ভূমিকা: ‘সুখ তুমি কি বড়ো জানতে ইচ্ছে করে’– গীতিকার মোজাক্কের আলীর লেখা ও অজিত রায়ের সুরে গীত প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লার কালজয়ী গানের এই সুখ যা’ই হোক তা আপনার শরীরের রক্তচাপের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। তা রক্তচাপ কমায় টেনশন হ্রাস তথা মানসিক প্রশান্তি প্রদানের মাধ্যমে। তার বিপরীতে কাজ করে টেনশন বা মানসিক চাপ। টেনশনে সুখ পালায়; তা রক্তচাপ বৃদ্ধি করে। ঘটায় নানা বিপত্তি।
হ টেনশন আর সুখ: টেনশন হচ্ছে মনের চাপ। এই চাপে উৎকণ্ঠিত হওয়া, দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়া, আতংকিত হওয়া, ক্ষুব্ধ হওয়া ইত্যাদি, ইত্যাদি। এই টেনশন মানব জীবনের নিত্যসঙ্গী। বিশেষত বর্তমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে। টেনশন দেহ–মনের জন্য এক জরুরি অবস্থা সদৃশ বৈরী পরিস্থিতি। এই অবস্থায় ব্যক্তিবিশেষ হয়ত তা মোকাবেলা করে কিংবা পলায়ন করে। তখন শরীর তাৎক্ষণিকভাবে স্নায়ু বার্তাবাহক (নিউরোট্রান্সমিটার) এবং ‘টেনশন’ হরমোন যেমন এড্রিনালিন, নরএড্রিনালিন, কর্টিসোল ইত্যাদি দেহকোষ ও রক্তে অবমুক্ত করে। এগুলো উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাড়তি শক্তি যোগায়। এতে হৃৎস্পন্দন বাড়ে, রক্তনালী সংকুচিত হয়ে রক্তচাপ বাড়ে। টেনশন কমলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। অপরদিকে সুখ হচ্ছে মনের উপলব্ধি, যাতে মন আনন্দ, সন্তুষ্টি, পরিতৃপ্তি এবং পরিপূর্ণতায় ভরে উঠে। সুখ কেবল আর্থিক বিষয় নয়। এতে জড়িয়ে থাকে উদারতা, নম্রতা, রসবোধ, কৃতজ্ঞতা, গ্রহনযোগ্যতা ও ক্ষমার মতো মানবিক গুণাবলী।
হ টেনশনে হাইপারটেনশন কিভাবে? হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ পৃথিবীর এক নম্বর স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশ্বের ১.৪ বিলিয়ন প্রাপ্ত বয়স্ক এই রোগে আক্রান্ত। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ, ষ্ট্রোক, কিডনী রোগ ও রক্তনালীর বিভিন্ন জটিলতার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর প্রধানতম কারণ। বিশ্বে প্রতি বছরে ১০ মিলিয়ন ব্যক্তি এই রোগে মৃত্যুবরণ করে। যার অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ সমূহে। বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ প্রাপ্ত বয়স্ক উচ্চ রক্তচাপগ্রস্ত। তবে তাদের অনেকেই এ ব্যাপারে সচেতন নয়। অনেকটা নীরবে তা মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে তাকে ডাকা হয় ‘নিরব ঘাতক’ বলে। উচ্চ রক্তচাপের সঠিক কারণ এখনও অজানা। এতে জিনগত ও পরিবেশগত উভয় দিকই ক্রিয়াশীল। টেনশন হচ্ছে অন্যতম পরিবেশগত কারণ, যা উচ্চ রক্তচাপ এর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। টেনশন উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টিতে কাজ করে নিম্ন বর্ণিত উপায়ে–
হ টেনশন যাদের নিত্যসঙ্গী তাদের রক্তচাপ উচ্চমাত্রায় থেকে যায় স্নায়বিক কারনে ও টেনশন হরমোন এর প্রভাবে। ভোরে এই হরমোনের মাত্রা বেশি থাকে বলে এ সময়ে রক্তচাপও বেশি থাকে। একই কারণে উচ্চ রক্তচাপগ্রস্তদের এ সময়ে হার্ট অ্যাটাকের আশংকাও বেশি থাকে। যারা পূর্ব থেকে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত টেনশন তাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে বাধাগ্রস্ত করে। তীব্র টেনশনে রক্তচাপ হঠাৎ অনেক বেড়ে জরুরি পরিস্থিতি তথা ষ্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, হার্ট ফেইলিউর, কিডনী বিকলতা সৃষ্টি হতে পারে।
হ টেনশন জীবনযাত্রাকে বহুলাংশে প্রভাবিত করে। টেনশনে ভোগা ব্যক্তিরা ধূমপান, অ্যালকোহল ও অন্যান্য নেশায় আসক্ত হয়ে পড়তে পারে। তারা কম ব্যায়াম করে, অতিভোজী ও মেদবহুল হয়। তাদের ঘুম ব্যাহত হয়। তারা সামগ্রিকভাবে কম স্বাস্থ্য সচেতন হয়। এই সবই রক্তচাপ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে ব্যাহত করে।
হ টেনশনে ভোগা ব্যক্তিদের উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সেবনের প্রতি আনুগত্য কম থাকে। অনিয়মিত ওষধ সেবনের কারণে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ বহুলাংশে বাধাগ্রস্থ হয়।
হ জাতীয় সুখ সূচক ও উচ্চ রক্তচাপ:
সুখে রক্তচাপ হ্রাস পায়। তা উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ কমায়। সুখানুভূতি উচ্চ রক্তচাপগ্রস্তদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে সহজ ও সুচারু করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের চেয়ে বেশি কার্যকর বলে প্রমাণিত। বিভিন্ন দেশে সম্পাদিত একাধিক সমীক্ষা দেখিয়েছে, উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ স্ব স্ব দেশের জাতীয় সুখ সূচকের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। ইউরোপের সুখী দেশ সূচকে শীর্ষে অবস্থানকারী দেশ ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড এর অধিবাসীদের উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ কম। পাশাপাশি নিম্ন সুখসুচকের দেশ জার্মানী, ইটালী ও পর্তুগালের অধিবাসীদের উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ বেশি। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ব সুখসূচকেও নরডিক দেশ সমূহ (সাথে নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, কোষ্টারিকা) অগ্রগামী। বিশ্ব সুখসুচক নির্ধারণে বিবেচ্য বিষয় ছিল মাথাপিছু জিডিপি, কম দুর্নীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, সবার জন্য রাষ্ট্রীয় সমসুবিধা প্রাপ্তি, মানসিক সুস্থতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, জীবন মানের সন্তুষ্টি ও বদান্যতা। জাতীয় সুখ সূচকের সাথে রক্তচাপের এই নিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হওয়াতে রক্তচাপ পরিমাপও সে সব দেশের জাতীয় সুখের সূচক হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে। বিশেষত অন্যান্য বিবেচ্য বিষয়ের তুলনায় যেহেতু রক্তচাপ পরিমাপ অনেকবেশি বিজ্ঞানসম্মত ও গ্রহনযোগ্য। এভাবে উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসা বিজ্ঞানকে ছাড়িয়ে আজ অর্থনীতির বিবেচ্য বিষয় হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে।
হ বৈশ্বিক টেনশনে বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবস:
বৈশ্বিক চরম টেনশনের প্রেক্ষাপটে ১৭ মে উদযাপিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবস ২০২৬। এই দিবসের প্রতিপাদ্য ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে চাই সম্মিলিত উদ্যোগ’। চলমান এই পরিস্থিতিতে এই দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য সময়োপযোগী।
হ টেনশন মুক্তি ও সুখ প্রাপ্তি:
এই উভয় প্রাপ্তি সমার্থক নয়। তবে নিম্ন ব্যবস্থা তা আপনাকে টেনশন মুক্তি করতে পারে এবং আপনার সুখ প্রাপ্তির পথ সুগম করতে পারে।
বাস্তবতাকে সহজে গ্রহণ করার চেষ্টা করুন। সব ক্ষেত্রে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নাও মিলতে পারে। সবতো আপনার হাতে নেই। তাই কোন ব্যাপারকে ‘ডু অর ডাই’ পর্যায়ে নেবেন না। মনের মধ্যে কোন উত্তেজনা পুষে রাখবেন না, উত্তেজিত না হয়ে আত্মসংবরণ করুন। কোন কারনেণ উত্তেজিত হয়ে পড়লে তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিন। পরিমিত বিশ্রাম করুন। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। টেনশন দূর করতে ঘুমের মতো টনিক কমই আছে। কায়িক শ্রম বাড়ান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন, বিশেষ কিছু ব্যায়ামে ও নৃত্যে শরীরের সুখী হরমোন (অক্সিটোসিন, এন্ডরফিন) নিঃসরণ তরান্বিত হয়। সামাজিকতা বাড়ান, সবার সাথে মিশতে চেষ্টা করুন। সদা প্রাণবন্ত থাকার চেষ্টা করুন। প্রচুর হাসুন, শারীরিক সংশ্রব ও আলিঙ্গনে সুখী হরমোন বাড়ে। সবকিছুতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করুন। সর্বদা আশাবাদী হওয়ার চেষ্টা করুন। চিত্ত বিনোদন ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটান– পার্কে, নদীর ধারে, সমুদ্র সৈকতে, পশুপাখীর সাথে। প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে নিয়োজিত থাকুন। দান–দক্ষিণা করুন, দয়া প্রদর্শন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, প্রশংসা ইত্যাদি মানবিক কর্মকাণ্ডে সুখী হরমোনের মাত্রা বাড়ে। এসব অনুশীলন করুন। মেডিটেশন করুন। এতে ষড়রিপুকে দমন করা সম্ভব। এই রিপুর তাড়নায় মানুষ প্রতিনিয়ত বিদ্ধ হচ্ছে। টেনশন এসে গ্রাস করছে। এগুলো দমনে মন অনাবিল আনন্দে ভরে উঠবে। টেনশন দূরীভূত হবে।
ব্রিটিশ রোমান্টিক কবি লর্ড বায়রনের মতে যদি কেউ সুখ লাভ করতে চায়, তবে তার উচিত তা অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়া। একাকী কেউ সুখী হতে পারে না। তাই আপনিও আপনার সুখ অন্যের সাথে ভাগাভাগি করুন।
হ উপসংহার: ব্যক্তি থেকে সমাজ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে বিস্তৃত সর্বগ্রাসী এই টেনশনে বাড়ছে হাইপারটেনশন। ব্যাহত হচ্ছে সুখ সমৃদ্ধি। বিশ্ব হাইপারটেনশন দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য অনুসরণে তা নিয়ন্ত্রণে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের অন্যতম হচ্ছে বৈশ্বিক টেনশন প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন। কিন্তু “নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস, শান্তির ললিতবাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।” ১৯৩৭ সালে লেখা বিশ্ব কবি রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ‘প্রান্তিক’ কাব্যগ্রন্থের এই বাণী এখনও প্রাসঙ্গিক। বৈশ্বিক টেনশন দূরীভূত হয়ে শান্তি ফিরুক সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। এভাবে ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনের জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ’– এই প্রতিপাদ্য সার্থকতা লাভ করবে।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ হাইপারটেনশন এন্ড হার্ট ফেইলিউর ফাউন্ডেশন; জেনারেল সেক্রেটারি, চট্টগ্রাম হার্ট ফাউন্ডেশন












