তেজদীপ্ত ওয়াসফিয়ার আলোয় উদ্দীপ্ত হোক আগামীর সন্তান

রিতু পারভী | শনিবার , ৬ আগস্ট, ২০২২ at ৫:২৯ পূর্বাহ্ণ

শুভ্র মায়াময় পর্বত শৃঙ্গ, চারদিকে পাথুরে খাঁজ আর সেই খাঁজে খাঁজে লুকানো মৃত্যুর ফাঁদ। প্রতি পদক্ষেপে মৃত্যুর আবাহন। সামান্য ভুল সিদ্ধান্তে মুহুর্তে জীবন কেড়ে নেবে ওৎ পেতে থাকা মৃত্যুদূত। সেই অনিশ্চয়তাকে জয় করে তেজদীপ্ত এক মুখ সাফল্যের হাসি হাসে, চোখে অশ্রুর ধারা নিয়ে আর সাথে সাথে হেসে উঠে অভাগা, দুষ্টচক্রের কষাঘাতে জীর্ণ এক সমাজের অগণিত স্বপ্ন দেখা নারীমুখ। ওয়াসফিয়া নাজরীন সেই বলিষ্ঠ, তেজদীপ্ত কন্যা যিনি নিজের স্বপ্নকে নিজ হাতে গড়েছেন, হয়েছেন দুর্গমতম শেখর জয়ী কন্যা। বিশ্বের ভয়ংকরতম পর্বতচূড়া কারাকোরাম পর্বতশৃঙ্গের কে টু-তে এঁকে দিয়েছেন বিজয়ের পদচিহ্ন।
বৈরি আবহাওয়া আর বর্বর আচরণের জন্য পর্বতারোহীদের কাছে এক আতঙ্কের নাম কে টু। প্রতি চারজন আরোহীর মধ্যে একজন মৃত্যুমুখে পতিত হয় এই অভিযাত্রায়। জংলি এই পর্বত অভিযাত্রীদের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে বাধা প্রদান করে কিন্তু প্রকৃতিকে হার মানিয়ে তাকে জয় করার যে অভিলাষ তা মানুষের মধ্যে প্রকৃতিই তৈরি করে দিয়েছে। শক্ত মনোবলের অধিকারী ওয়াসফিয়া বিভিন্ন দেশের আরও পাঁচ নারীর সাথে ২২ জুলাই ২০২২ শুক্রবার প্রভাতে জংলি পর্বতচূড়া কে টু -তে পা রাখেন, পূরণ হয় ওয়াসফিয়ার দীর্ঘসাধনা আর পরিশ্রম।
কারাকোরাম পর্বত শৃঙ্গের সবচেয়ে উঁচু শিখর কে টু, যার উচ্চতা ৮৬১১ মিটার বা ২৬২৪৭ ফুট, এবং যা জয় করা খুব সহজ কোন বিষয় নয়। উচ্চতার দিক থেকে দ্বিতীয় হলেও এই চূড়া বিশ্বের ভয়ঙ্করতম চূড়া হিসেবে পরিচিত। ১৯৫৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ৪২৫ জন আরোহী কে টু’র চূড়া আরোহণে সক্ষম হয় যার মধ্যে ২০ জন নারী। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর সীমাহীন সাহস নিয়ে এই নারীরা পদে পদে মৃত্যু-ফাঁদ পাতা দুর্ধর্ষ কে টু জয় করে প্রমাণ করে শারীরিক এবং মানসিক শক্তিতে নারী অত্যন্ত দৃঢ়, চাইলে কঠিনতম কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব। এমন অভিযানে শারীরিক যোগ্যতার চেয়ে যেটা বেশি জরুরি তা মানসিক দৃঢ়তা। বাংলাদেশের মতো একটি দেশ যার পারিবারিক, সামাজিক এমনকী রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও নারীকে মুখোমুখি হতে হয় কঠিন সব বাধার, সে-দেশের সন্তান ওয়াসফিয়া কে টু জয় করে সৃষ্টি করেছেন অগণিত কন্যাশিশুর স্বপ্ন দেখার উন্মুক্ত প্রান্তর।
জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে স্বপ্ন এবং লক্ষ্যকে সামনে রেখে ওয়াসফিয়া নাজরীন সততার সাথে নিজেকে তৈরি করেছেন। পারিবারিক সহযোগিতা তাঁকে গতানুগতিকের বাইরে গিয়ে তৈরি হতে সাহায্য করেছেন। সামাজিক সকল বাধাকে তুচ্ছ করে নিজেকে তৈরি করেন ইস্পাতসম দৃঢ় করে।
২০১২ সালে ১৬ মে মাত্র ২৯ বছর বয়সে ওয়াসফিয়া পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট বিজয়ের মাধ্যমে বিশ্বকে তাঁর দুঃসাহসী, দৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মানুষের পরিচয় জানিয়ে দেন, দেশের জন্য আনেন গৌরবের এক অধ্যায়। ২০১৫ তে সাত মহাদেশের সাত উচ্চতম পর্বত চূড়া জয় করে জানিয়ে দেন তাঁর অদম্য যাত্রা, নিজেকে তৈরি করেন সবচেয়ে কঠিন, দুর্ধর্ষ শিখর কে টু জয়ের জন্য। নির্মল পুর্জা, মিংমা তেঞ্জিং, মিংমা ডেভিডের মত পর্বতারোহী যারা শীতকালে কে টু জয় করে দুঃসাহসিক এক বিজয়ের মুকুট ধারণ করে আছে তাঁদের নেতৃত্বে ‘এলিট এক্সপিড’ দলের সাথে যুক্ত হয়ে কে টু জয়ের অভিযান শুরু করেন ওয়াসফিয়া। সাথে ছিল ভিন্ন ভিন্ন দেশের আরো পাঁচ নারী অভিযাত্রী। ২২ জুলাই ২০২২, ওয়াসফিয়া প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে কে টুর জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল শিখরে সাহসের পালক পরিয়ে দেন, কে টুর বাতাসে উড়ান গর্বিত লাল-সবুজ পতাকা। সেই পতাকার সাথে উড়ে অসংখ্য নারী সন্তানের দুঃসাহসিক স্বপ্নের তেজদীপ্ত ডানা।
মুক্ত জীবনকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়ে এই সাহসী নারী কে টু জয়ের পর বলেন, ‘যেদিন এই পৃথিবী থেকে চলে যাবার সময় হবে তখন এই ভেবে আনন্দিত হবার আহবান রইলো, সামাজিক সকল বাধা এবং অন্যের বিবেচনামুক্ত হয়ে আমি জীবনের একটা বড় অংশ কাটিয়েছি, নিজের নিয়ম-রীতি নিজেই বানিয়েছি, আমার চিন্তার আকাশ মুক্ত যেখানে শৃঙ্খল বলে কোনও শব্দ নেই। আর আমি চাই সকল জীবন হোক মুক্ত, স্বাধীন।’ জীবনের প্রতি সৎ থাকা এক নারীর পক্ষেই সম্ভব এমন দৃঢ়ভাবে মুক্ত জীবনের গান গাওয়া।
একজন পরিবেশকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, লেখক, দুঃসাহসিক অভিযাত্রী ওয়াসফিয়া নাজরীন থেকে তৈরি হোক আরও হাজারও ওয়াসফিয়া, থুরথুরে জীর্ণ সমাজ ভেঙ্গে জেগে উঠুক জীবন।