চট্টগ্রাম বিভাগে খাদ্যশস্যের রেকর্ড মজুদ

অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সংগ্রহ, আমদানি বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার

আজাদী প্রতিবেদন | শনিবার , ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ at ৫:৫৭ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম বিভাগে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি খাদ্যশস্যের মজুদ গড়ে উঠেছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ, আমদানি বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান সংরক্ষণ অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি। চট্টগ্রামের সরকারি গুদামগুলোতে খাদ্যশস্যের মজুদ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ১২ হাজার ৭৬৩ মেট্রিক টনে, যা নির্ধারিত ধারণক্ষমতার চেয়ে ৩৩ হাজার ৬৭৫ মেট্রিক টন বেশি। এটি চট্টগ্রামের খাদ্যশস্য মজুদের একটি রেকর্ড উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ধারণক্ষমতার বেশি খাদ্যশস্য মজুদ হওয়ায় এগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ, মান রক্ষা এবং সরবরাহ চেইন ঠিকভাবে ম্যানেজ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগে সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণের জন্য তিনটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগার (সিএসডি), ১০৬টি স্থানীয় সংরক্ষণাগার (এলএসডি) এবং চারটি আধুনিক সাইলো রয়েছে। এসব স্থাপনার মোট ধারণক্ষমতা ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৮৮ মেট্রিক টন। কিন্তু সম্প্রতি মজুদের পরিমাণ গিয়ে ঠেকে ৫ লাখ ১২ হাজার ৭৬৩ মেট্রিক টনে।

বন্দরকেন্দ্রিক আমদানি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ এবং পার্বত্য এলাকার খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা যুক্ত থাকায় চট্টগ্রাম বিভাগে মজুদের পরিমাণ বেড়ে গেছে বলে উল্লেখ করে সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম নগরীর পাশাপাশি খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির দুর্গম এলাকায় খাদ্য এসব সংরক্ষণাগার থেকে প্রেরণ করা হয়।

খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আমদানিকৃত চালের প্রায় ৬০ শতাংশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্দর দিয়ে খালাস হয়। ফলে আমদানি করা খাদ্যশস্য গ্রহণ, মজুদ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহের আগে এখানে মজুদ বেড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মজুদের রেকর্ড নেই।

আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম জেলায় সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ ছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার ৩৯২ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হালিশহর ও দেওয়ানহাটের দুটি কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগারে জমা রয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৭৪১ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। এ দুটি গুদামের সম্মিলিত কার্যকর ধারণক্ষমতা ১ লাখ ৬১ হাজার ৬৫২ মেট্রিক টন। ধারণক্ষমতার তুলনায় এখানে ৭১ হাজার ৮৯ মেট্রিক টন অতিরিক্ত খাদ্যশস্য রাখা হয়েছে। এছাড়া জেলার ১৫টি স্থানীয় সংরক্ষণাগারে মজুদ ছিল আরও ১৬ হাজার ৬৫১ মেট্রিক টন।

এমন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে সরকারি খাদ্যশস্য সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও এগিয়ে চলছে। পতেঙ্গায় ১ লাখ ১৪ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার একটি আধুনিক স্টিল সাইলো নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এটি চালু হলে খাদ্যশস্য সংরক্ষণের বিদ্যমান অবকাঠামোতে উল্লেখযোগ্য সংযোজন ঘটবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে আমদানি করা খাদ্যশস্য দ্রুত খালাস করে নিরাপদে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহের ক্ষেত্রে নতুন সাইলোর সক্ষমতা কাজে লাগানো যাবে।

সম্প্রতি খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম চট্টগ্রাম সফরে এসে খাদ্যশস্যের মজুদ ও ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি পতেঙ্গায় নির্মাণাধীন আধুনিক সাইলো এবং দেওয়ানহাট ও হালিশহরের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণাগার ঘুরে দেখেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দেন। ধারণক্ষমতার তুলনায় মজুদ বেশি থাকা অবস্থায় সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোর ব্যবহার এবং খাদ্যশস্যের মান বজায় রাখার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি এম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী সাংবাদিকদের বলেন, দেশের জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উৎস থেকে পর্যাপ্ত আপৎকালীন খাদ্য মজুদ গড়ে তুলছে।

কৃষি উৎপাদনের অনুকূল পরিস্থিতিও সরকারি খাদ্যশস্য সংগ্রহে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকা এবং রবি, আউশ ও আমন তিন মৌসুমে বাম্পার ফলন হওয়ায় দেশের কৃষি উৎপাদনের সূচকগুলো ইতিবাচক রয়েছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হওয়া দেশের জন্য একটি বড় অর্জন।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান এস এম নাজের হোসাইন বলেন, সরকারি খাদ্যশস্যের এই মজুদ স্বস্তিদায়ক। দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় কাজ। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য সহায়তা এবং দুর্যোগকালে জরুরি খাদ্য সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখতে এই মজুদ সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচকরিয়ায় বাস-ট্রাক সংঘর্ষ, নিহত দুই
পরবর্তী নিবন্ধঅনুমোদিত জনবলকাঠামোর৭২ শতাংশই শূন্য