চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের ৬৫ শতাংশই জুলাই মাসে

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু মোকাবেলায় সরকারি হাসপাতালে আলাদা ডেঙ্গু ব্লক ম রোগী বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলছে স্বাস্থ্য বিভাগ ।। নাগরিকদের সচেতনতার ওপর জোর ।। উপজেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তে শীর্ষে সীতাকুণ্ড-কর্ণফুলী

জাহেদুল কবির | বৃহস্পতিবার , ৩০ জুলাই, ২০২৬ at ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। চলতি বছর মোট ডেঙ্গুর মধ্যে ৬৫ শতাংশই আক্রান্ত হয়েছে চলতি জুলাইয়ে। এছাড়া মৃত্যু হয়েছে দুইজনের। এর আগের ছয় মাসে মৃত্যু হয়েছে একজনের। গতকাল পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৮০২ জন। তবে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৩ জন। উপজেলার মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীর সংলগ্ন সীতাকুণ্ডে আক্রান্তের হার বেশি। এছাড়া ডেঙ্গু বাড়ছে কর্ণফুলী, লোহাগাড়া ও রাউজানেও।

চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বাড়লেও সেটি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবেলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে আলাদা ডেঙ্গু ব্লক করা হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামে বর্তমানে কখনো মাঝারি ও কখনো থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিভিন্ন জায়গায় স্বচ্ছ পানি জমছে। বিশেষ করে ফুলের টব ও ডাবের খোসা, গাড়ির টায়ারসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত বস্তুতে পানি জমার কারণে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা প্রজননে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। এতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীও বাড়ছে। তাই সবাইকে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখাসহ কোথাও যাতে তিনদিনের বেশি পানি না জমে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। এছাড়া রাতে ছাড়াও দিনেরও বেলায়ও মশারি টানাতে হবে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারীতে আক্রান্ত হয় ২২ জন এবং মারা যান ১ জন, মার্চে আক্রান্ত হয় ২০ জন, এপ্রিলে আক্রান্ত হয় ২৯ জন, মে মাসে ৩৭ জন এবং জুন মাসে আক্রান্ত হয় ১২২ জন এবং চলতি জুলাইয়ে গতকাল পর্যন্ত আক্রান্ত হয় ৫০৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২ জনের। এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৩১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে ১৭ জন পুরুষ, ১০ জন নারী এবং ৪ জন শিশু রয়েছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১২ জন, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৬ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৩ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে ২ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৮ জন।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু রোগীর মূল চিকিৎসা হচ্ছে ফ্লুইড ম্যানেজম্যান্ট। অনেক রোগী এনএসওয়ান রিপোর্ট হওয়ার সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যাচ্ছেন। এটি আসলে কোনো দরকার নাই। ডেঙ্গুর প্ল্যাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে তখন ইন্টারনাল ব্লিডিং শুরু হয়। তখন ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজম্যান্টের প্রয়োজন পড়ে। আবার প্ল্যাটিলেট কমা শুরু হয় জ্বর কমে যাওয়ার পর পর। তখন শারীরিক কিছু অসুবিধা দেখা দেয়। ওই সময় হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্ল্যাটিলেট নিয়ে আতঙ্ক লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আসলে প্ল্যাটিলেট যখন বাড়া শুরু হয় তখন দ্রুতই বাড়ে। কাজেই ডেঙ্গু জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন দৈনিক আজাদীকে বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে। আমাদের হাসপাতালের ১৬ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের একাংশে ৫০ বেডের আলাদা ডেঙ্গু ব্লক করেছি। আশা করছি, বেডের সংখ্যা আর বাড়াতে হবে না। ডেঙ্গু মোকাবেলায় যেহেতু আমাদের অভিজ্ঞতা আছে, সুতরাং চিকিৎসা নিয়ে রোগীদের কোনো ভোগান্তি হবে না।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. জাহাঙ্গীর আলম আজাদীকে বলেন, ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমরা তৎপর আছি। চট্টগ্রামের সবগুলো উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার বিষয়ে নির্র্দেশনা দেয়া আছে। ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে এটি ঠিক, তবে সেটি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। এখন যেহেতু বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে, তাই নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। তিনদিনের বেশি যাতে কোথাও পানি জমে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তবে আমাদের যেহেতু ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা আছে, তাই ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবেলা করা আমাদের জন্য সহজ বলা যায়। আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। এছাড়া মশক নিধনে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এদিকে চট্টগ্রাম নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে জরিপ চালিয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা পেয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ গুণ বেশি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শীর্ষক জরিপটি পরিচালনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম দপ্তরের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল ৮ জুন থেকে ২০ জুন এই জরিপ পরিচালনা করে। তারা গত ২৪ জুন এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে জমা দেয়। জরিপে কন্টেনার ইনডেঙে ভিন্ন ধরণের পাত্রে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতির হার পাওয়া গেছে ৩৩ শতাংশের বেশি। জরিপে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে জরিপকারী দল। অন্যদিকে নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেগুলো হল১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ, ২ নম্বর জালালাবাদ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা এবং ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ির মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে, অর্থাৎ প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে এইডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। এসব লার্ভার মধ্যে ৮০ শতাংশ এইডিস ইজিপটাই এবং বাকি ২০ শতাংশ এডিস অ্যালবোপিকটাস ধরণের। জরিপকারী দল এডিস মশার বিস্তার প্রতিরোধে চারটি সুপারিশ করেছে। এরমধ্যে আছেবাড়িঘর ও কর্মস্থান পরিষ্কার রাখা, সব ধরনের প্লাস্টিক কন্টেনার অপসারণ, সুউচ্চ ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড ও নির্মাণাধীন ভবনে নজরদারি, লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইডের সময়োপযোগী প্রয়োগ এবং মশা নিধনে কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ।

উল্লেখ্য, গত বছর ২০২৫ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মারা যান ২৭ জন। এছাড়া ২০২৪ সালে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হয়েছিল ১৪ হাজার ৮৭ জন। এরমধ্যে মারা যায় ১০৭ জন এবং ২০২২ সালে মোট আক্রান্ত ৫ হাজার ৪৪৫ জনের মধ্যে মারা যান ৪১ জন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বেড়েছে লোডশেডিং
পরবর্তী নিবন্ধকখনো পার্টনার, কখনো লভ্যাংশের প্রলোভন