জুম্‌’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

শুক্রবার , ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ
31

খলীফাতুল মুসলেমীন হযরত
আবু বকর সিদ্দিক (রা.)
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন! জেনে রাখুন, মহীয়ান স্রষ্টা আল্লাহ তা’য়ালা সম্মানিত নবী রসূলগণের পর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতকে অন্যান্য সকল নবীদের উম্মতের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। সম্মানিত নবী রসূলগণের পর প্রিয় নবীর সাহাবাদেরকে মানব জাতির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী করেছেন। এ কারণে মহান আল্লাহ তা’য়ালা সম্মানিত সাহাবাদের মর্যাদা বর্ণনায় এরশাদ করেছেন, এবং মুহাজির ও আনসার সাহাবীগণ সমস্ত উম্মতের মাঝে ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে যাঁরা অগ্রবর্তি এবং পরবর্তীতে একান্ত নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণ করেছেন। এ সমস্ত লোকদের উপর আল্লাহ তা’য়ালা সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহ তা’য়ালার উপর সন্তুষ্ট। (সূরা: তাওবা, আয়াত: ১০০)
পবিত্র আল-কুরআনের আলোকে হযরত সিদ্দিকে আকবর (রা.) শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী: খলিফাতুর রাসূল হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন শ্রেষ্ঠ মর্যাদার অধিকারী। বংশ গৌরবে, আদর্শে, ঐতিহ্যে, সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়নতা, বদান্যতা ইত্যাদি গুণাবলীতে তিনি ছিলেন অনন্য অসাধারণ। বহুবিধ যোগ্যতার মাপকাঠিতে অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। তাঁর মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও আদর্শিক গুণাবলী তাকওয়া পরহেজগারি, নবী প্রেম ইসলামের জন্য তাঁর অপরিসীম ত্যাগ ও কুরবানীর বর্ণনায় পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।
নবীজির হিজরতের সাথী হযরত সিদ্দিকে আকবর (রা.): কাফির মুশরিকদের জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি মক্কা মকাররমা ত্যাগ করে আল্লাহর নির্দেশক্রমে গভীর রজনীতে মদীনা হিজরতকালে নবীজির হিজরতের সাথী ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, তিনি ছিলেন দু’জনের একজন। (অপরজন ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক রা.) যখন তাঁরা সওর গুহার মধ্যে ছিলেন তখন তিনি তাঁর সঙ্গী (আবুবকর) কে বললেন, চিন্তিত হয়োনা। নিশ্চয় আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সাথে আছেন। (সূরা: তাওবা, আয়াত: ৪০)
হাদীস শরীফের আলোকে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)’র মর্যাদা: হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন ঐতিহ্যবাহী কুরাইশ বংশের ধনাঢ্য সম্পদশালী ব্যক্তিদের অন্যতম। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের দাওয়াত প্রচারের দ্বিতীয় দিনে তিনি ইসলাম কবুল করেন। নবীজির দাওয়াত পাওয়া মাত্রই কোন প্রকার দ্বিধা সংশয় ছাড়াই নবীজির আহবানে সাড়া দিয়ে নিজকে ইসলামের খিদমতে ও নবীজির প্রেমে সর্বস্ব উৎসর্গ করেন। মক্কার কঠিন ক্রান্তিকালে ইসলামের কঠিন সংকটময় মুহূর্তে তিনি নবীজির সাথেই ছিলেন। মক্কা ত্যাগকালে মদিনা মনোওয়ারায় হিজরতের সময় নবীজির সঙ্গী ছিলেন। ইসলামের প্রতিটি যুদ্ধে তিনি স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেন। নবীজির পক্ষ থেকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত দশজন সৌভাগ্যবান সাহাবাদের পাঁচ জনই তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা যথাক্রমে হযরত ওসমান বিন আফফান (রা.), জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.), হযরত সাদ বিন আবি ওক্কাস (রা.), হযরত তালহা বিন ওবাইদিল্লাহ (রা), হযরত আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা.)। ইসলাম গ্রহণের কারণে যে সব দাস-দাসী কুরাইশদের নিকট নির্যাতিত হচ্ছিল তিনি তাদের ক্রয় করে আযাদ করে দেন। ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে তিনি দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে আযাদ করে দেন।
হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন নবীজির সর্বাধিক প্রিয়: সাহাবীদের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ছিলেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয়। সাহাবীদের মাঝে ভাষণ দান কালে নবীজি হযরত আবু বকর (রা.) সম্পর্কে বলতেন, “ নিশ্চয় লোকদের মধ্যে সহচার্য ও নিজ সম্পদ ব্যয়ে যিনি আমার প্রতি সর্বাধিক দয়া অনুগ্রহ করেছেন তিনি আবু বকর। যদি আমি কাউকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকেই বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম কিন্তু তার সাথে ইসলামী ভাতৃত্ব রয়েছে। ( বুখারী শরীফ, হাদীস নং : ৫৬৪৩)
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ওযীর ঘোষণা: খোদা প্রদত্ত নবীজির প্রশাসনের ওযীর তথা মন্ত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, প্রত্যেক নবীর আসমানে দু’জন ওযীর রয়েছেন এবং দু’জন জমিনের ওযীর আছেন। আমার আসমানের ওযীরদ্বয় হলেন হযরত জিব্রাইল (আ:) ও হযরত মিকাঈল (আ:) আর পৃথিবীর ওযীরদ্বয় হলেন, হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.)। (তিরমিযী শরীফ: হাদীস নং: ৩৬৮০)
ওহুদ পাহাড় কম্পিত হলো: হযরত শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ) প্রণীত জযবুল কুলুব ২০২ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেন যারা শোহাদায়ে ওহুদের প্রতি সালাম পেশ করবেন, ওহুদের শহীদগন কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করতে থাকেন, বর্ণিত আছে, সায়্যিদুশ শোহাদা হযরত আমীর হামযা রাদ্বি’র মাজার থেকে অনেকবার সালামের আওয়াজ শোনা গেছে। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে হযরত আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর (র.), হযরত ওমর (র.), হযরত ওসমান (রা.) ওহুদ পাহাড়ে চড়লেন, তাঁদেরকে নিয়ে পাহাড় কম্পিত হলো, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদ পাহাড়কে সম্বোধন করে বললেন হে ওহুদ স্থির হও। নিশ্চয় তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দিক ও দুইজন শহীদ রয়েছেন। (বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৩৪৭২)
নবীজির প্রেমে সমুদয় সম্পদ উৎসর্গ করলেন: রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় দ্বীনের জন্য দান-সাদকা উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করলেন, সাহাবায়ে কেরাম নবীজির দরবারে অসংখ্য দান-সাদকা নিয়ে এলেন। সর্বপ্রথম নিজস্ব সমুদয় ধন সম্পদ যিনি নিয়ে এলেন তিনি হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন তুমি তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছো? তদুত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ ও তদীয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রেখে এসেছি। (আবু দাউদ শরীফ, হাদীস নং: ১৬৭৭)
হযরত আবু বকর ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বলেন, হযরত আবু বকর (রা) কোন অধিক পরিমাণ নামায, রোজার, কারণে অন্যান্য লোকদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেননি বরং তার শ্রেষ্ঠত্ব অন্য একটি বস্তু দ্বারা হয়েছে যা তাঁর অন্তরে বিরাজমান রয়েছে। (ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল ফাযায়েলুস সাহাব, খন্ড:১, পৃ: ১৪১)
হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন খলীফাতুর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওফাত পূর্বকালীন অসুস্থ অবস্থায় হযরত আবু বকর (রা) কে লোকদের নামায়ের ইমামত করার নির্দেশ দিলেন, নবীজি তাঁকে নবম হিজরীতে আমিরুল হুজ্জাজ মনোনীত করেছিলেন, এ সব কিছুই নবীজির পর তিনি প্রথম খলিফাতুল মুসলেমীন হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ বহন করে।
ইসলামের জন্য তাঁর অপরিসীম অবদান: তিনি ছিলেন নবীজির পর সর্বশ্রেষ্ঠ দানবীর ইসলামের স্বার্থ সংরক্ষণ ও মুসলমানদের সার্বিক কল্যাণে ইসলাম গ্রহণের সময় তাঁর নিকট গচ্ছিত চল্লিশ হাজার দিনারের সমুদয় অর্থ দশ হাজার রাতে দশ হাজার দিনে দশ হাজার গোপনে দশ হাজার প্রকাশ্যে আল্লাহর পথে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর দানশীলতার স্বীকৃিত ও উত্তম প্রতিদান প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছে, “যারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে রাতে ও দিনে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে তাদের প্রতিদান তাদের পালন কর্তার নিকট রয়েছে আর তাদের কোন ভয় নেই। এবং তাদের চিন্তার কোন কারণ নেই। (সূরা: আল বাকারা: আয়াত : ২৭৪)
হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে কোন ব্যক্তি আমাদের উপর যে কোন প্রকারের ইহসান করেছে আমি তার প্রতিদান দিয়েছি। আবু বকরের এহছান ছাড়া, হাশরের ময়দানে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁকে প্রতিদান দান করবেন কারো ধন সম্পদ আমাকে ততটুকু উপকার করতে পারেনি যতখানি আবু বকরের ধন সম্পদ আমাকে উপকৃত করেছে। (তিরমিযী মশীফ, হাদীস নং: ৫৬৪৯)
রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) ইসলামী খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। মুসলিম জাহানের সর্বত্র বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ, যাকাত অস্বীকার কারীদের দমন, ভন্ডনবীদের উৎপাত নিমূলকরন, সর্বত্র শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাসহ ইসলামের বহুমূখী কল্যাণ সাধনে তিনি যে অনন্য ভূমিকা ও অসাধারণ অবদান রেখে গেছেন ইতিহাসে তিনি ইসলামের ত্রাণকর্তা হিসেবে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। দু’ বৎসর তিন মাস ৯দিন তাঁর খিলাফতের মেয়াদকাল ছিল ইসলামের গৌরবোজ্বল সোনালী যুগ। ১৩ হিজরির ২২ জমাদিউস সানি, মঙ্গলবার রজনীতে মাগরীব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে ৬৩ বৎসর বয়সে তিনি মাওলায়ে হাকিকী রফিকে আ’লার সান্নিধ্যে গমন করেন। দোজাহানের সরদার প্রিয় নবীজির রওজা মোবারকের পাশেই তিনি চির নিদ্রায় শায়িত আছেন।
হে আল্লাহ ইসলাম ও মুসলমানদেরকে শক্তিশালী করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী),
বন্দর, চট্টগ্রাম। খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।