জুম’আর খুতবা

বিষয়:ইসলাম ওসীলা প্রসঙ্গ

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজবি

শুক্রবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৬:১৫ পূর্বাহ্ণ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁর অবাধ্য হতে নিষেধ করেছেন। মুমীনদেরকে সম্মানিত নবী রাসূল, শোহাদায়ে কেরাম ও পূন আউলিয়ায়ে কেরামের ওসীলা অবলম্বন করে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করার শিক্ষা দিয়েছেন। মহান আল্লাহর প্রশংসা করছি, তাঁরই সমীপে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে সুপথপ্রাপ্ত সফলকাম মকবুল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক অদ্বিতীয়, তাঁর কোন অংশীদার নেই, যিনি জীবন ও মরণ দান করেন, তিনি চিরন্তন শাশ্বত। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আমাদের সর্দ্দার, মহান নবী, আমাদের অভিভাবক, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় বান্দা ও প্রিয় রাসূল। যিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলের প্রতি সর্বোত্তম নিয়ামত ও সর্বশ্রেষ্ঠ ওসীলা হিসেবে প্রেরিত। তাঁর ওপর দরুদ-সালাম বর্ষিত হোক, তাঁর পবিত্র বংশধরগণ, সম্মানিত সাহাবাগণ, কিয়ামত অবধি নিষ্ঠার সাথে তাঁর পদাঙ্ক অনুসারীদের প্রতি অসংখ্য করুণাধারা বর্ষিত হোক।
সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা! আল্লাহতা’য়ালাকে ভয় করুন, তাঁর নির্দেশ পালন করুন, জেনে রাখুন! ওসীলা তথা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মাধ্যম অবলম্বন করার নাম ওসীলা। কুরআন সুন্নাহর অকাট্য প্রমাণাদি ও মুজতাহিদ ইমাম ও ফকীহগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ওসীলা জায়েজ ও শরীয়ত সম্মত। যেমন ইবাদত, নেক আমল, কুরআন মজীদ তিলাওয়াত ও নফল ইবাদত ইত্যাদি আল্লাহর রেজামন্দি অর্জনের ওসীলা। অন্যদিকে সম্মানিত নবী রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম, আউলিয়ায়ে কেরামের ওসীলা নিয়ে প্রার্থনা করা শরীয়ত সম্মত প্রমাণিত বিষয়। এ বিষয়ে বিতর্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা নিছক অজ্ঞতার পরিচায়ক। “আল্লামা ইবনুল আসীর এর বর্ণনা মতে “ওসীলা” হচ্ছে যার দ্বারা কারো নিকট পৌছা যায় এবং নৈকট্য লাভ করা যায়। আল্লামা জুরজানী (রা.)’র মতে যার দ্বারা অন্যের নৈকট্য লাভ করা যায় তাকে ওসীলা বলা হয়। প্রখ্যাত তাফসীরকার আল্লামা যামাখশারী বলেন, কোন মাধ্যমে আল্লাহতা’য়ালার নৈকট্য অর্জন তথা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছাকে ওসীলা বলা হয়।
পবিত্র কুরআনের আলোকে ওসীলা: জেনে রাখুন! নেক আমল ও নেক বান্দাদের ওসীলা গ্রহণ বৈধতার ওপর ওলামায়ে কেরামের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত। নেক আমল ও পুণ্যাত্ম বান্দাগণ যথাক্রমে সম্মানিত আম্বিয়ায়ে কেরাম, সাহাবায়ে কেরাম, আউলিয়ায়ে কেরাম, মযহাবের ইমাম ও তরীকতের ইমামগণের ওসীলা নিয়ে আল্লাহর দরবারে দুআ করা সম্পূর্ণরূপে জায়েজ। ইসলামের সঠিক রূপরেখা আহ্‌লে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আক্বিদা মতে এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। ওসীলার বিধান সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “ হে মু’মিনগণ আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর দিকে ওসীলা অন্বেষণ করো।” (সূরা: মা-ইদাহ, আয়াত: ৩৫)
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে রুহুল বয়ানে উল্লেখ করা হয়েছে, “ওসীলা ব্যতীত আল্লাহ তা’য়ালার নৈকট্য অর্জন করা যায় না।” ওসীলায় বিশ্বাসী মুত্তাকী পরহেজগার বান্দারা হচ্ছেন হিদায়ত প্রাপ্ত ও সঠিক পথের অনুসারী। ঈমান, আক্বিদার হিফাজতের জন্য সম্মানিত নবী রাসূলগণের ওসীলা আবলম্বন, কামিল পীর মুর্শিদের পদাঙ্ক অনুসরণ অপরিহার্য। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “আল্লাহ পাক যাকে হিদায়ত করেন সে হিদায়ত পায় এবং যাকে পথভ্রষ্ট করেন তার জন্য কোন ওলী (কামিল) মুর্শিদ পাবেনা।” (সূরা: কাহাফ, আয়াত: ১৭)
নবীজির ওসীলা ও ক্ষমা প্রার্থনা দ্বারা আযাব রহিত হয়: আল্লাহ তায়ালা কখনো তাদেরকে আযাব দিবেন না যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন। তাছাড়া তারা যতক্ষণ ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে আল্লাহ কখনো তাদের ওপর আযাব দেবেন না। (সূরা: আনফাল, আয়াত: ৩৩)
আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র সত্তা আল্লাহর আযাব থেকে পরিত্রাণের ওসীলা। আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করা শান্তি ও নিরাপত্তা লাভের ওসীলা।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ওসীলা গ্রহণ করা: সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ, ওসীলা ও শাফায়াত সংক্রান্ত আক্বিদা কুরআন সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত মুজতাহিদ ইমামগণের বর্ণনামতে নবীজি পৃথিবীতে শুভাগমনের পূর্বে বা পরে ইহকালে তাঁর পবিত্র জীবদ্দশায় ও তাঁর ওফাত পরবর্তী তাঁকে ওসীলা মনে করা ইসলামী শরীয়তের অকাট্য নির্ভরযোগ্য দলিল সমূহ দ্বারা প্রমাণিত।
হাদীস শরীফের আলোকে ওসীলা: নবীজির শুভাগমনের পূর্বে তাঁর ওসীলা নিয়ে দুআ করা সম্মানিত আম্বিয়া কেরাম আলাইহিস সালাম ও আউলিয়ায়ে কেরামের ওসীলা অবলম্বন ইহকাল-পরকালে সৌভাগ্য ও সফলতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যেমন আমাদের আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওসীলা নিয়ে দুআ করেছেন। আমিরুল মুমেনীন হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আদম আলাইহিস সালাম বললেন, হে প্রতিপালক প্রভু। আমি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওসীলায় দুআ করছি আমাকে ক্ষমা করুন। আল্লাহ তা’য়ালা বললেন, তুমি মুহাম্মদকে কী করে চিনলে? আমি এখনো তাঁকে সৃষ্টি করেনি। আদম (আ:) বললেন, আপনি যখন আমাকে আপনার নিজ হাতে সৃষ্টি করার পর আমার মধ্যে রূহ মোবারক ফুৎকার করলেন আমি আমার মস্তক উত্তোলন করলাম এবং আরশে আজীমের পায়ায় দেখতে পেলাম লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলাল্লাহ। আমি বুঝলাম যার নাম আপনার নামের সাথে সংযুক্ত রয়েছে তিনি অবশ্যই আপনার অধিক প্রিয় হবেন। আল্লাহ বললেন হে আদম! তুমি সত্যি বলেছো, নিশ্চয় তিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি। তাঁর ওসীলা নিয়ে দুআ কর আমি অবশ্যই তোমাকে ক্ষমা করব। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না হলে আমি তোমাকে সৃজন করতাম না। (মুস্তাদারক: ২/৬১৫পৃ:)
পূর্ববর্তী নবীদের ওসীলায় ক্ষমা প্রার্থনা করা: হযরত আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহুতায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, হযরত আলী (রা.)’র মাতা হযরত ফাতেমা বিনতে আসদ যখন মৃত্যু বরণ করলেন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কবর খনন করার আদেশ করলেন। অত:পর কবরে শায়িত করালেন এ দুআ করলেন “হে আল্লাহ! আমার মা ফাতেমা বিনতে আসদকে তোমার নবী এবং আমার পূর্ববর্তী নবীদের ওসীলায় ক্ষমা করে দিন এবং তাঁর কবরকে প্রশস্ত করে দিন। তুমি অসীম করুনাময়।” (ওয়াফাউল ওয়াফা: ৩/৮৯৩, বৈরুত)
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওসীলায় অন্ধসাহাবী দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে পান: হযরত ওসমান ইবন হানিফ (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক অন্ধ সাহাবী প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র দরবারে আসলেন, বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দুআ করুন। তিনি যেন আমাকে সুস্থতা দান করেন, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন আমার অযুর পাত্র নিয়ে এসো। এটি দিয়ে অযু কর আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে দু’রাকাত নামায আদায় কর। হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করি এবং তোমার নবীজি রহমতের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ওসীলা পেশ করছি। হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি আপনার ওসীলায় আপনার প্রভূর দিকে মনোনিবেশ করছি। তিনি যেন আমার চক্ষুর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। হে আল্লাহ! তুমি তোমার নবীর সুপারিশ আমার পক্ষে কবুল কর। হযরত ওসমান ইবন হানিফ (রা.) বলেন আল্লাহর শপথ আমরা এখনো মজলিস থেকে উঠে যাইনি এবং আমাদের কথাও সমাপ্ত হয়নি, সে সাহাবী সুস্থ চক্ষু নিয়ে প্রবেশ করলেন। মনে হল যেন তাঁর চক্ষুতে কোন রোগ ব্যাধি ছিলনা। (মুস্তাদরিক লিল হাকিম, হাদীস নং ৫২৪, মসনদে আহমদ ইবন হাম্বল ২/১৬৮)
প্রিয় নবীজির ও সাহাবায়ে কেরামের ওসীলায় বৃষ্টিপাত: হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালাা আনহু থেকে বর্ণিত, যখন অনাবৃষ্টির কারণে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হত তখন হযরত ওমর ইবন খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু হযরত আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তলিব (রা.) কে ওসীলা করে আল্লাহর দরবারে বৃষ্টির প্রার্থনা করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ আমরা তোমার দরবারে তোমরা রাসূলের ওসীলা গ্রহণ করতাম এখন আমরা তোমার দরবারে রাসূলের চাচা হযরত আব্বাস (রা.) কে ওসীলা করলাম আমাদেরকে বৃষ্টি দান কর বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রা.) বলেন অত:পর তাদেরকে বৃষ্টি দান করা হয়। (সহীহ বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৯৬৪)
উপরোক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়াও রাসূলের সাহাবীর ওসীলা গ্রহণের বৈধতা প্রমানিত হল।
ইমাম মালেক (রা.) কর্তৃক আব্বাসী খলিফাকে রওজা মোবারকমুখী হয়ে নবীজির ওসীলা নিয়ে মুনাজাত করার বর্ণনা: হযরত ইমাম কাযী আয়াজ মালেকী (রা.) বর্ণনা করেন, আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মনসুর নবীজির রওজা মোবারক যিয়ারতে গেলেন ইমাম মালেক (রা.) সাথে ছিলেন, খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, আমি দুআ করার সময় কি কিবলামূখী হব, নাকি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা মোবারকের দিকে হয়ে দুআ করব? ইমাম মালেক উত্তর দিলেন আপনি স্বীয় চেহারা নবীজির দিক থেকে কেন ফিরাবেন? তিনি তো আপনার এবং আপনার পিতা হযরত আদম (আ:)’র জন্য আল্লাহর প্রতি ওসীলা বরং তাঁর দিকে চেহারা করুন। তাঁর শাফায়াত প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর শাফায়ত অবশ্যই কবুল করবেন। (শিফা শরীফ)
হে সম্মানিত মহামহিম আল্লাহ! আপনি স্বীয় দয়া রহমত ও অনুগ্রহে আমাদের প্রার্থনা কবুল করুন। আপনার প্রিয় হাবীব প্রিয় নবী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র ওসীলায় আমাদের দুআ কবুল করুন। হে বিশ্ব জগতের প্রতিপালক! আমাদের সকলকে কুরআনের বরকত দান করুন। পবিত্র কুরআনের আয়াত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দ্বারা আমাদের নাজাত দান করুন। নিশ্চয়ই তিনি মহান দানশীল, সৃষ্টি জগতের মালিক, পুন্যময়, অনুগ্রহশীল ও দয়ালু। আমীন।
লেখক: খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

x