জুম্’আর খুতবা

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি | শুক্রবার , ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৪:৪২ পূর্বাহ্ণ

বিদআত প্রতিরোধে মুজাদ্দিদের ভূমিকা

সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! একমাত্র তাঁরই ইবাদত করুন, তারই সাহায্য প্রার্থনা করুন। তারই নির্দেশিত প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদর্শিত সিরাতুল মুস্তাকিম তথা ইসলামের সঠিক রূপরেখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতাদর্শের উপর জীবন পরিচালিত করুন। নবীজির অনুসৃত আদর্শের প্রদর্শক ও প্রচারক, মিল্লাতের রাহবার মুজাদ্দিদ তথা দ্বীনের সংস্কারক মহামনিষীদের জীবন-কর্ম অনুসরণ করুন।
মুজাদ্দিদ অর্থ : মুজাদ্দিদ আরবি শব্দ, অর্থ সংস্কারক। তাজদীদুন ক্রিয়ামূল। এর অর্থ নতুন সৃষ্টি করা। শরয়ী পরিভাষায় কুফর, শির্ক, বিদআত, অনৈসলামিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালন করা। উপরন্ত মানবতার কল্যাণার্থে এমন সব বিষয়ে সংস্কার সাধন করা যেখানে ধর্মীয় কল্যাণ ও উপকারিতা নিহিত রয়েছে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করণে মুজাদ্দিদ হবেন পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় অনুস্মরনীয় আদর্শ।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের নির্দেশনা ও মুজাদ্দিদের জন্ম সাল : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “উলা-ইকা কাতাবা ফী কুলুবিহিমুল ঈমানা ওয়া আইয়্যাদাহুম বিরূহিম মিনহু”। অর্থ: তাঁরা হচ্ছেন সেসব ব্যক্তি যাঁদের অন্ত:করণে আল্লাহ তা’আলা ঈমানের চিত্র অঙ্কন করেছেন এবং নিজ পক্ষ থেকে রূহ দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন। (সূরা: মুজাদালাহ, ২২)
মুজাদ্দিদ আ’লা হযরত : আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান ফাযেলে বেরলভী (র.) ভারতের উত্তর প্রদেশের বেরেলী শহরে ১২৭২ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। আ’লা হযরত (র.) নিজেই কুরআন মজীদের সূরা মুজাদালাহর উপরোক্ত আয়াত থেকে তাঁর হিজরি জন্ম সাল বের করেছেন। আবজাদ হিসবানুযায়ী আয়াতে ব্যবহৃত অক্ষর সমূহের মানের সংখ্যার যোগফলের সমষ্টি হল ১২৭২। যা তাঁর জন্মের হিজরি সাল। সূরা মুজাদালাহর উপরোক্ত আয়াতের যথার্থ মর্মার্থ আ’লা হযরতের জীবদ্দশায় পূর্ণ মাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি নিজেই বলেছেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি, আমার আত্মাকে যদি দু-টুকরা করা হয় আল্লাহর শপথ করে বলছি একাংশে অঙ্কিত দেখবে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, দ্বিতীয়াংশে দেখতে পাবে মুহাম্মাদুর রাসূলাল্লাহ”।
হাদীস শরীফের আলোকে প্রতি শতাব্দীতে মুজাদ্দিদের আগমন হবে : যিনি দ্বীনি সংস্কার কর্ম সম্পাদন করেন তিনি ইসলামী পরিভাষায় মুজাদ্দিদ অভিধায় ভূষিত। মুজাদ্দিদের শর্তাবলীর মধ্যে রয়েছে তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বিদায় পরিপূর্ণ বিশ্বাসী হওয়া ও সমসাময়িক সকল বাতিল সম্প্রদায়ের বিরোধীতায় অগ্রগামী হওয়া। সমসাময়িক কালের প্রসিদ্ধ আলেমগণ দ্বীনি কর্মে তাঁর উল্লেখ্য যোগ্য ভূমিকা দেখে মুজাদ্দিদের স্বীকৃতি দেয়া। হাদীস শরীফের মুজাদ্দিদের আগমন প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে, “হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন। “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা এই উম্মতের জন্য প্রতি শতাব্দীর শুরুতে এমন ব্যক্তিকে প্রেরণ করেন। যিনি এ দ্বীনকে নতুন ভাবে সংস্কার সাধন করেন। (আবু দাউদ, হাকেম তাবরানী)
উপরোক্ত হাদীস শরীফের আলোকে বিগত চৌদ্দশত বছরে প্রতি শতাব্দীতে একাধিক মুজাদ্দিদের আগমন ঘটেছে। প্রতি শতাব্দীর মুজাদ্দিদগনের দ্বিনী খিদমত ও সংস্কার সমূহ পর্যালোচনায় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে তাঁরা সকলে আপন আপন যুগে প্রতি শতাব্দীতে সত্য প্রতিষ্ঠা ও কুফর শির্ক বিদআত প্রতিরোধে ছিলেন কঠোর প্রতিবাদী ও আপোষহীন। হিজরি চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আলা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী (র.)’র দ্বীনি খিদমত ও সংস্কার কর্মসমূহ আরব অনারবসহ বিশ্বের খ্যাতিমান শীর্ষ উলামা মাশায়েখ কর্তৃক স্বীকৃত। ২৫ সফর ১৩৪০ হিজরিতে তিনি ওফাত বরণ করেন। তিনি আজীবন কুরআন সুন্নাহর আলোকে মুসলিম মিল্লাতকে সঠিক পথের দিশা দেন, পক্ষান্তরে খারেজী, রাফেজী, শিয়া, কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের কুফরি আক্বিদা ও প্রচলিত বিদআত সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক করেন। [হায়াতে আ’লা হযরত ২য় খন্ড, পৃ: ১০১-১০৮ কৃত: আল্লামা জুফরুদ্দীন বিহারী (র.)]
মুজাদ্দিদের সংস্কার কর্ম: একজন মুজাদ্দিদ হিসেবে আ’লা হযরতের সংস্কার কর্মের পরিধি ছিল ব্যাপক ও বিস্তৃত, মুসলিম সমাজে বিরাজমান বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ কুসংস্কার ও অপসংকৃতির মূলোৎপাটনে আ’লা হযরতের ভূামকা ছিল অনন্য। ধর্মীয় চিন্তা চেতনায় তাঁর সংস্কার ও সংশোধনমূলক কার্যাদি তাঁকে একজন সফল সংস্কারকের মর্যাদায় উন্নীত করেছে। নিম্নে তাঁর কতিপয় সংস্কার কর্ম আলোকপাত হলো।
আল্লাহ ছাড়া কাউকে সিজদা করা হারাম : সাধারণত: দেখা যায় অনেক মুসলমান আউলিয়ায়ে কেরাম ও বুজুর্গানে দ্বীনের মাজারে বা পীরের দরবারে পীরকে তাজিমী সিজদা করে থাকে। যা কুরআন হাদীসের আলোকে ফকীহগণের সর্বসম্মত মতানুসারে সম্পূর্ণরূপে হারাম হারাম হারাম। এ বিষয়ে মুজাদ্দিদ আ’লা হযরত শরীয়তের অকাট্য দলীল প্রমানাদির ভিত্তিতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা হারাম সম্পর্কিত “আযযুবদাতুয যাকীয়্যাহ লেতাহরীমে সূজুদিত তাহীয়্যাহ” নামক একটি নির্ভরযোগ্য কিতাব রচনা করেন।
প্রচলিত ওরস ফাতেহা প্রসঙ্গ : মুসলিম সমাজে আবহমান কাল থেকে ঈসালে সওয়াব, ওরস ফাতেহা কুলখানি চেহলাম ইত্যাদি অনুষ্ঠানের প্রচলন রয়েছে। যার বৈধতা ও উপকারিতা স্বীকৃত। তবে দু:খজনক হলেও সত্য যে উপমহাদেশে এসব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যে সব হারাম ও শরীয়ত বিরোধী কর্মকান্ড অনুপ্রবেশ ঘটেছে ও সমাজে বিস্তার লাভ করেছে। যেমন নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা, নাচগান, হাউজী মেলার আসর এসব গর্হিত কর্মকান্ড, ঘৃণিত কার্যকলাপ ইসলামের আদর্শ ও শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। মুজাদ্দিদ আ’লা হযরত ওই সবের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এ বিষয়ে “আল হুজ্জাতুল ফায়ীহা লিতীবীত তা’য়ীন ফাতিহা” নামক একটি প্রামাণ্য কিতাব রচনা করেন। এতে ওরস ফাতেহার শরয়ী নিয়ম নীতি ও বিধিমালা উল্লেখ করেছেন। (সাওয়ানেহে আ’লা হযরত)
মহিলাদের মাযার গমন প্রসঙ্গে : আধুনিক যুগে নারী সমাজ হিজাব তথা পর্দা প্রথাকে প্রগতি ও স্বাধীনতার অন্তরায় মনে করে। উন্মুক্তভাবে বেপরওয়া লাগামহীন চলাফেরা ও অবাধ বিচরণ করাকে স্বাধীনতা মনে করে। ইসলামী শরিয়তে নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশা, মুহ্‌রিম নয় এমন ব্যক্তির সামনে আসা যাওয়া, মৃত ব্যক্তির গৃহে একত্রিত হয়ে পানাহার করা, কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মহিলাদের কবরস্থানে গমন করা নিষেধ। দুঃখজনক হলেও বাস্তব সত্য যে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার কর্তৃপক্ষ শরীয়তের বিধিমালা উপেক্ষা করে মাজারে নারী যাতায়তের জন্য কত যে ব্যবস্থাপনা করে রেখেছে তার ইয়াত্তা নেই। নারী আগমনের প্রতি কোন নিষেধাজ্ঞা তো আরোপ করা হচ্ছেই না বরঞ্চ তারা মহিলাদের নিকট থেকে হাদিয়া-নযরানা সংগ্রহের জন্য তারা সদা তৎপর। মাজারে মহিলা গমনাগমনের ভয়াবহতা ও করুণ পরিণতির কত সংবাদ আমরা সংবাদপত্রে প্রত্যক্ষ করেছি এবং বহু অপরাধ জনিত কার্যকলাপের সংবাদও আমাদেরকে মর্মাহত করেছে। এতে একদিকে আউলিয়ায়ে কেরামের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রমাণিত হয়, অপরদিকে অলীবিদ্বেষী বাতিলপন্থীদের পক্ষে সমালোচনার দ্বার উন্মোচন হয়। এ ব্যাপারে আলেমসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে এবং এ সবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে মাজার কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসলে মাজারের পবিত্রতা রক্ষা হবে। জেয়ারতের উদ্দেশ্যে নারীদের মাজারে গমনের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত আ’লা হযরতের প্রামান্য গ্রন্থ “জামলুন নূর ফী নাহ্‌য়িন নিসায়ী আন যিয়ারাতিল কুবুর”। অবশ্য প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর রওজা মোবারক জিয়ারত করার বিধান এ নিষেধাজ্ঞার বহির্ভুত। যেহেতু এক্ষেত্রে নারীপুরুষ সকলের জন্য শরীয়তের সীমারেখায় থেকে প্রিয় নবীর রওজা মোবারক জিয়ারত করার বৈধতা বিশুদ্ধ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। (আনোয়ারুল বয়ান, ১ম খন্ড)
পর্দাবিহীন পীরের কাছে গমন প্রসঙ্গে: পীর-মুর্শিদের কাছে পর্দাহীনভাবে যাতায়াত করা শরীয়ত পরিপন্থী ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ। আ’লা হযরত এসবের কঠোর বিরোধিতা করেন। আ’লা হযরতের মতে পীর থেকেও মহিলা মুরীদের পর্দা করা ওয়াজিব। এ বিষয়ে আ’লা হযরত “মারূজুন নাজা লেখুরুজিন নিসা” নামে প্রামাণ্য পুস্তক রচনা করেন। আ’লা হযরতের ভক্ত-অনুসারী দাবীদার অনেক সুন্নী নামধারী পীর-মাশায়েখদের খানকাহ বা আস্তানায় পর্দাবিহীনভাবে শরয়ী নিয়মনীতি উপেক্ষা করে মহিলাদের বেপরওয়াভাবে বিচরণ করতে দেখা যায়। সত্যিকার তরীক্বতপন্থী সুন্নী মুসলমানদেরকে তরীক্বতের আদব রক্ষা ও অউলিয়ায়ে কেরামের মর্যাদা অনুধাবন ও রুহানী ফয়েজ বরকত অর্জনে কুরআন সুন্নাহর আদর্শ অনুসরণ ও শরয়ী নিয়মনীতি পালনে সচেষ্ট হতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর পূণ্যাত্ন প্রিয় বান্দা মহামনিষী মুজাদ্দিদগণের অনুসৃত আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক নসীব করুন। আমীন।
লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম, খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।
মুহাম্মদ এরশাদুল আলম কাদেরী
খাগরিয়া, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।