দানোত্তম শুভ কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব। ‘চীবর’ হচ্ছে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পরিধেয় বস্ত্র, যা বৌদ্ধধর্মীয় সংস্কৃতিতে অত্যন্ত পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ। কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে মূলত পূজনীয় ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যে চীবর উৎসর্গ করা হয়।
মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধের সময়ে প্রথম দিকে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ শ্মশানে এবং বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত কাপড় কুড়িয়ে নিয়ে সেলাই করে (পাংশুকূল চীবর) পরিধান করতেন। কিন্তু সংগৃহীত এই জরাজীর্ণ, পুরোনো ও ময়লা কাপড়গুলো অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধযুক্ত হওয়ায় ভিক্ষুসংঘের সুস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ভগবান বুদ্ধ ভিক্ষুসংঘের জন্য গৃহীদের দেওয়া নতুন বস্ত্র বা ‘গৃহপতি চীবর’ পরিধান করার অনুমতি প্রদান করেন।
যেসব ভিক্ষু নির্দিষ্ট কোনো বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় কঠোর রীতিনীতি মেনে সফলভাবে ‘ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস’ সমাপ্ত করেন, কেবল তাঁরাই কঠিন চীবর গ্রহণের যোগ্য হন এবং সেই বিহারের ভিক্ষুসংঘের উদ্দেশ্যেই কঠিন চীবর উৎসর্গ করা হয়। বর্ষাবাস শেষে শুভ প্রবারণা পূর্ণিমা (আশ্বিনী পূর্ণিমা) উদ্যাপনের পরদিন থেকে শুরু করে পরবর্তী এক মাসের মধ্যে (কার্তিকী পূর্ণিমা পর্যন্ত) কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানের বিধান রয়েছে। যেদিন চীবর দান করা হবে, সেদিনের সূর্যোদয় থেকে পরবর্তী সূর্যোদয়ের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সুতা তৈরি, কাপড় বোনা, কাপড় কাটা, সেলাই, রং করা, ধোয়া ও শুকানো ইত্যাদি দুরূহ ও শ্রমসাধ্য কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এ ছাড়া বিশেষ কিছু কঠিন নিয়ম প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে এই দানকার্য সম্পাদন করা হয় বলে একে ‘কঠিন চীবর দান’ বলা হয়।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্জন্ম ও কর্মফলে বিশ্বাসী বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের জন্য কঠিন চীবর দানের গুরুত্ব অপরিসীম ও অতুলনীয়। পৃথিবীতে যত প্রকার দান আছে, তার মধ্যে কঠিন চীবর দানই সর্বশ্রেষ্ঠ বা সর্বোত্তম। সব ধরনের দানের সঞ্চিত পুণ্যরাশি এক করলেও একটি মাত্র কঠিন চীবর দানের পুণ্যরাশির ষোলো ভাগের এক ভাগও হয় না। এই দানের ফলে অর্জিত পুণ্যরাশি জন্মজন্মান্তরে প্রবাহিত হয়ে দুঃখমুক্তির পরম অবস্থা অর্থাৎ ‘নির্বাণ’ লাভের পথ সুগম করে এবং তার হেতু সৃষ্টি করে। তাই এই দানকে ‘দানোত্তম’ বা ‘দানশ্রেষ্ঠ’ কঠিন চীবর দান বলা হয়।
কঠিন চীবর দানের অসীম পুণ্যের কথা স্মরণে রেখে বৌদ্ধ সমপ্রদায় অত্যন্ত ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিবছর এই মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। দিনব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে মঙ্গলাচরণ, জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, বুদ্ধপূজা, পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ, অষ্টপরিষ্কারসহ সংঘদান, সূত্রপাঠ, পিণ্ডদান, চীবর ও কল্পতরু শোভাযাত্রা, ধর্মদেশনা, কঠিন চীবর ও কল্পতরু উৎসর্গ, ফানুস ওড়ানো, হাজার প্রদীপ প্রজ্বালন, বিশ্বশান্তি ও দেশের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা, বৌদ্ধধর্মীয় কীর্তন, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।












