আমাদের আবেগ যখন চেতনায় শাণিত হয় তখন উপযুক্ত ও যোগ্য নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। ‘এরপর আমাদের আবেগের জল পাত্রে নিয়ে রাজনীতি হয়েছে মাত্র। এ রাজনীতি শূন্য গোয়াল ঘরে সোনার হরিণের জন্ম দিয়েছে, খালি বকস–এ হাজার কোটি টাকা ভর্তি হয়েছে। আঙ্গুল ফুলে হয়েছে কলাগাছ। বাইশ পরিবারের স্থলে বাইশ হাজার পরিবারের জন্ম হয়েছে। আর দেশ হয়েছে তলাবিহীন ঝুড়ি। এ জন্য আজকাল বুঝা দায়, আসলে আমাদের রাজনীতির সংস্কৃতি কি? রাজনীতি মানে যেখানে প্রজাদের মঙ্গল, দেশের উন্নয়ন, সে রাজনীতি ঠকবাজি, চালবাজি, চুরি, ডাকাতি, দুর্নীতি, সন্ত্রাস–জঙ্গীবাদ আর দলবাজির মাধ্যমে ‘ভালো কাজে বাধা অসৎ কাজে সাড়া‘ নীতিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
রাজনীতিবিদদের চল–চাতুরী ও কূট–কৌশলে এক ধরনের বঞ্চনা ও উপেক্ষার মধ্যে দিনাতিপাত করছে ঐতিহাসিক কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড়ের মানুষগুলো। তারা এবং তাদের ভূমি অনেক জায়গায় ঐতিহ্য হয়ে ইতিহাসে ঠাঁই করে আছে। তারা কর্ণফুলীর তরঙ্গের ছন্দময় আওয়াজ শুনতে পায়। জাহাজের বজ্রঘণ্টা তাদের এখনও হয়তো ঘুম ভাঙায়, ওপারের ডিঙির মিটিমিটি বাতি আর প্রাসাদতুল্য অট্টালিকার চূড়া এপারের কিশোর, যুবা–বৃদ্ধিরা দেখে পুলকিত হয়। ওপারের শিশু–কিশোর, তরুণ–তরুণী স্বচ্ছ–সুন্দর কাপড় পরে স্কুলে যায়, যায় কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সাইবার ক্যাফে। আর এপারের পড়শীরা ঐ বয়সে যায় নদীতে মাছ ধরতে। ক্ষেতে ধান রুখতে। কর্ণফুলীর শাহ্ আমানত সেতুর উত্তরপাড় শহর, যেখানে গড়ে উঠেছে হাইরাইজ ভবন, অফিস–আদালত, স্কুল–কলেজ, ইউনির্ভাসিটি আর দক্ষিণ পাড় অজপাড়া গাঁ যেখানে নেই বড় দালান, নেই শিক্ষা সুযোগ, নেই বড় কোন ইউনির্ভাসিটি, হাসপাতাল। ভাবতে অবাক লাগে। পৃথিবীর কোন দেশে এমন চিত্র আছে কি না সন্দেহ। মোঘল পাসাদ দিল্লী হলেও যমুনার তীরকে সৌন্দর্যের রানিতে পরিণত করছিল মোঘলরা। এখানে গড়ে তুলেছিল শহর আগ্রা আর তাজমহল, পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের নগরী। বুড়িগঙ্গার ওপারেও গড়ে উঠেছে ঢাকা নগর। পরিণত হয়েছে শিল্পাঞ্চল। ঐতিহ্যময় কোরবানীগঞ্জ শিল্প এলাকা। গড়ে উঠেছে আবাসিক।
কিন্তু কর্ণফুলীর ওপারে শিকলবাহা, কোলাগাঁও, চরলক্ষ্যা, চরপাথরঘাটা ও জুলধার খোয়াজনগর, ইছানগর, চরফরিদ, ডাঙ্গারচর, দ্বীপকালামোড়, লাখেররার ভগ্ন রাস্তা, আর শিল্প–সংস্কৃতির পশ্চাদপদতা দেখলে ইতিহাসও অভিসম্পাত দিবে। কারণ এসব অঞ্চল হাজার বছরের চট্টগ্রামের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় এসব অঞ্চলে কর্ণফুলীর হয়ে পর্যটক, ব্যবসায়ী, ধর্মপ্রচারকরা চট্টগ্রামে আসতেন। জাহাজ তৈরির জন্য ব্যবসায়ীরা শিকলবাহা ও কোলাগাঁওকে পছন্দ করতেন বেশি। আজ কিন্তু এসব অঞ্চলের অবস্থা দেখলে মনে হবে কত অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার এসব অঞ্চলের মানুষ। এছাড়া শহরতলীর পূর্ব–উত্তর দিকে বোয়ালখালী, কুয়াইশ–বুড়িশ্চর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাট, সলিমপুর এলাকার অবস্থাও একই। অথচ স্বাধীনতার পর থেকে এসব অঞ্চলের মানুষ ভোট দিয়েছে, নেতা বানিয়েছে, আশায় বুক বেঁধেছে। কিন্তু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি সেই ঝুলানো কলা এখনো ঝুলানোই আছে। এসব অঞ্চল ছিটমহলের ন্যায় ‘নয় ঘরকা নয় ঘটকা’।
প্রকৃতপক্ষে শহরের একদৃষ্টি পথের এ অবস্থা কোন সভ্য দেশে চলতে পারে না। আর শহরও তার সীমানায় দীর্ঘদিন স্থিতি থাকতে পারে না। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এখন আর চল্লিশ লাখ মানুষের বাস নয়; এটি পুরনো সংখ্যাতত্ত্ব। এখন সত্তর লাখেরও অধিক মানুষ মাত্র ষাট কিলোমিটার এলাকায় বাস করে। তার সাথে বাড়ছে আবাসন, যানবাহন, রাস্তাঘাট, শিল্প–কারখানা, ব্যবসা–বাণিজ্য। তাই একদিকে যেমন প্রয়োজন শহর সমপ্রসারণ, অন্যদিকে, শহরতলী এলাকা নগরে অন্তর্ভুক্ত না হলে নগরের শ্রীবৃদ্ধিও হবে না।
বর্তমান আধুনিক বিশ্ব শহরায়ন বা নগরায়ন আগেকার ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মফস্বলগুলোও শহরের আলো বাতাস পেতে চায়। ‘তাই দেখা যায়, অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা নেই। জনগণের জীবন তেমন মানসম্পন্ন নয়।’ কিন্তু পৌরসভা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক ফায়দা নেতার থলে ভর্তি হলেও উক্ত এলাকার উন্নয়ন ও জনগণের সামগ্রিক মানোন্নয়নের কথা অস্বীকার করা যায় না। সিটি কর্পোরেশন হলে কর দিতে হবে। তাই শহুরে হবো না, গ্রামেই থেকে যাবে এ ধারণা সনাতনী। আমরা জানি ২০০৮-‘০৯ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আলহাজ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সিটি কর্পোরেশন এলাকা সমপ্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছিল যা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত উদ্যোগ ছিল বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু রাজনীতিবিদদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে সেই উদ্যোগ মাটি হয়েছে।
আরো একটি বিষয় উল্লেখ না করলে নয়, নগরীর এ সমপ্রসারণ প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনা অনেক আগেই নেয়া হয়েছিল। ১৯৯৭ সালের প্রস্তাবনা অনুযায়ী ১৯৯৯ সালে সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দীন চৌধুরী স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের আশেপাশে ১৮টি ইউনিয়নকে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এনে ৬০ কিলোমিটার এলাকা বাড়িয়ে ১২০ কিলোমিটার এলাকায় উন্নীত করার জরিপ প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। ১৯৯৯ সালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তা গেজেট আকারে প্রকাশ করে। এ সময় উক্ত আঠারো ইউনিয়নের সর্বসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। সিটি কর্পোরেশনের এ উদ্যোগ যে জনগণের আবেগ ও ইচ্ছার প্রতিফলন তখন স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকগুলোতেও এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। ২০০৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের একটি দৈনিক ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় পরিধি দ্বিগুণ হচ্ছে; শিরোনামে প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার পরিধি দ্বিগুণ করা হচ্ছে। বর্তমান সিটি কর্পোরেশন এলাকার পাশ্ববর্তী পাঁচটি থানার ১৮টি ইউনিয়নকে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় মন্ত্রণালয় থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। ১৮ ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদেরকে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কমিশনার করা হবে বলে জানা গেছে। একই সাথে মহিলা মেম্বারদেরকে উন্নয়ন কাজে সম্পৃক্ত করা হবে বলে বলা হয়েছে।’
পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ব্যবসা–বাণিজ্য সমপ্রসারণের কথা বিবেচনা করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সিটি এলাকাকে আরো সমপ্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি অবকাঠামো উন্নয়নের আগে এলাকা থেকে পাঁচ বছর কর নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছিলেন। ওই সময় বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের ৬০ বর্গমাইল এলাকার সাথে আরো ৬০ বর্গমাইল এলাকা বাড়ানোর একটি জরিপ রিপোর্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ে জরিপ রিপোর্ট পাঠানোর পর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারীর মাধ্যমে গেজেটে প্রকাশ করা হয়। পরবর্তীতে রাজনৈতিক বিরোধ ও ইন্ধনের বেড়াজালে পড়ে সমপ্রসারিত এলাকার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানগণ সিটি কর্পোরেশনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে মামলা করলে তা স্থগিত হয়ে যায়।
তবে যারা এই উদ্যোগের বিরোধিতা করছেন তাঁরা কোন বলিষ্ঠ যুক্তি দেখাতে পারেনি। আমাদের মনে হয়, মেয়র আর ব্যক্তি মহিউদ্দিন বা রাজনীতিবিদ মহিউদ্দিনকে এক করে ফেলায় এ সব সমস্যার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু সমপ্রসারিত এলাকার মানুষের সামনে যে সুযোগ এসেছিল তার ফল ভোগ করতে পারতো অনাদিকাল, নগর সভ্যতার অংশীদার হয়ে। আমরা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বর্তমান মেয়র মহোদয় জনতার মেয়র হিসেবে ইতোমধ্যে পরিচয় লাভকারী, ডা. শাহাদাত হোসেন পুনরায় শহর সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা জানতে পারি। তিনি চট্টগ্রামে যে পরিমাণ চাপ বাড়ছে তা বাস্তবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন বলে আমাদের ধারণা। এছাড়া উত্তর–দক্ষিণের যেই অংশগুলোতে সম্প্রসারণের কথা বলা হচ্ছে তা এখন আরো বাস্তবতায় দৃশ্যমান, কারণ দাক্ষিণে কর্ণফুলী টানেলকে অর্থবহ করতে হলে ওই অঞ্চলকে অবশ্যই শহরাঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। উত্তরের অনন্যা আবাসিক, ওয়াসার প্রজেক্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সলিমপুর পর্যন্ত নগরের বাতাস বয়ে চলছে। সুতরাং এসব এলাকা নগরে সম্প্রসারণ সময়ের দাবি। এছাড়া চট্টগ্রাম শহরে যে হারে লোকসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে শিল্প, আবাসিক ও বাণিজ্য, সেই হারে এখনই শহর সমপ্রসারণ পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে নগরবাসীকে এর খেসারত দিতে হতে পারে ভবিষ্যতে।
ঢাকা যদিও রাজধানী, জনসংখ্যা অনুপাতে নগর পর্যালোচনা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ না হওয়ায় বসবাসযোগ্যতা হারাতে বসছে। আমরা আশা করছি, চট্টগ্রামে সময় থাকতে যথার্থ পরিকল্পনা নিতে পারলে এর সৌন্দর্য ও রূপ–লাবণ্য নিয়ে চিকে থাকবে। মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকা সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনার কথা ভাবছেন, তা যথার্থ সময়োপযোগী।
লেখক: কলেজ শিক্ষক, কলামিস্ট












