দুর্গোৎসবের রঙে চট্টগ্রামের পুরোনো পাড়া

অর্ক চৌধুরী | সোমবার , ১২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ

শরতের আকাশে সাদা মেঘ, বাতাসে উৎসবের আগমনী সুর। চট্টগ্রামের পুরোনো শহরের অলিগলিতে দুর্গাপূজার প্রস্তুতির সঙ্গে ফিরে আসে এক পরিচিত ব্যস্ততা। কোথাও প্রতিমার গায়ে শেষ রঙের প্রলেপ, কোথাও মণ্ডপ সাজানোর আয়োজন। দোকানে শাঁখা, সিঁদুর, ধূপ, প্রদীপ ও পূজার অন্যান্য সামগ্রীর কেনাকাটা। নগরের হাজারী লেন, টেরিবাজার, সদরঘাট কিংবা রহমতগঞ্জের মতো এলাকায় দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আচার নয়; পুরোনো বসতি, স্থানীয় ব্যবসা, কারুশিল্প ও মানুষের সামাজিক সম্পর্কের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।

চট্টগ্রামের হাজারী লেনেও দুর্গাপূজার রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য। সরু গলি, পুরোনো বসতি ও উৎসবকেন্দ্রিক আয়োজনের কারণে এই এলাকার সঙ্গে ঢাকার শাঁখারীবাজারের তুলনা করা হয়। কয়েক বছর আগে স্থানীয় পূজা কমিটির সভাপতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাজারী লেনের পূজা দেড় শ বছরের ঐতিহ্য অতিক্রম করেছে। তবে ঐতিহাসিক বয়সের বাইরেও এই এলাকার গুরুত্ব রয়েছে তার সামাজিক চরিত্রে। পূজার সময় এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, আলোকসজ্জা, মানুষের যাতায়াত ও মণ্ডপের আয়োজন মিলিয়ে পুরোনো শহরের একটি বিশেষ চেহারা তৈরি হয়।

হাজারী লেনের পূজার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বিষয়ভিত্তিক মণ্ডপসজ্জা। চট্টগ্রামে প্রায় দুই দশক আগে এ ধরনের আয়োজন জনপ্রিয় হতে শুরু করে। কখনো ইতিহাস, কখনো পুরাণ, আবার কখনো পরিবেশ ও প্রকৃতিকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে মণ্ডপ। একটি আয়োজনে পাটকাঠি, খড়, বাঁশ ও দড়ি ব্যবহার করে তুলে ধরা হয়েছিল গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও জীবন। অন্য সময়ে প্রাচীন পম্পেই নগরীর ধ্বংসের ইতিহাসও উঠে এসেছে মণ্ডপসজ্জায়। ফলে প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি শিল্প ও সৃজনশীল উপস্থাপনার একটি ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে দুর্গোৎসব। উৎসবের এই দৃশ্যমান জাঁকজমকের পেছনে রয়েছে অনেক মানুষের শ্রম। প্রতিমাশিল্পীদের কাজ শুরু হয় পূজার বহু আগে। বাঁশ ও খড়ের কাঠামোর ওপর মাটি বসানো, শুকানো, গড়ন তৈরি, রং করা, চোখ আঁকা এবং অলংকার পরানো–প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন বিশেষ দক্ষতা। মাটির প্রতিমা নির্মাণের এই ঐতিহ্য শুধু ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণ করে না; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা কারুশিল্পের ধারাও বহন করে।

চট্টগ্রামের সদরঘাট ও দেওয়ানজী পুকুরপাড়ের মতো এলাকায় প্রতিমা তৈরির শিল্পালয়ের পরিচিতি রয়েছে। পূজার আগে এসব জায়গায় প্রতিমা নির্মাণ ও সরবরাহের ব্যস্ততা বাড়ে। শিল্পীদের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন সহকারী, রংমিস্ত্রি, সাজসজ্জার কারিগর এবং পরিবহনের শ্রমিকেরা। ফলে একটি প্রতিমা মণ্ডপে পৌঁছানোর পেছনে কাজ করে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

প্রতিমার পাশাপাশি পূজাকে ঘিরে বাজারেও তৈরি হয় মৌসুমি চাহিদা। নতুন পোশাক, শাঁখা, সিঁদুর, আলতা, ধূপ, প্রদীপ, ফুল, ফল, মিষ্টি, অলংকার ও মণ্ডপসজ্জার নানা সামগ্রীর কেনাকাটা বাড়ে। কাপড়ের দোকান থেকে শুরু করে ফুল বিক্রেতা, মৃৎশিল্পী, আলোকসজ্জার কর্মী, পরিবহনশ্রমিক–বিভিন্ন পেশার মানুষ উৎসবের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হন। ধর্মীয় উৎসব এভাবেই স্থানীয় বাজার ও জীবিকায় প্রভাব ফেলে।

চট্টগ্রামের দুর্গোৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র জে এম সেন হল। শতবর্ষের পুরোনো এই ভবনটি শহরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মৃতিও বহন করে হল প্রাঙ্গণ। পরবর্তী সময়ে এটি বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দুর্গাপূজার সময় এখানে পূজা–অর্চনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা ও জনসমাগমের আয়োজন হয়ে থাকে। ফলে জে এম সেন হলের পূজা শহরের একটি পরিচিত সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

দুর্গাপূজার সামাজিক তাৎপর্য বোঝার জন্য এর আচারগুলোর দিকেও তাকানো প্রয়োজন। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা, ষষ্ঠীতে দেবীর বোধন, সপ্তমী ও অষ্টমীর পূজা, নবমীর আয়োজন এবং দশমীর বিসর্জন–প্রতিটি পর্বের আলাদা ধর্মীয় অর্থ রয়েছে। শাক্ত ঐতিহ্যে দুর্গা শক্তির প্রতীক; মহিষাসুরবধের আখ্যানের মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির বিজয়কে স্মরণ করা হয়। অন্যদিকে বাঙালি সমাজে দুর্গার আগমনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কন্যার পিতৃগৃহে ফেরার আবেগময় সাংস্কৃতিক কল্পনাও।

এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে আছে পারিবারিক পুনর্মিলন। পূজার ছুটিতে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া, নতুন পোশাক, মণ্ডপে ঘোরা, প্রসাদ বিতরণ, সংগীত ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান–সব মিলিয়ে উৎসবের পরিসর মন্দিরের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। বহু জায়গায় ভিন্ন ধর্মের মানুষও মণ্ডপের শিল্পসজ্জা দেখতে ও উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে আসেন। চট্টগ্রামের মতো বহু সমপ্রদায়ের দীর্ঘ সহাবস্থানের শহরে এই সামাজিক যোগাযোগের গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচ্য।

তবে উৎসবের ইতিহাস শুধু আলোকসজ্জা ও আনন্দের নয়। পুরোনো পাড়ার জনবিন্যাস বদলেছে, অনেক পরিবার স্থানান্তরিত হয়েছে, বদলেছে বাজার ও পেশার ধরন। আধুনিক সাজসজ্জা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের জায়গাও পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই পূজার আয়োজনের পাশাপাশি পুরোনো মণ্ডপ, প্রতিমাশিল্পীদের দক্ষতা এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। দুর্গোৎসবের সময় চট্টগ্রামের পুরোনো এলাকা/ পাড়াগুলো যেন নিজেদের ইতিহাসকে নতুন করে দৃশ্যমান করে। হাজারী লেনের গলি, সদরঘাটের প্রতিমাশিল্পীদের কর্মশালা, জে এম সেন হলের জনসমাগম কিংবা বাজারের মৌসুমি ব্যস্ততা–সবকিছু মিলিয়ে একটি শহরের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয় প্রকাশ পায়।

প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে কয়েক দিনের আনুষ্ঠানিক উৎসব শেষ হয়। কিন্তু যে শিল্প, শ্রম, স্মৃতি ও সামাজিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এই আয়োজন গড়ে ওঠে, তা থেকে যায় শহরের দৈনন্দিন জীবনে। চট্টগ্রামের দুর্গোৎসব তাই কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি পুরোনো নগরজীবনের ধারাবাহিকতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি জীবন্ত প্রকাশ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅদ্বৈত মল্লবর্মণ: বিষাদসিন্ধুর এক মালোপুত্র
পরবর্তী নিবন্ধওমানে সড়ক দুর্ঘটনায় বাঁশখালীর যুবক নিহত