জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে

| মঙ্গলবার , ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৮:০২ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে শিল্প উৎপাদন, কৃষি, স্বাস্থ্য খাত, মূল্যস্ফীতি এবং মানুষের আয়রোজগারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সংকট দীর্ঘ হলে অর্থনীতিতে এর চাপ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সীমিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য কমানোর গতি কমে যায়। ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে। চলতি বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ না হলে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু যুদ্ধের প্রভাবে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে দাঁড়াতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে আরও প্রায় ১২ লাখ মানুষের দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নষ্ট হতে পারে। শুধু তাই নয়, এ বছর ছয় লাখ মানুষের কাজ হারানোর শঙ্কা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানির বাড়তি দাম ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়বে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ সব জায়গায়। জ্বালানির দাম বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কমছে সার উৎপাদন। বাড়ছে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়। এর প্রভাব পড়ছে পণ্যের দাম, কৃষি, মানুষের আয়রোজগার থেকে শুরু করে কর্মসংস্থানেও। বিশ্বব্যাংকের এই মূল্যায়ন বাস্তবসম্মত, তবে উদ্বেজনকও।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকটাই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। আমাদের মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশই যায় সৌদি আরবে। শ্রমবাজারের দ্বিতীয় স্থানে কাতার, চতুর্থ কুয়েত, ষষ্ঠ আরব আমিরাত এবং সপ্তম স্থানে রয়েছে জর্দান। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় প্রতিটি দেশেই যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় ঝুঁকিতে পড়েছে আমাদের শ্রমবাজার। বর্তমানে খুবই আতঙ্কে আছেন প্রবাসীরা। আর এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে। জানা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান দুই চালিকাশক্তি। বৈশ্বিক মন্দা বা অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার, যা অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যেসব বাংলাদেশি বসবাস করছেন, তাদের কাজ ও আয় কমার আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে অনেকে দেশে পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারছেন না। এতে দেশের রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক ধাক্কা আসতে পারে। বাংলাদেশ যদি তার নিরপেক্ষ অবস্থান রাখতে পারে তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের এখন প্রয়োজন এই বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা।

তাঁরা বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন বাস্তবসম্মত। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বছরে প্রায় এক লাখ কর্মী প্রেরণ কমে গেছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ না হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। উলটো উৎপাদন কমাতে হচ্ছে বিধায় কর্মসংস্থানে ভাটা পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকারকে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এলএনজি আমদানিতে বিকল্প উৎসের পাশাপাশি বিদ্যমান সমস্যাগুলো প্রায়োরিটি দিয়ে সমাধান করতে হবে। তাতে অন্তত এই সংকটময় মুহূর্তে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা না গেলেও কর্মসংস্থান ধরে রাখা যাবে। এছাড়া দরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে ওএমএস কর্মসূচির পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড বিস্তৃত করতে হবে। তাঁরা বলেন, প্রথমত জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে কর্মহানি না ঘটে এবং শিল্পকারখানাগুলো সচল থাকে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় বেশি কর্মহানি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেসব এলাকাকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। পরিবারভিত্তিক সহায়তার জন্য যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, সেখানেও বেশি কর্মহানি হতে পারে এমন এলাকাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬