সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে সব সূচকেই রেকর্ড সৃষ্টি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। কন্টেনার হ্যান্ডলিং করেছে ৩৫ লাখ টিইইউএসের বেশি, কার্গো হ্যান্ডলিং করেছে প্রায় ১৪ কোটি টন, জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে সাড়ে চার হাজারের কাছাকাছি। রাজস্ব আয় করেছে সাড়ে ছয় হাজার কোটিরও বেশি টাকা। জাহাজের অবস্থানকালসহ সার্বিক ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। ভঙ্গ করেছে প্রবৃদ্ধি অর্জনের রেকর্ডও। বৈশ্বিক সংকটের মাঝেও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এই অর্জনকে দক্ষ পরিচালনা এবং গতিশীল কার্যক্রমের সুফল বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে দেশের আমদানি রপ্তানি বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার এবং প্রধান সমুদ্রবন্দরে ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৩২ লাখ ৯৬ হাজার ৬৭ টিইইউএস। এক বছরের ব্যবধানে কন্টেনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫১ টিইইউএস। কন্টেনার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বন্দরের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।
খোলা পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রেও রেকর্ড সৃষ্টি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে খোলা পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ টন। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে হ্যান্ডলিং হয়েছিল ১৩ কোটি ৭ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৩ টন। এক বছরে খোলা পণ্য হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৭৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৩ মেট্রিক টন। খোলা পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৬টি। আগের ২০২৪–২৫ অর্থবছরে হ্যান্ডলিং হয়েছে ৪ হাজার ৭৭টি জাহাজ। এক বছরের ব্যবধানে ২৫৯টি জাহাজ বেশি হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে বন্দরের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
অপারেশনাল দক্ষতার অন্যতম সূচক হিসেবে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বা অবস্থানকাল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কন্টেনারবাহী জাহাজের গড় অবস্থানকাল ২ দশমিক ৫৮ দিন থেকে কমে ২ দশমিক ৩৮ দিনে নেমে এসেছে। ফলে জাহাজের অপেক্ষার সময় প্রায় ৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় কমাতে সহায়ক হয়েছে বলে বন্দরের কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।
আর্থিক সূচকেও চট্টগ্রাম বন্দর ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছানোর দাবি করেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় বেড়ে ৬ হাজার ৬২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে, যেখানে আগের অর্থবছরে তা ছিল ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। একই সময়ে রাজস্ব ব্যয় কমে ২ হাজার ২৭৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে রাজস্ব উদ্বৃত্ত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকায়। কর পরিশোধের পর নিট উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বলে গতকাল প্রকাশ করা বন্দর কর্তৃপক্ষের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টার্মিনাল ম্যানেজার দপ্তরের সরাসরি রাজস্ব আয়ও এক বছরে ২৬ দশমিক ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪০০ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ব্যয় ১৮ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনায় বন্দরের হাতে পুনঃবিনিয়োগের জন্য বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত অর্থ জমা হয়েছে।
চ্যানেলের নাব্যতা রক্ষায় ড্রেজিং কার্যক্রমেও ব্যয় সাশ্রয়ের নজির স্থাপন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ব্যয়ে প্রতি ঘনমিটার ড্রেজিং মাত্র ৩৭৫ টাকা ৬৭ পয়সায় সম্পন্ন করা হয়েছে। ৫ দশমিক ৩৫ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের জন্য মোট ব্যয় হয়েছে ২০ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর ফলে ড্রেজিং খাতে প্রায় ৪৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত ড্রেজিং কার্যক্রম নগরীর জলাবদ্ধতা হ্রাসেও ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভবিষ্যতে ড্রেজিং পরিকল্পনা ও মনিটরিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৫–২৬ অর্থবছরে একাধিক বড় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছে। বন্দরের সব গেটে শতভাগ ই–গেট পাস ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর ফলে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান চালকদের আর লাইনে দাঁড়িয়ে নগদ অর্থ জমা দিয়ে প্রবেশ অনুমতি নিতে হচ্ছে না। বিকাশ, নগদ, রকেট কিংবা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আগে থেকেই ফি পরিশোধ করে কিউআর কোড ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বন্দরে প্রবেশ ও বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার যানবাহন এ সুবিধা ব্যবহার করছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অ্যাসাইকোডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমের সঙ্গে বন্দরের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) সরাসরি সংযুক্ত করা হয়েছে। ফলে বিল অব এন্ট্রি, আইজিএম, কন্টেনার ও জাহাজের তথ্য রিয়েল–টাইমে আদান–প্রদান হচ্ছে এবং ম্যানুয়াল যোগাযোগের প্রয়োজন কমে এসেছে। একই সঙ্গে ই–ডিও, অনলাইন এনওসি, ই–চালান, ই–গেট পাস, অনলাইন কার্ট টিকিটসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো সম্পূর্ণ পেপারলেস পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। বন্দর ব্যবহারকারীদের জন্য রিয়েল–টাইম কন্টেনার ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইনডো (বিএসডব্লিউ) এবং ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইনডোর (এনএসডব্লিউ) সঙ্গে সিস্টেম একীভূত করায় বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় সম্ভব হচ্ছে। শতভাগ অনলাইন বিলিং ও পেমেন্ট ব্যবস্থাও চালু হয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে চালু হওয়া সিপিএ স্কাই প্ল্যাটফর্মকে বন্দরের ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম বড় পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এনবিআর, কাস্টমস, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট ও সিএন্ডএফ এজেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে একটি অত্যাধুনিক সাইবার সিকিউরিটি সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। এতে প্রো–অ্যাকটিভ থ্রেট ডিটেকশন, ডাটা কনফিডেনশিয়ালিটি কন্ট্রোল, রিয়েল–টাইম সাইবার ইন্টেলিজেন্স, অ্যান্টি–ডিডস সক্ষমতা, নেটওয়ার্ক সার্ভেইলেন্স, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ২৪ ঘণ্টার সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের মতে, এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক জাহাজ ও বন্দর নিরাপত্তা বিধিমালা (আইএসপিএস কোড) অনুসরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন অপারেশন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও চট্টগ্রাম বন্দর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলের আইওআরআইএস তথ্য বিনিময় প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের জাতীয় ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরকে মনোনীত করেছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ড পরিচালিত আন্তর্জাতিক বন্দর নিরাপত্তা পরিদর্শনে বন্দর ‘জিরো অবজারভেশন’ অর্জন করেছে, অর্থাৎ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো আপত্তি বা নেতিবাচক পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম বন্দর আবারও ‘জিরো ওয়েটিং টাইম’ অর্জনের দাবি করেছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে জাহাজকে বহির্নোঙরে অপেক্ষা করতে হয়নি। ঈদুল আজহার সময় কিছুটা চাপ সৃষ্টি হলেও কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় পুনরায় অপেক্ষার সময় শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে জাহাজের অবস্থানকাল কমেছে, আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রম ত্বরান্বিত হয়েছে এবং লজিস্টিক ব্যয় হ্রাস পেয়েছে।
বহির্নোঙর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রতিটি জাহাজে প্রশিক্ষিত পোর্ট ওয়াচম্যান নিয়োগ, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের যৌথ টহল, ভিটিএমআইএস প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নৌ–পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তথ্য আদান–প্রদান এবং অংশীজনদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগের ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। এর ফলে বহির্নোঙরে ডাকাতি ও চুরির ঘটনা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ২০৪০ সাল পর্যন্ত কার্গো হ্যান্ডলিং ৩০ কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন এবং কন্টেনার হ্যান্ডলিং ৮ দশমিক ৭ মিলিয়ন টিইইউএসে উন্নীত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই চাহিদা পূরণে বে টার্মিনাল, লালদিয়া কন্টেনার টার্মিনাল, মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, হেভি লিফট কার্গো জেটি, রি–কন্টেনার টার্মিনাল এবং রি–মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহনে সড়কের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রেল ও নৌপথের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সার্বিকভাবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরকে চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একটি রেকর্ডময় বছর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কন্টেনার, কার্গো ও জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, ইতিহাসের সর্বোচ্চ রাজস্ব উদ্বৃত্ত, ডিজিটালাইজেশন, সাইবার নিরাপত্তা জোরদারকরণ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং জিরো ওয়েটিং টাইম অর্জনের মতো সাফল্যকে সামনে রেখে বন্দর কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম বন্দরকে একটি আধুনিক, স্মার্ট ও বৈশ্বিক মানের লজিস্টিক হাবে রূপান্তরের প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে।











