‘ডাবুয়ার বাইয়ুন কিনিলে রাউজানত অ্যাইয়ুন’

সবজি ক্ষেতে দাঁড়িয়ে কৃষকের ডাক

মীর আসলাম, রাউজান | বৃহস্পতিবার , ২২ অক্টোবর, ২০২৬ at ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ

রাউজানে উৎপাদিত সবজির মধ্যে চট্টগ্রামের মানুষের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ডাবুয়ার বেগুন। এবার এই বেগুনের চাষ হয়েছে ব্যাপক ভাবে। সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, ক্ষেতে গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে বেগুন। কৃষকরা বলেছেন, যারা আগেভাগে ক্ষেতে চারা লাগিয়েছেন তারা এখন ক্ষেত থেকে বেগুন উঠিয়ে হাট বাজারে বিক্রির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলনে খুশিতে আত্মহারা কৃষকদের একজন ক্ষেতে দাঁড়িয়ে রসিকতার ছলে ডেকে বলছিলেন ‘ডাবুয়ার বাইয়ুন কিনিলে রাউজানত আঁর ক্ষেতে অ্যাইয়ুন।’

স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাউজান উপজেলার উত্তর ও ফটিকছড়ির দক্ষিণ সীমানা ঘেঁষে প্রবাহমান আছে সর্তা খাল। এই খালের কিছু দক্ষিণে রাউজান অংশ দিয়ে প্রবাহিত ডাবুয়া খাল। এই দুটি খালের পানিই হচ্ছে এ অঞ্চলের কৃষকদের প্রাণ, রুটি রুজির অবলম্বন। খালের দুই পাড়ে চাষাবাদ হয় বিশেষ জাতের ডাবুয়ার বেগুনসহ নানা জাতের শাক–সবজি।

জানা যায়, শীতের আগমণী বার্তায় হাট বাজারে আসে ডাবুয়ার বেগুনসহ নানা জাতের সবজি। চট্টগ্রাম অঞ্চলে রয়েছে এই সবজির ব্যাপক চাহিদা। অনেকেই বলেন, ‘ছুরি ও লইট্ট্যা শুটকির সাথে ডাবুয়ার বেগুন রান্না করলে ভাতের সাথে আর কিছু লাগে না। এই তরকারি রান্নাতে বাড়িতে ছড়ায় সুগন্ধ। ডাবুয়ার বেগুনের পাশাপাশি এখানে আরো একটি বিশেষ জাতের বেগুন চাষ হয়। ফুতা বেগুন নামে পরিচিত এই বেগুনেরও এ অঞ্চলে রয়েছে বেশ কদর। প্রথম দিকে বাজার আসলে বিক্রি হয় কেজি একশ বিশ টাকা থেকে দেড় শত টাকা দরে।

ডাবুয়া ইউনিয়নের হাছানেরখীল গ্রামের প্রবীণ কৃষক আবুল কালাম বিশেষ জাতের বেগুনের ক্ষেত করেছেন প্রায় ৩০ শতক জমিতে। সমপরিমাণ জমিতে করেছেন মিষ্টি কুমড়া, মূলা, বরবটি। বলেছেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে ক্ষেত থেকে রববটি বিক্রি করা শুরু করেছেন। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ক্ষেত থেকে উঠানো হবে ডাবুয়ার বেগুন। এই কৃষকের মতে, রাউজানে এবার ভাল সবজি ক্ষেত হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও মাঠ পর্যায়ে থাকা কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকিতে কৃষকরা কীটনাশকমুক্ত পরিবেশে ফসল উৎপাদন করছেন। এ কারণে এখানকার সবজির চাহিদা থাকে বেশি। দামও পাওয়া যায় ভাল। লাভবান হন কৃষকরা।

উপজেলা কৃষিবিভাগের কর্মকর্তা সনজিব কুমার সুশীল বলেছেন, রাউজানের কৃষকদের প্রাণ হচ্ছে র্পা্বত্য অঞ্চল থেকে সৃষ্ট কয়েকটি খাল। এসব খালের মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হচ্ছে সর্তা, ডাবুয়া, কাশখালী, বেরুলীয়। আছে এলাকা ভিত্তিক আরো কয়েকটি চড়াখালও। বর্ষাকালে এসব খাল পানিতে টইটুম্বুর থাকে। পাহাড়ি পানির বিধ্বংসী স্রোতে ভেসে যায় দুইপাড়ে থাকা মানুষের ঘর বাড়ি। নষ্ট হয় শত শত একর জমির ফসল। আবার শুষ্ক মৌসুমে খালগুলো হয়ে উঠে এলাকার মানুষের জন্য আশীর্বাদ। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝিরঝির ঝর্ণা ধারার পানিই হয়ে উঠে এলাকার মানুষের জীবন জীবিকার অবলম্বন। তিনি জানান, উপজেলার ডাবুয়া, হলদিয়া, চিকদাইর, নোয়াজিশপুর ইউনিয়নসহ পৌরসভার কিছু ওয়ার্ডের কয়েক হাজার কৃষি পরিবারের জীবন জীবিকা চলে খালের পানিতে সবজি চাষ করে। যুগে যুগে বাপ দাদার দেখানো পথে মৌসুমি ফসল ও সবজি চাষই হয়ে আছে তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

বহু বছর ধরে সবজি চাষাবাদ করে জীবন নির্বাহ করে আসছেন রাউজান পৌর এলাকার বাসিন্দা কৃষক আবদুস শুক্কুর। তিনি বলেছেন, এখন কৃষকরা ডাবুয়ার বেগুনের পাশাপাশি চাষ করছে ছোট আকারের আরেক বিশেষ বেগুন। স্থানীয়রা এই বেগুনকে ফুতা বেগুন বলেন। এই বেগুনেরও চাহিদা রয়েছে প্রচুর। বলেন, কাশখালীর পাড়ে উৎপাদিত সবজি এখন স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছে শহরের বাজারগুলোতে। রাউজানের কৃষকরা এখন আর সনাতনী পদ্ধতিতে চাষাবাদ করেন না দাবি করে আবদুস শুক্কুর জানান, কৃষি বিভাগের সহায়তায় কৃষকরা চাষাবাদ করছেন আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। ফসল উৎপাদন করছেন বিষমুক্ত প্রাকৃতিক বালাই নাশক দিয়ে। এবার তিনি ডাবুয়া বেগুনের পাশাপাশি ফুতা বেগুনসহ অন্যান্য সবজির চাষ করেছেন বলে জানান।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুম কবির বলেছেন, রাউজানে কৃষকরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সরকারি সুযোগ সুবিধা পেয়ে আসছেন। এ কারণে তারা কৃষি খামারে বেশ মনোযোগী হয়েছেন। তার দাবি মাঠ পর্যায়ে থাকা সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ক্ষেত খামারে উপস্থিতি ও পরামর্শ পেয়ে কৃষকরা কৃষিতে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন। বলেন, রাউজানে এখন প্রচুর পরিমাণ বেগুন, কচু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মরিচ, শিম, আলু, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, মূলা, বরবটির মত মৌসুমী নানা সবজি উৎপাদন হয়। স্থানীয়দের চাহিদা পূরণ করে এসব সবজি শহরের বাজারগুলোতেও সরবরাহ হয়। প্রচুর চাহিদা পূরণ করতে এবার ডাবুয়ায় বেগুনের চাষ হয়েছে ৩৫ হেক্টর জমিতে। রাউজানে এবার বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষাবাদ হয়েছে ১ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হবে ২৮ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন সবজি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ ও জাতির খেদমতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে
পরবর্তী নিবন্ধকড়া নিরাপত্তায় রূপপুরে পৌঁছাল ইউরেনিয়ামের নতুন চালান