গ্যাসের সংকট, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জেরবার জীবন। এরইমধ্যে বিদ্যুতের বিকল্প উৎস বাড়াতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে বিশেষ প্রণোদনা দিয়েছে সরকার। ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আগামী বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রথমে নিজের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা যাবে। এরপর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা করে পাবেন গ্রাহক। এ সুবিধা ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে, ছাদে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ বসান, নিজের যা লাগে ব্যবহার করুন, উদ্বৃত্তটা জাতীয় গ্রিডে দিন, প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাবেন। টাকা যাবে ব্যাংক হিসাবে, তিন মাস পর পর। ব্যাটারিসহ ছাদের সৌরবিদ্যুৎ বানাতে খরচ প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা। এর ওপর ২০ শতাংশ মুনাফা আর ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে দাম হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। কেউ যদি ওই ৮ টাকার চেয়ে কম খরচে সিস্টেম বসাতে পারেন, তাহলে যে টাকা বাঁচল সেটা তাঁরই লভ্যাংশ। মানে দরদাম করে, ভালো ইনস্টলার বেছে খরচ কমাতে পারলে পুরো লাভটাই গ্রাহকের।
৭ বছর আগে ভিয়েতনামের মানুষ প্রায় একই রকম একটা ঘোষণা পেয়েছিল। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ভিয়েতনাম সরকার ঘোষণা দিল, ছাদের সৌরবিদ্যুৎ ২০ বছর ধরে ৮–৯ সেন্টে কিনবে। আজকের টাকায় সেটা প্রায় ১০ টাকা, বাংলাদেশ এখন যা দিচ্ছে তার কাছাকাছি। উক্ত ঘোষণার পর ভিয়েতনামের দোকানদার থেকে কারখানা মালিক, অফিস থেকে আবাসিক সবাই ছাদে প্যানেল তুলতে লাগল। এক বছরে যুক্ত হলো সাড়ে ৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা। দুই বছরে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। মানুষ এগিয়ে এসেছিল কারণ হিসাবটা সোজা ছিল। রোদ ফ্রি, প্যানেল একবার কিনলে ২৫ বছর চলে, আর সরকার লিখিত দিয়েছে কত টাকায় কিনবে, কত বছর কিনবে। ভিয়েতনাম ২০২৫–২৬ সালে নিয়ম নতুন করে সাজিয়েছে। আগে নিজে ব্যবহার, পরে বাড়তিটা বিক্রি। গ্রিডে পাঠানোর সীমা প্রথমে ছিল মাসিক উৎপাদনের ২০ শতাংশ, জুন ২০২৬ থেকে ৫০ শতাংশ, আর যেখানে স্থানীয় গ্রিডের সামর্থ্য আছে সেখানে আরও বেশি। সঙ্গে চলছে তার আর সাবস্টেশনের কাজ। মানুষ এই নিয়মে ফিরেছে। ২০২৫ সালে ৬ হাজার নতুন গ্রাহক ১ হাজার মেগাওয়াট বসিয়েছেন, শুধু ২০২৬–এর জুলাই মাসেই উত্তর ভিয়েতনামে যুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯৮১ জন। ভিয়েতনাম ২০২৬ সালে লক্ষ্য ধরেছে, ১০ শতাংশ সরকারি দপ্তর আর ১০ শতাংশ পরিবারের ছাদে সৌর। হ্যানয় বাসাবাড়ির ব্যাটারিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। বাংলাদেশের সবাই মিলে চেষ্টা করলে দেশেও এরকম অবশ্যই সম্ভব। সব ছাদে রোদ পড়ছে, সে রোদের সঙ্গে এক মাসের তেলের বিলের সমপরিমাণ টাকা একটু একটু করে কাজে লাগিয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভব, সেই হিসাব, সেই সম্ভাবনা ক্রমেই টেকসই হচ্ছে।
সমপ্রতি তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে, জাপানে ছাদের সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশটির ৮৫ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। গবেষণায় বলা হয়, যদি দেশের অধিকাংশ ছাদে সৌর প্যানেল বসানো হয় এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিগুলো ঘরোয়া বিদ্যুৎ সঞ্চয় ও ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হয়, তাহলে জাপানের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বিশাল অংশ এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই পূরণ করা যাবে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানির পথে বড় অগ্রগতি সম্ভব। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী অ্যাপ্লাইড এনার্জিুতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, যদি দেশের ৭০ শতাংশ ছাদ সৌর প্যানেলে আচ্ছাদিত হয় এবং প্রতিটি ইভি ব্যাটারির গড় ৪০ কিলোওয়াট–ঘণ্টা ধারণক্ষমতার অর্ধেক অংশ বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে এই সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে জাপান তার বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারবে।
বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম বড় বাধা জ্বালানি সংকট। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এলএনজি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। পাশাপাশি কয়লা ও জ্বালানি তেল সরবরাহে চাপ থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বৈচিত্র্যময় করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দিনের বেলায় বাড়ি, অফিস, দোকান ও কারখানার নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে। বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে সংকটের সময় সেটিও কাজে লাগবে।
বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশে জমির সংকট রয়েছে। বড় প্রকল্পের জন্য বিপুল জমি প্রয়োজন হয়। কৃষিজমি ব্যবহার নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। এ কারণে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের অব্যবহৃত ছাদ কাজে লাগানোর ওপর জোর দেয়া দরকার। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করতে হয় না। যে ভবনে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, সেখানেই উৎপাদন করা যায়।
বাংলাদেশে ছাদ ব্যবহার করে ২ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা সম্ভব। আর এটি করা গেলে বছরে ১১ হাজার ৩২ কোটি টাকা (১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সাশ্রয় করতে পারবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)। এতে বলা হয়, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও এর সরবরাহ ব্যাহত হয়। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের অর্থনৈতিক সুবিধা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ সৌরশক্তি আহরণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সম্ভাবনাময় একটি দেশ। দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রতি বর্গমিটারে গড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৫ থেকে পাঁচ কিলোওয়াট–ঘণ্টা সৌর বিকিরণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রকৃতি প্রতিদিন আমাদের ছাদে বিপুল পরিমাণ শক্তি বিনা মূল্যে সরবরাহ করছে। এই শক্তির সামান্য অংশও যদি কার্যকরভাবে বিদ্যুতে রূপান্তর করা যায়, তবে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষ কওে, শহরাঞ্চলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত জমি পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। অথচ শিল্পকারখানা, বিপণিবিতান, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আবাসিক ভবনগুলোর বিপুল পরিমাণ ছাদ এখনো অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। এই অব্যবহৃত ছাদগুলোই ভবিষ্যতে দেশের বৃহত্তম বিকেন্দ্রীভূত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপ নিতে পারে।
ছাদভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবেশগত সুবিধাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতিটি অতিরিক্ত কিলোওয়াট জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এবং কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাসে অবদান রাখে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়; বরং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকার নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি শক্তিশালী প্রতীক এবং দেশবাসীর প্রতি একটি সুস্পষ্ট বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে যে সূর্যালোক আমাদের ভবনগুলোর ছাদে অপচয় হয়ে তাপ হিসেবে ফিরে গেছে, সেই একই সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সুযোগ কেবল সরকারি প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়; বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আবাসিক ভবন–সবার জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। আমাদের সামনে থাকা এই বিশাল সম্ভাবনাকে কতটা কার্যকরভাবে লাগানো যাচ্ছে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: উপ–পরিচালক (জনসংযোগ), চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)












