের অতি উন্নতমানের উল ব্যবহার করা হয়েছিল। দুনিয়ার সেরা এই কার্পেটের ওজন মাত্র ৩৫ টন!

স্বচ্ছ স্ফটিকের লক্ষ লক্ষ পাথরের তৈরি পৃথিবীর বৃহত্তম ঝাড়বাতিটি আনা হয়েছে জার্মানি থেকে। এটির ব্যাস ৩৩ ফুট এবং উচ্চতা ৪৯ ফুট। দুনিয়ার সর্ববৃহৎ ঝাড়বাতি থেকে লক্ষ লক্ষ তারা যেন দ্যুতি ছড়ায়। মসজিদটির আঙিনাজুড়ে থাকা প্রায় এক লাখ পঁচাত্তর হাজার বর্গফুটের মার্বেল মোজাইকও পৃথিবীর সর্ববৃহৎ চওড়া মার্বেল মোজাইক হিসেবে স্বীকৃত।

শত শত মানুষ মসজিদে প্রবেশ করছেন। বের হচ্ছেন। পশ্চিমা বিশ্বের অগুনতি মানুষ দেখলাম মসজিদে ঘুরছেন। মহিলাদের আনাগোনাও ছিল অনেক। গা গতর ঢেকে প্রবেশ করতে হচ্ছিল পশ্চিমা পর্যটকদের। মসজিদে প্রবেশের সময় মহিলাদের বোরকা পরার নিয়ম রয়েছে। গেটে এই বোরকা রয়েছে। খোলামেলা পোশাকের কোন পর্যটক মসজিদে প্রবেশ করতে চাইলে মাগনায় এই বোরকা দেয়া হয়। ফেরার সময় ফেরত দিতে হয়। মসজিদের গেটে ব্যাটারি চালিত গাড়ি রয়েছে পর্যটকদের জন্য। এই সার্ভিসও ফ্রিতে পাওয়া যায়। তবে ভিড় এত বেশি যে মাগনার এই গাড়িতে চড়ার সুযোগ পাওয়া বেশ কঠিন। আমরা হেঁটে হেঁটে মসজিদের ভিতরে বাইরে নানা কিছু দেখতে লাগলাম। ঘোরলাগা চোখে দেখছিলাম সবকিছু। শুধু অর্থই নয়, কী পরিমাণ কষ্ট এবং শ্রম যে এই ধরনের একটি মসজিদ গড়ে উঠে তা মনে মনে ভাবছিলাম।

নেটে ঘাটাঘুটি করে তথ্য পেলাম যে, বিশ্বের নানা দেশের খ্যাতনামা ৩৮ টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তিন হাজার দক্ষ কর্মী মসজিদটি নির্মাণ করেন। নিজেদের উৎপাদিত নানা পণ্যের পাশাপাশি ইতালি, জার্মানি, মরক্কো, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইরান, চীন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, গ্রিসসহ নানা দেশ থেকে মসজিদ নির্মাণের কাঁচামাল আমদানি করা হয়। মসজিদটি নির্মাাণে ভারতীয় উপমহাদেশের মোগল প্রভাবের পাশাপাশি পাকিস্তান ও মরক্কোর প্রভাবও স্পষ্ট। সরকারি কোষাগার থেকে নির্মিত এ মসজিদ নির্মাণে খরচ করা হয়েছিল ৫৪৫ মিলিয়ন ডলার বা বর্তমান হিসেবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা! দিনের বেলায় মসজিদটি ভাসে সাদা আলোতে। আর রাতের মায়াবি রূপ অপরূপ হয়ে ওঠে! (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

x