জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ চাই

| সোমবার , ৩ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:৩৭ পূর্বাহ্ণ

সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করলে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ব্যবসায়ীদের সমস্যা দ্রুত সমাধানে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আবারও বৈঠকের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। গত শনিবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কিছু সমস্যা রয়েছে, তবে সরকার ও ব্যবসায়ীরা একসঙ্গে কাজ করলে সেগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। দেশের মানুষের জন্য কাজ করাই সরকারের লক্ষ্য। বিদ্যমান অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সরকার যেমন উপলব্ধি করছে, তেমনি ব্যবসায়ীরাও তা অনুধাবন করছেন। এসব সমস্যা সমাধানে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

সরকারের বয়স এখনো ছয় মাস হয়নি, এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মধ্যেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। প্রথম বৈঠকে যেসব সমস্যা তুলে ধরা হয়েছিল, তার অনেকগুলোরই সমাধান হয়েছে। নতুন করে যেসব বিষয় সামনে এসেছে, সেগুলো নিয়েও সরকার কাজ করবে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, প্রথম বৈঠকে আলোচিত ২৮টি সমস্যার মধ্যে ২১টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি সাতটি বিষয় এখনো প্রক্রিয়াধীন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার একটি প্রাথমিক রূপরেখাও তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। এ লক্ষ্য অর্জনে কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে গ্যাস ও বিদ্যুতের বর্তমান সংকট নিয়ে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চলায় সাময়িকভাবে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানিসংকটের কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ব্যবসায়ীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। সরকার পক্ষ ব্যবসায়ীদের জানায়, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শেষ হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য তৃতীয় একটি এফএসআরইউ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালের কাজ শুরু হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ২০২৮ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে স্থায়ী সমাধান আসবে বলে আশা করছে সরকার।

দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত এক মহা সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বলা যায়, এই সংকট অর্থনীতিকে স্থবির করে রাখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সংকটের ফলে যে সময়েরও অপচয় হচ্ছে, সেটি সরাসরি জাতীয় উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সামপ্রতিক প্রতিবেদনে তাপপ্রবাহের কারণে কর্মঘণ্টা হারিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বছরে ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, গ্যাস সংকট সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পেট্রোবাংলার বরাত দিয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যমতে, দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪৩০ কোটি ঘনফুট। আর স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে মোট সরবরাহ হয় ৩০০ কোটি ঘনফুট। আবার চাহিদার অধিকাংশ পূরণ করা হয় আমদানির মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে আমদানীকৃত এলএনজির সরবরাহ এবং দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদনের পরিমাণও কমেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর পেছনে দায়ী অর্থ এবং গ্যাস খাতের অনুসন্ধান ও উত্তোলন ব্যবস্থায় ঘাটতি। এ অবস্থার আশু সমাধান না করা গেলে দেশের অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মুখ থুবড়ে পড়বে। যেহেতু গ্যাসের ওপরই নির্ভরশীল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো। এরই মধ্যে স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সরবরাহ রেশনিং চালু করা হয়েছে চলমান সংকট মোকাবেলায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে নিজেদের উত্তোলন বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের জ্বালানি ও উৎপাদন খাতকে গ্যাসনির্ভরতা থেকে সরিয়ে আনতে হবে। উন্নত বিশ্বের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হতে হবে। মজুদ যতই থাকুক না কেন, অনবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে একসময় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই আমাদের শিগগিরই এর বিকল্প পথে হাঁটা শুরু করতে হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তা প্রশংসার দাবিদার। তবে এই উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে