তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বিকল্প হতে পারে জ্বালানী সাশ্রয়ী এক্সপ্যান্ডার এলপিজি

নিজস্ব প্রতিবেদক | বৃহস্পতিবার , ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ at ৬:৩৭ অপরাহ্ণ

ঢাকার রাস্তায় গাড়ির সারি আর ট্র্যাফিক জ্যাম দেখলে মনে হয়, দেশে গাড়ি বাণিজ্য বুঝি ফেঁপে ফুলে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, দেশের রাস্তায় চলা বেশিরভাগ গাড়িই এই মুহূর্তে রিকন্ডিশন্ড।

কারণটা মূলত দাম। আমদানি করা নতুন গাড়িতে শুল্কের বোঝা এতই বেশি ছিল যে, অনেকের কাছে নতুন গাড়ি স্বপ্নই থেকে যেত। ২০২১ সালের অটোমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসি’র কল্যাণে হাওয়া-বদল শুরু হয়। এই পলিসিতে ২৫০০ সিসি পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে সংযোজিত গাড়িতে কর ও শুল্ক ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ, যার বিপরীতে আমদানি করা ১৬০০ সিসির পূর্ণাঙ্গ গাড়িতে তা ১২৭ শতাংশ।

ফলে একে একে দেশেই গাড়ি তৈরি ও সংযোজনের কারখানা গড়ে উঠছে, যার অন্যতম বড় উদাহরণ মিতসুবিশি এক্সপান্ডার। গাজীপুরে র‍্যাংকন অটো ইন্ডাস্ট্রিজের উদ্যোগ দেশেই তৈরি হচ্ছে মিতসুবিশি এক্সপ্যান্ডার। কোম্পানির হিসাবে, শুল্কনীতির ওপর নির্ভর করে স্থানীয়ভাবে তৈরি এক্সপান্ডারের দাম আমদানি করা গাড়ির চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কম। এ বছরের এপ্রিলে র‍্যাংকন অটোর ২৫ শতাংশ শেয়ার কেনার ঘোষণা দিয়েছে জাপানের মিতসুবিশি কর্পোরেশন। দেশের গাড়ি শিল্পের জন্য এটি একটি ইতিবাচক বার্তা।

কিন্তু গাড়ি কেনার পরের খরচ সামলানোও আরেক চ্যালেঞ্জ। চলতি বছর জ্বালানির দাম বেড়েছে তিন দফায়। ১৮ এপ্রিল অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে হয় ১৪০ টাকা। জুনে আরও ৫ টাকা বেড়ে হয় ১৪৫ টাকা। সবশেষ, ২১ সেপ্টেম্বর থেকে আরও ২০ টাকা বেড়ে অকটেন এখন লিটারে ১৬৫ টাকা। জানুয়ারিতে এই দাম ছিল ১২২ টাকা, অর্থাৎ নয় মাসে বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই মানুষ বিকল্প নিয়ে চিন্তা শুরু করে। সামনে মূলত তিনটি বিকল্প; হাইব্রিড, সিএনজি এবং এলপিজি।

হাইব্রিড গাড়িতে জ্বালানি কম লাগে, এটা ঠিক। কিন্তু এতে ব্যাটারি, ইলেকট্রিক মোটর, ব্রেক বুস্টারের মতো বাড়তি যন্ত্রাংশ থাকে। এগুলোর যত্ন নিতে হয় নিয়মিত, তাই রক্ষণাবেক্ষণ খরচও তুলনামূলক বেশি পড়ে। অন্যদিকে, সিএনজি সস্তায় পাওয়া গেলেও বেশ কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী ঝামেলাও আছে।

এ বছর সিএনজি সরবরাহ নিয়ে ভোগান্তিও কোন অংশে কম নয়। বিগত ২ মাস ধরে রাজধানীতে তীব্র গ্যাস সংকট চলেছে। অনেক চালককে ছয় থেকে দশ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অল্প কয়েকটা ট্রিপের মতো গ্যাস নিয়ে ফিরতে হয়েছে। গাড়ির ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আছে। সিএনজি ইনস্টল করা হয় উচ্চ চাপে, তাই সিলিন্ডার ভারী ও বড় হয়, সাথে বুটস্পেসের বড় একটি অংশ এর দখলে থাকে। কিছু গবেষণা মোতাবকে, সিএনজি চালিত গাড়িতে পেট্রোলের তুলনায় ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত পারফর্ম্যান্স ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রযুক্তি সংস্থা এসএই’র একটি গবেষণা মতে, সিএনজি চালিত গাড়ির ইঞ্জিনের ভাল্ভ দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে, যদি ইঞ্জিন উক্ত গ্যাসের উপযোগী করে বানানো না হয়। গাড়ি মালিকদের অভিজ্ঞতাও তা প্রমাণ করে। কিছুদিন পর মাইলেজ কমে যাওয়া, ইঞ্জিনের আওয়াজ বদলে যায়, গাড়ির গতি কমে যাওয়া ইত্যাদি এখন পরিচিত কিছু সমস্যা।

সেক্ষেত্রে এলপিজি হতে পারে সেরা সমাধান। এলপিজি মানে লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস, যা মূলত প্রোপেন ও বিউটেনের মিশ্রণ। সিএনজি’র মতো উচ্চ চাপে এটি ইনস্টল করতে হয় না, তাই ট্যাংক তুলনামূলক হালকা ও আকারে স্বাভাবিক হয়। এছাড়া, দামের হিসাবটিও লক্ষ্য করার মতো। অক্টোবরের জন্য বিইআরসি অটোগ্যাসের দাম নির্ধারণ করেছে ভ্যাটসহ লিটারে ৮৪.৬২ টাকা, যা আগের মাসে ছিল ৭৩.০৯ টাকা। দাম বাড়লেও অকটেনের ১৬৫ টাকার প্রায় অর্ধেক।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এলপিজি কিট বসাচ্ছে কে বা কোথায়। গাড়ি কেনার পর বাইরের ওয়ার্কশপে এলপিজি লাগালে সাধারণত গাড়ির ওয়ারেন্টি ও ফ্রি সার্ভিস বাতিল হয়ে যায়। ইঞ্জিনের সঙ্গে মানানসই হওয়ার নিশ্চয়তাও থাকে না বললেই চলে। এরপর আবার মেকানিক কতটা দক্ষতার সাথে কাজ করবে সেসব নিয়েও চিন্তা থাকে। তবে সব সমস্যার সমাধান দিচ্ছে মিতসুবিশি এক্সপ্যান্ডার।

প্রথমত, মিতসুবিশি এক্সপ্যান্ডার এখন তৈরি হচ্ছে দেশেই। জাপানি বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের হাতে গাজীপুরের র‍্যাংকন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে এই সেভেন-সিটার ফ্যামিলি এসইউভি তৈরি হচ্ছে। সরাসরি কারখানাতেই এক্সপ্যান্ডার ইকো ভেরিয়েন্টে উন্নত মানের ইউরোপিয়ান এলপিজি কিট যুক্ত হচ্ছে, ফলে ইঞ্জিনের সঙ্গে ফিটিং ও নিরাপত্তা নিয়ে থাকে না বাড়তি কোন দুশ্চিন্তা। এতে আছে ১.৫ লিটার মাইভেক ইঞ্জিন, গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স ২২০ মি.মি, যা দেশের রাস্তাঘাটে বাড়তি স্বস্তি দেয়। ডিজাইনও এমন, যাতে তিন সারিতে সবাই আরামে বসতে পারেন।

ইকো ছাড়াও এক্সপান্ডারের আরও তিনটি ভেরিয়েন্ট আছে; ক্লাসিক, প্রিমিয়াম এবং স্পোর্টস। আর মজার ব্যাপার হলো, বাকি তিন ভেরিয়েন্টও চাইলে এলপিজিতে রূপান্তর করে নেওয়া যাবে (শর্ত প্রযোজ্য*)। সাদা, কালো, মেটালিক গ্রে ও গ্রিন ব্রোঞ্জ মেটালিকের পাশাপাশি এখন নার্দো গ্রে ও লুনার ব্লু রঙেও এই চারটি ভেরিয়েন্ট পাওয়া যাচ্ছে।

৪০ লিটারের এলপিজি ট্যাংক ও ৪৫ লিটারের অকটেন ট্যাংক থাকায় দূরের পথেও জ্বালানি ফুরানোর ভয় থাকে না। ডোনাট আকৃতির এলপিজি সিলিন্ডার চেসিসের নিচে বসানো থাকে, ফলে বুটস্পেসের পুরো জায়গাটাই কাজে লাগানো যায়। এছাড়া, বিক্রয়োত্তর সেবায় আছে এলপিজি কিটসহ ৫ বছরের ওয়ারেন্টি এবং ১ বছর ফ্রি সার্ভিস। অর্থাৎ, গাড়ির প্রায় সব সমস্যার সমাধান দিচ্ছে মিতসুবিশি এক্সপ্যান্ডার ইকো – দেশেই তৈরি হওয়ায় গাড়ির দাম যেমন তুলনামূলক কম, তেমনি জাপানি প্রযুক্তি হওয়ায় গাড়ির ব্র্যান্ড ভ্যাল্যু, পারফর্ম্যান্স ও কম্ফোর্টও দুর্দান্ত। পাশাপাশি এলপিজি ভেরিয়েন্টে সাশ্রয় হবে জ্বালানি খরচ।

জ্বালানির দাম কমবে কিনা বা কবে কমবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ফলে গাড়ি কেনার সময় এখন শুধু গাড়ির দাম দেখলে হবে না, কেনার পর অন্যান্য খরচও হিসাব করতে হবে। তাই সবকিছু বিবেচনায় মিতসুবিশি এক্সপ্যান্ডার হতে পারে আপনার সেরা পছন্দ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচন্দনাইশে হামে আক্রান্ত হয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীর মৃত্যু