একশর বেশি আদালত নিয়ে দেশের অন্যতম বৃহত্তম বিচারিক অঙ্গন হচ্ছে চট্টগ্রাম। ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি মামলার চাপ এখানে। কিন্তু এখানে আছে এজলাস কক্ষের সংকট। জায়গার অভাবে বিচারকাজ চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন বিচারকরা। বাধ্য হয়ে ডজনেরও বেশি আদালতকে কক্ষ ভাগাভাগি করে, অর্থাৎ পালাক্রমে (রোটেশন পদ্ধতিতে) বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে বিঘ্নিত হচ্ছে বিচার ব্যবস্থার গতিশীলতা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রাম জুডিসিয়াল ভবন ও নতুন আদালত ভবনে কক্ষ সংকটের চিত্রটি সবচেয়ে প্রকট। চট্টগ্রাম জুডিসিয়াল ভবনের ষষ্ঠ তলায় গুরুত্বপূর্ণ অর্থঋণ আদালত–২ ও অর্থঋণ আদালত–৩ পরিচালিত হচ্ছে মাত্র একটি কক্ষ শেয়ার করে। একই ভবনে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম মহানগর এবং শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম জেলা মিলে ব্যবহার করছে আরেকটি কক্ষ। নতুন আদালত ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে চলছে পারিবারিক আদালত–২ ও পারিবারিক আদালত–৩ এর কার্যক্রম। একই ভবনের চতুর্থ তলায় পারিবারিক আপিল ট্রাইব্যুনাল এবং ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের অবস্থাও একই।
আরো লক্ষণীয় বিষয় যে, চট্টগ্রাম মহানগর যুগ্ম জজ আদালত– ২, ৩, ৪, ৫, ৬ ও ৭ এই ছয়টি আদালতের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র তিনটি কক্ষ। ফলে পালাবদল করে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হচ্ছে এসব আদালতের বিচারকদের। আদালত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কক্ষ ভাগাভাগি করে বিচার কাজ পরিচালিত হচ্ছে এমন আরো কয়েকটি আদালত রয়েছে চট্টগ্রামে।
ভোগান্তিতে বিচার প্রার্থীরা : স্থান সংকটের এই মারপ্যাঁচে বিচারকদের বসার জায়গা নিশ্চিত করতেই দিনের বড় একটা সময় পেরিয়ে যায়। সকালের শিফটে এক আদালতের বিচারক বসলে, বিকেলের শিফটে বসছেন অন্য আদালতের বিচারক। একই চেয়ারে পালাক্রমে দুই বিচারকের বসা এবং একই বেঞ্চে ভিন্ন ভিন্ন মামলার ফাইলপত্র সামলানোর এই সংস্কৃতি বিচারালয়ের স্বাভাবিক গাম্ভীর্যের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। নথি পত্রের আধিক্য, আইনজীবীদের উপস্থিতি এবং বিচারপ্রার্থীদের ভিড়ে কক্ষগুলোর ভেতরের পরিবেশ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি চাপপূর্ণ হয়ে ওঠে। নির্ধারিত সময়ে মামলা ডাক না পাওয়া কিংবা স্থান সংকুলান না হওয়ায় বারান্দায় দাঁড়িয়েই অনেককে অপেক্ষা করতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। একটি বিচারিক কক্ষে যখন দুটি
আদালত চলে, তখন স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাটাই স্বাভাবিক। আইনজীবীদের দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং উভয় পক্ষের লোকসমাগমে ছোট্ট সেই কক্ষটিতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। এতে বিচারপ্রার্থীরা দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন– মন্তব্য করেন একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
দীর্ঘদিনের দাবি, নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি : আদালতের এই প্রকট সংকটের বিষয়টি নতুন নয়। এর আগেও নানা সময়ে আদালত প্রাঙ্গন থেকে শুরু করে জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মহলের নজরে আনা হয়েছে। বিচারকদের বসার সুব্যবস্থা এবং বিচারপ্রার্থীদের স্বস্তি নিশ্চিত করতে নতুন অবকাঠামো বা ভবন নির্মাণের দাবি বারবার জোরালো হয়েছে। তবে কাগজ–কলমে আলোচনা আর প্রতিশ্রুতির ভিড়ে এখনো পর্যন্ত নতুন কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে বছরের পর বছর ধরে চলা এই স্থান সংকটের মারপ্যাঁচ থেকে মুক্তি মেলেনি বন্দরনগরীর বিচার বিভাগের।
আইনজীবীদের মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গতিশীলতা বজায় রাখতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ বা বিকল্প স্থান সংকুলান করা না হলে এই সংকট আগামীতে আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতি সূত্র জানায়, বিচারকের এজলাস ও খাসকামরা তথা কক্ষ সংকট নিরসনে নতুন অবকাঠামোগত উন্নয়ন তথা নতুন ভবন নির্মাণের লক্ষে চট্টগ্রামের জেলা জজ ও মহানগর দায়রা জজ এর পক্ষ থেকে নানা সময়ে আইন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। আইনজীবী সমিতি থেকেও একই রকম আবেদন করা হয়। সর্বশেষ গত ১৩ মে আইন মন্ত্রণালয়ে এমন একটি আবেদন করে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মো. হাসানুল ইসলাম। ‘চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা আদালতের বিচারিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ক্রমবর্ধমান পরিধি বিবেচনায় পৃথক নিজস্ব ভবন নির্মাণ প্রসঙ্গ’ শিরোনামের উক্ত আবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজশিপে বর্তমানে ১৯টি আদালত রয়েছে। এরমধ্যে ৬ জন যুগ্ম মহানগর দায়রা জজ তিনটি এজলাস ও খাসকামরায় ভাগাভাগি করে বিচার কাজ পরিচালনা করে আসছেন।
বলা হয়, কোর্টহিলের জেলা প্রশাসক কার্যালয় সম্মুখভাগের আন্দরকিল্লা মৌজার বিএস খতিয়ান নং–১, দাগ নং–৩৫০১ স্থলে ভবন নির্মাণ করা হলে বিদ্যমান ও ভবিষ্যত সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে। এদিকে গত ২৯ জুন জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকেও আইনমন্ত্রী বরাবর একই ধরনের আবেদন করে নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীতা তোলে ধরা হয়।
শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম মহানগরের পিপি মাহমুদ–উল আলম চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, কক্ষ সংকটের কারণে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম জেলার সাথে বাধ্য হয়ে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম মহানগরের কক্ষ ভাগাভাগি করতে হচ্ছে। পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে উঠলে এ সমস্যার সমাধান হয়ে আসবে।
পারিবারিক আপিল ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী ইউনুছ খান বলেন, আমাদের জন্য আলাদা কক্ষ নেই। ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনালের সাথে আমাদের কক্ষ শেয়ার করতে হচ্ছে। একটি আদালতের কাজ শেষ হলে অপর আদালতটির কাজ শুরু হয় বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) জে এ এম শহিদুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, কয়েকটি আদালত মিলে একটি কক্ষ শেয়ার করে বিচারকাজ পরিচালিত হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। এ সমস্যা সংশ্লিষ্টদের নজরেও দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন আদালত ভবনের ৪র্থ তলার এক পাশের ছাদে খালি জায়গায় টিনশেড একটি স্থাপনা করা হচ্ছে। নির্মাণ কাজও প্রায় শেষ হওয়ার দিকে। কাজ শেষের পর উক্ত স্থাপনায় কক্ষ শেয়ার করছে যেসব আদালত সেগুলোর মধ্য থেকে শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম মহানগর, শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম জেলা, পারিবারিক আপিল ট্রাইব্যুনাল ও ল্যান্ড সার্ভে আপিল ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর করা হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট কিছুটা হলেও লাঘব হবে।
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন বলেন, চট্টগ্রাম হচ্ছে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। চট্টগ্রামের অর্থনীতির উপরই পুরো দেশ নির্ভরশীল। সেই চট্টগ্রামে ডজনেরও বেশি আদালতকে কক্ষ ভাগাভাগি করে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হওয়াটা দুঃখজনক। বর্তমান সরকার চট্টগ্রামের বিচার বিভাগের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি নতুন ভবন তৈরী করে সংকট দূর করবে– এটা তাদের দাবি বলেও জানিয়েছেন সিনিয়র এই আইনজীবী।












